বাঁশখালীতে ৫০ বছরের পুরনো টেলিফোন অফিস : লাইন পেতে ৪ দিন, চিৎকার ছাড়া শোনা যেত না কথা

ছবি: আগামীর সময়
চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার অদূরে বাঁশখালী উপজেলার গুনাগুরী গ্রামের খাসমহল। ওখানকার পাহাড়ি ছড়া থেকে উৎপত্তি হওয়া কোদালাখালটি খাসমহল ছুঁয়ে বয়ে গেছে সোজা পশ্চিমে। এই খালের পাড় ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে পিচঢালা সড়ক। সেই পথ ধরে পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে গেলেই চোখ পড়ে মোশাররফ আলী মিয়ার বাজার। বাজার পার হতেই দূরে দেখা যায় সবুজের বুক ফুঁড়ে ওঠা এক বিশাল ল্যাটিস টাওয়ার। মাথায় তার দিকনির্দেশক অ্যান্টেনা।
টাওয়ারের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক জরাজীর্ণ, শ্যাওলা মাখা দোতলা ভবন। যার ভেতরে একাকী পড়ে আছে ধুলোবালি আর জংয়ে ঢাকা এক ভারী লোহার মেশিন। প্রযুক্তির আগ্রাসী জোয়ারে পরিত্যক্ত। তবুও অতীতের গৌরবোজ্জ্বল উপস্থিতির জানান দিতেই যেন আজও খাড়া দাঁড়িয়ে আছে যন্ত্রটি। কারিগরি ভাষায় এর নাম-ভিএইচএফ রেডিও লিংক। আজকের ফাইভ-জি স্মার্টফোন প্রজন্মের কাছে এই জং ধরা লোহার ক্যাবিনেটের হয়তো কোনো মূল্য নেই। কিন্তু সত্তরের দশক থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা এই উপকূলের মানুষের দূর-দূরান্তের যোগাযোগ আর বেঁচে থাকার খবরাখবরের একমাত্র ভরসা ছিল এই যন্ত্রটিই।
ম্যাকনামারার গোপন দলিল ও বিশ্বব্যাংকের ‘সাইক্লোন প্রজেক্ট’
এই সাধারণ ল্যাটিস টাওয়ার আর জং ধরা ক্যাবিনেটের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) উন্মোচিত একটি ঐতিহাসিক দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৭২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরের একটি অতিগোপনীয় প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট এস. ম্যাকনামারা নির্বাহী পরিচালকদের কাছে বাংলাদেশের জন্য ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিশেষ ঋণ সহায়তার সুপারিশ করেন।
‘প্রতিবেদন নম্বর-পি-১১২০’ নামের এই দলিলে উল্লেখ ছিল, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের বিধ্বংসী ‘গোর্কি’ ঘূর্ণিঝড়ের ঠিক ৬০ দিন পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় এলাকা পুনর্গঠনের জন্য ‘ক্রেডিট নং ২২৮-পাক’ নামে একটি ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ আর আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের কারণে সেই প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। দেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার সেই বাতিল হওয়া প্রকল্পটি আবার সচল করার জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে অনুরোধ জানায়। তৎকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রকল্পটির গুরুত্ব ‘পুনর্বাসন’ থেকে সরিয়ে ‘ঘূর্ণিঝড় সুরক্ষা ও দুর্যোগকালীন উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ’ প্রকল্পে রূপান্তর করা হয়।
এই প্রকল্পেরই ‘টেলিযোগাযোগ’ খাতের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল ৫ দশমিক ৬১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যার মূল লক্ষ্য ছিল যোগাযোগহীন উপকূলীয় এলাকায় ২২টি ওয়্যারলেস বেস স্টেশন, ১০০টি পাবলিক কল অফিস (পিসিও) এবং চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ৩০০ চ্যানেলের একটি মাইক্রোওয়েভ ও রেডিও লিংক সংযোগ স্থাপন করা। বাঁশখালীর এই স্টেশনটি ছিল সেই ১০০টি পাবলিক কল অফিসেরই একটি।
টোকিও থেকে বাঁশখালী: লোহার বুকে বার্থ সার্টিফিকেট
বিশ্বব্যাংকের এই তহবিলের অধীনে উপকূলের মানুষের প্রাণ বাঁচানোর কাজটি পায় জাপানের বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ফুজিৎসু লিমিটেড’। আর টাওয়ারের লোহার কাঠামো তৈরির দায়িত্ব পায় জাপানের মেটাল ফেব্রিক্যান্ট জায়ান্ট ‘সুদা সেইসাকুশো’।
আজও বাঁশখালীর এই টাওয়ারের একটি লোহার গায়ে সগর্বে টিকে আছে ইতিহাসের সেই ‘বার্থ সার্টিফিকেট’ বা জন্ম ইতিহাস। কালচে দাগ আর শ্যাওলার আস্তরণ সরালেই সেখানে জ্বলজ্বল করে ওঠে নিখুঁত জাপানি খোদাই—‘25m triangular tower, date of product: Dec 1974, Manuf: Suda Seisakusho, Fujitsu Limited (Tokyo, Japan)’। অর্থাৎ বিশ্বব্যাংকের সেই জীবনরক্ষাকারী প্রকল্পের লজিস্টিকস হিসেবেই ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরের এক শীতের দিনে জাপানি প্রকৌশলীরা বাঁশখালীর মাটিতে খাড়া করেছিলেন এই ২৫ মিটার উঁচু টাওয়ার।
পুরো উপকূলের জন্য লাইন মাত্র একটি!
