একে খান মোড় এখন ‘যানজটের কারখানা’

একে খান মোড়ে নিত্যদিনের যানজট, ছবি : আগামীর সময়
সময় বেলা ১২টা। একটি সাদা রঙের প্রাইভেট কার পুলিশ থামাল কাগজপত্র চেক করতে। মিনিটেরও কম সময়ে পেছনে বেশ কয়েকটি গাড়ি আটকা পড়ে যায় এতে। তার মধ্যেই কাউন্টারে প্রবেশ করে গ্রিন লাইন পরিবহনের একটি বাস। বাসটি কাউন্টারে ঢোকার জন্য জায়গা করে দিলেন পুলিশ সার্জেন্ট। ঠিক তখনই তৈরি হয়ে গেল তীব্র যানজট।
এরকম এলোমেলো ট্রাফিক সিস্টেমটি দেখা গেল নগরীর ব্যস্ততম একে খান মোড়ে।
বৃহত্তর চট্টগ্রামের ৫ জেলা থেকে দেশের বাকি ৫৯ জেলায় যাতায়াতের জন্য নগরীর যে গেটওয়ে তার নামই একে খান মোড়। বন্দর থেকে এক্সেস রোড দিয়ে পণ্যবাহী যান, কদমতলী থেকে আন্তঃজেলা রুটের বাস, গরিবুল্লাহ শাহ মাজার থেকে ঢাকাগামী এসি গাড়ি বের হয় এই মোড় দিয়ে। তিন রাস্তার এই মোড় দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করে কয়েক হাজার বাস, ট্রাক, কার, টেক্সি ও অন্যান্য যানবাহন। একদিকে গণপরিবহনের চাপ, অন্যদিকে বন্দরের ভারী পণ্যবাহী ট্রাকের আসা-যাওয়া। এর ফলে একে খান মোড়ে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা লেগে থাকে তীব্র যানজট।
একে খান মোড় পরিচিতি পেয়েছে ‘যানজটের কারখানা’ হিসেবে। জটবিহীন এই মোড় কখনো কল্পনা করা যায় না। এরকম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম মোড় সামাল দেওয়ার জন্য যে ট্রাফিক সিস্টেম ও জনবল থাকার কথা, তার কোনোটি নেই। ৫ থেকে ৭ জনের একটি ট্রাফিক পুলিশের টিম এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য অপ্রতুল।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (ট্রাফিক-পশ্চিম) নিষ্কৃতি চাকমা বললেন, ‘নগরীর এরকম গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আন্তজেলা বাস কাউন্টার। বাস থামে, যাত্রী নামায়। বাস-ট্রাকের টার্মিনাল নগরীর বাইরে না নিলে পরিস্থিতি কোনোভাবে সামাল দেওয়া যাবে না।’
বিশ্বব্যাংকের মহাপরিকল্পনা প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম নগরীর প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত ‘একেখান মোড়কে’ অন্যতম প্রধান ‘বটলনেক’ বা তীব্র যানজটপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০১৭ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, বিকেলের ব্যস্ত সময়ে এই মোড়ে ট্রাফিক প্রবাহ ছিল প্রতি ঘণ্টায় ২ হাজার ৪৫১ প্যাসেঞ্জার কার ইউনিট (পিসিইউ)। প্রতিবেদনে বর্তমানে এই মোড়টির সেবার মান ‘ডি’ বা তীব্র যানজটপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অবিলম্বে কোনো ব্যবস্থা না নিলে ২০৩০ সাল নাগাদ এর মান আরও অবনতি হয়ে ‘এফ’ পর্যায়ে অর্থাৎ সম্পূর্ণ অচল বা চরম যানজটের স্তরে পৌঁছাবে।
এই মোড় জুড়েই গড়ে উঠেছে বিভিন্ন কোম্পানির দূরপাল্লার বাসের একাধিক ছোটো-বড় কাউন্টার। বাস দাঁড়ানোর নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় বাসগুলো রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করে। অনেক ক্ষেত্রে মালামাল লোড-আনলোড করতেও কয়েক মিনিট সময় লেগে যায়। এ সময় পেছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে অন্যান্য যানবাহন। সামান্য সময়ের মধ্যে কয়েক শ মিটার দীর্ঘ যানজট তৈরি হওয়া এখানে নিত্যদিনের চিত্র।
প্রতিদিনের এই যানজটে আটকা পড়ে কর্মজীবীদের নষ্ট হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কর্মঘণ্টা। শিক্ষার্থীদের মিস হয়ে যায় ক্লাসের প্রথম ঘণ্টা। এ পথ দিয়ে প্রতিদিন অফিসে যাওয়া-আসা করে মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন।
তিনি জানালেন, প্রতিদিন একে খান মোড় হয়ে অফিসে যাতায়াত করি। সকালবেলা জ্যামে পড়তে হয়। বিকেল হলে এই জ্যাম আরও বেশি বেড়ে যায়। একে খান হয়ে অলংকার পার হতেই ২০-২৫ মিনিট লেগে যায়।
এ বিষয়ে ট্রাফিক সার্জেন্ট মোহাম্মদ ফারুক বললেন, ‘এখানে কোনো বাস টার্মিনাল নেই। তাই প্রায় সব গাড়িকেই সড়কের ওপর দাঁড়াতে হয়। একটি বাসে যাত্রী বা মালপত্র তুলতে অন্তত পাঁচ মিনিট সময় লাগে। এ সময়ের মধ্যেই যানজট তৈরি হয়ে যায়। একে খান মোড় নিয়ন্ত্রণে রাখা আমাদের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তারপরও আমরা যানবাহন দীর্ঘ সময় সড়কে দাঁড়াতে না দেওয়ার চেষ্টা করছি।’
পুলিশের সাথে মিল পাওয়া যায় বাস চালক মোহাম্মদ আবছার মিয়ার কথায়, ‘এই মোড়ে বাস দাঁড়ানোর কোনো জায়গা নেই, আমরা বাধ্য হয়ে এখানে দাঁড়াই। যাত্রীদের ওঠা-নামার জন্য এক মিনিট দাঁড়ালেও পুলিশ মামলা দিয়ে দেয়।’
এ রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করা সাদিয়া আক্তারের অভিযোগ, ‘সকালে কলেজে যাওয়ার সময় প্রায়ই যানজটে আটকে থাকতে হয়। অনেক দিন ক্লাস শুরু হওয়ার পর ক্যাম্পাসে পৌঁছাই। পরীক্ষা বা গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস থাকলে আরও বেশি দুশ্চিন্তায় থাকি।’