ভবনটির নিচতলায় ঢুকলে এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার, চারপাশ স্যাঁতসেঁতে। এক কোণে ধুলোবালির মোটা আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে এক হলুদ রঙের ভারী লোহার ক্যাবিনেট। এটিই সেই ফুজিৎসু অ্যানালগ রেডিও লিংক টার্মিনাল।
আজকের যুগে যেখানে সেকেন্ডে লাখ লাখ কল প্রসেস হয়, তখন এই পুরো সেটআপের ধারণক্ষমতা ছিল মাত্র একটি একক ভয়েস চ্যানেল
তখনকার দিনে সাধারণ মানুষ যখন এই এক্সচেঞ্জে এসে দূরপাল্লার ‘ট্রাংক কল’ বুক করতেন, তখন মূল এক্সচেঞ্জ থেকে সেই ভয়েস সিগন্যাল তারের মাধ্যমে নেমে আসত এই ফুজিৎসু ক্যাবিনেটে। ক্যাবিনেটের ভেতরের যন্ত্রাংশ মানুষের কণ্ঠস্বরকে বেতার তরঙ্গে রূপান্তর করে মোটা কেবল বেয়ে পাঠিয়ে দিত টাওয়ারের মাথার অ্যান্টেনায়। সেখান থেকে অ্যান্টেনাটি সিগন্যালকে বাতাসে ভাসিয়ে সরাসরি ছুড়ে দিত চট্টগ্রাম মূল স্টেশনের দিকে। আজকের যুগে যেখানে সেকেন্ডে লাখ লাখ কল প্রসেস হয়, তখন এই পুরো সেটআপের ধারণক্ষমতা ছিল মাত্র একটি একক ভয়েস চ্যানেল! অর্থাৎ পুরো বাঁশখালী উপকূলের জন্য লাইন সচল থাকত মাত্র একটি। একই সময়ে শুধু একজন মানুষই দূর-দূরান্তে কথা বলতে পারতেন। একটি জরুরি বার্তা বা কান্না-হাসির আদান-প্রদান শেষ হলে তবেই পরের জন লাইনে সুযোগ পেতেন।
চিৎকার করে কথা বলা আর ৪ দিনের অপেক্ষা
বিটিসিএলে কর্মরত কর্মকর্তা ও অপারেটরদের কাছে এটি ‘১৯৭০ সালের সাইক্লোন প্রজেক্ট’ নামেই পরিচিত। স্টেশনটিতে ১৯৮৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত দুই দফায় ২০ বছর ওয়্যারলেস অপারেটর হিসেবে কাজ করেছেন মোহাম্মদ দিদার ফারুক। পুরনো দিনের স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেছেন, ‘১৯৭০ সালের সাইক্লোনে লাখ লাখ মানুষ মারা যাওয়ার পর এই পিসিওটি স্থাপন করা হয়। আশি বা নব্বইয়ের দশকে যখনই কোনো ঘূর্ণিঝড় হতো, পুরো বাঁশখালীকে দেশের সঙ্গে যুক্ত রাখত এই একটি জং ধরা ক্যাবিনেট। এই ক্যাবিনেটের রোটারি নব ঘুরিয়ে ফ্রিকোয়েন্সি টিউন করে দুর্যোগের সমস্ত জরুরি ও প্রশাসনিক বার্তা পার করতাম আমরা। তখন বরিশাল বা দেশের অন্য প্রান্তে একটি লাইন পেতে মানুষকে চার দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো।’
তখন তো হাতে হাতে ফোন ছিল না। ঢাকা বা বিদেশ থেকে কোনো আত্মীয় ফোন করলে এই অফিসে খবর আসত। অফিসের পিয়ন এসে বাড়িতে ডাকলে আমরা দৌড়ে এই দালানে আসতাম। লাইনে প্রচণ্ড খসখসে শব্দ হতো, চিৎকার করে কথা বলতে হতো
টেলিগ্রামও পাঠানো যেত এই অফিস থেকে। এক শব্দ টেলিগ্রাম পাঠাতে খরচ হতো ২০ পয়সা। টেলিফোন লাইনের সেই অ্যানালগ যুগে একটি কল কানেক্ট করার জন্য মানুষকে কীভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো, সেই নস্টালজিয়া জড়িয়ে আছে এই জরাজীর্ণ ভবনের দেয়ালে দেয়ালে।
স্থানীয় প্রবীণ সাবেক ইউপি মেম্বার আনছারুল আলম চৌধুরী বলেছেন, ‘তখন তো হাতে হাতে ফোন ছিল না। ঢাকা বা বিদেশ থেকে কোনো আত্মীয় ফোন করলে এই অফিসে খবর আসত। অফিসের পিয়ন এসে বাড়িতে ডাকলে আমরা দৌড়ে এই দালানে আসতাম। লাইনে প্রচণ্ড খসখসে শব্দ হতো, চিৎকার করে কথা বলতে হতো। আজ যখন নাতি-নাতনিদের দেখি মোবাইল ফোনে ভিডিও কল করছে, তখন এই পরিত্যক্ত দালান আর টাওয়ারটার দিকে তাকালে রূপকথার মতো মনে হয়।’
লোহা মেপে বিক্রির আগে বাঁচানোর আকুতি
ভিএইচএফ রেডিও লিংকের জায়গা নিয়েছে আধুনিক মাইক্রোওয়েভ, অপটিক্যাল ফাইবার এবং ফাইভ-জি মোবাইল টাওয়ার। স্বভাবতই ২০২৬ সালের এই ডিজিটাল বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের এই পাবলিক কল অফিসের কোনো বাণিজ্যিক ব্যবহার নেই। কিন্তু কারিগরি উপযোগিতা হারালেও এর ঐতিহাসিক ও স্মারক মূল্য অপরিসীম। বর্তমানে ভবনটির চারপাশ লতাপাতায় ঢেকে গেছে, ভেতরের মূল্যবান তামার তার ও যন্ত্রাংশ চুরির ঝুঁকিতে রয়েছে। যেকোনো সময় হয়তো সরকারি প্রক্রিয়ায় এটিকে স্রেফ ‘পরিত্যক্ত স্ক্র্যাপ’ হিসেবে লোহা মেপে বিক্রি করে দেওয়া হতে পারে।
পৃথিবীর বহু দেশে টেলিযোগাযোগের এই ধরনের আদি স্থাপনা ও প্রথম প্রজন্মের মেশিনগুলোকে ‘টেলিকম মিউজিয়াম’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংরক্ষণ করা হয় জানিয়েছেন চার দশকের সংগ্রাহক প্রবাল দে। তিনি বলেছেন, ‘এটি স্রেফ কোনো লোহার যন্ত্র নয়। এটি ইতিহাসের স্মারক। এটাকে সংরক্ষণ করা অবশ্যই জরুরি।’
জানতে চাইলে বিটিসিএল চট্টগ্রাম টেলিযোগযোগ অঞ্চলের উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ অহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘এখানে আমাদের দেড় একর জায়গা আছে। পিসিওর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এটি পরিত্যক্ত হিসেবে আছে। জায়গাটি আমরা ঘেরা দিয়ে সংরক্ষণ করছি। আমাদের কোনো টেলিকম মিউজিয়াম নেই। তবুও নির্দেশনা পেলে আমরা যন্ত্রটি সংরক্ষণ করব।’




