এনসিটি পরিচালনার ভার ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দিতে ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই চিঠি
- সরকার, প্রশাসন ও বন্দর ব্যবহারকারীরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে

নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল। ছবি: রনি দে
আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার ভার দিতে এক দিনে দুই আদেশ দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। প্রথম আদেশে আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগ দেওয়ার নেগোসিয়েশন বা দর-কষাকষি এবং বাতিলের দায়িত্ব চট্টগ্রাম বন্দরকে দেয়। তিন ঘণ্টার ব্যবধানে নতুন আদেশে নেগোসিয়েশন করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও দেওয়া হয় বন্দরকে।
চট্টগ্রাম বন্দরের হৃৎপিণ্ড এনসিটি বর্তমানে বন্দরের টার্মিনালটির মধ্যে সবচেয়ে লাভজনক। বন্দরের বার্ষিক রাজস্ব আয় ৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে দেড় হাজার কোটি টাকা একাই জোগান দেয় এই এনসিটি। আর মোট কনটেইনার ওঠা-নামায় ৪৫ শতাংশ পরিচালিত হয় এই টার্মিনালে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একই কর্মকর্তার একই দিনে দুটি আদেশ সরকার, প্রশাসন এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও অস্পষ্টতা তৈরি করেছে। এই বিভক্তির স্পষ্ট আভাস মিলেছে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যের মধ্যেও। যাদের দুজনেই বন্দরে পণ্য ওঠা-নামার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
এই অস্পষ্টতার বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়ার ভাষ্য, ‘এনসিটি নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাব নতুন সরকার কী করছে তা নিয়ে কিছুটা কনফিউশন তৈরি হয়েছিল। সেটি পরিষ্কার করতেই বৈঠকে বসে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তার মতে, ‘এটা নেগোসিয়েশন প্রক্রিয়া, পরিচালনার সিদ্ধান্ত নয়।’
ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দিয়ে এনসিটি পরিচালনার আলাপ এতদিন গোপন থাকলেও বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকতা পায় মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে প্রক্রিয়াটি বিএনপি ‘তড়িঘড়ি এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী’ বলে সমালোচনা করে শ্রম আন্দোলন গড়ে তুলে চুক্তি ঠেকিয়েছিল, ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএনপি সেই ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গেই নতুন করে আরও বড় পরিসরে দর-কষাকষি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। এতে সরকার এবং প্রশাসনের মধ্যেই বেশ অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিমের অভিযোগ, ‘একটি চক্র সরকারকে ভুল বুঝিয়ে ব্যক্তিগত ফায়দা লুটতে এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দিতে চাইছে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো লাভ তো নেই, দেশের লাভও নেই। দক্ষতা এখনকার চেয়ে বেশি দেখানোর সুযোগ নেই। আর এনসিটির অবস্থান নৌবাহিনীর মতো স্পর্শকাতর স্থাপনার পাশে। বিদেশিদের দিলে এতে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হবে। দেশের টাকা বিদেশে চলে যাবে। যেটি গত ইউনূস সরকারের সময় থেকেই সোচ্চার ছিলাম।’
চট্টগ্রাম বন্দরের বার্থ অপারেটর এভারেস্ট এন্টারপ্রাইজের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন বলছেন, ‘জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে অবহিত করেছি। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এর বাস্তবতা তুলে ধরব। এতেও কাজ না হলে প্রক্রিয়া ঠেকাতে প্রয়োজনে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলব। কোনোভাবেই বিদেশিদের হাতে দিতে দেওয়া হবে না এনসিটি।’
সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজানও বলছেন, ‘বিদেশি অপারেটর দিয়ে এনসিটি পরিচালনার সরকারি সিদ্ধান্ত রিভিউ করা হোক। আগের সরকারের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি এবং ভৌগোলিক কারণে যদি শেষ পর্যন্ত ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনা দিতেই হয়, তাহলে সেটা যেন স্বচ্ছ, উন্মুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক হয়। ডিপি ওয়ার্ল্ড, অন্য বিদেশি অপারেটর একই সঙ্গে দেশীয় অপারেটরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লড়ে নির্বাচিত হয়ে আসুক। এতে সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।’
বন্দরের বার্থ অপারেটর কসমস এন্টারপ্রাইজের মালিক আশরাফ উদ্দিনের মতে, ‘এনসিটি গেলেও বাকি টার্মিনাল সিসিটি, জিসিবির ১২ জেটি পরিচালনায় যাতে আর বিদেশি অপারেটর না আসে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। কেউ বেশি দক্ষতা দেখাতে চাইলে বে টার্মিনালে যাক।’
চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়িয়ে কস্ট অব ডুইং বিজনেস কমাতে সোচ্চার ব্যবসায়ীরা। তারাও চান বিদেশি অপারেটর আসুক, কিন্তু এতে অযথা যাতে কস্ট না বাড়ে।
বাংলাদেশ থেকে ডেনিম বা জিন্স পোশাকের প্রায় ১৫ শতাংশই এককভাবে রপ্তানি করে প্যাসিফিক জিন্স। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ তানভীরের দাবি, ‘গ্লোবাল অপারেটর আসলে আমাদের দক্ষতা-সক্ষমতা তুলনা করার সুযোগ থাকে। আমাদের ভাবমূর্তি বাড়ে। গ্লোবাল অপারেটর গ্রিনফিল্ডে প্রজেক্টেই নিজস্ব ডিজাইনে লে আউট, ভ্যালু এডিশন এবং সর্বোচ্চ দক্ষতা দেখানোর সুযোগ থাকে। বর্তমান টার্মিনালে গ্লোবাল অপারেটদের কাজ করতে দিলে সরকার স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেটি করবে এবং দেশের স্বার্থবিরোধি কোনো পদক্ষেপ নেবে না বলেই আমার বিশ্বাস।’
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত চট্টগ্রাম চেম্বার প্রেসিডেন্ট আমিরুল হক আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, পুরনো টার্মিনাল না দিয়ে বিদেশিদের যেকোনো গ্রিনফিল্ড থেকেই টার্মিনাল নির্মাণ, পরিচালনার সুযোগ দেওয়া উচিত। এতে বিদেশি অভিজ্ঞ অপারেটররা তাদের সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স দেখাতে পারবে। লাভবান হবে বাংলাদেশ।
তার মন্তব্য, ‘ব্যবসায়ী হিসেবে আমরা চাই এসব প্রকল্প নেয়ার আগে পাবলিক হিয়ারিং করেন, ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলেন। তাহলে দেখবেন ভালো কিছু হবে। বেসরকারি খাতকে যুক্ত করলে সরকারের নেগোসিয়েশনের চেয়ে ভালো হবে এটা বলতে পারি।’
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এনসিটি পরিচালনা ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে আমলে কাজটি এগিয়ে দেন পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী আশিক চৌধুরী।
ড. ইউনূসের মেয়াদের দুদিন আগে তড়িঘড়ি করে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির দিনক্ষণ চূড়ান্ত করে ফেললেও শ্রম আন্দোলনে সেটি স্থগিতে বাধ্য হয় অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি ক্ষমতায় আসলে সেই থেমে থাকা প্রক্রিয়া নেপথ্যে এগিয়ে নেন এই আশিক চৌধুরী।
বিএনপি সরকারের সময় ৮ এপ্রিল দুবাই গিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে বৈঠক করে আলোচনা শুরু করলে স্থগিত থাকা চুক্তির প্রক্রিয়া গতি পায়। সেখানেও নেতৃত্বে ছিলেন আশিক চৌধুরী। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, এনসিটির জন্য রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যেই আলোচনা শেষ করতে হবে। এ জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডকে প্রয়োজনবোধে একটি সংশোধিত দরপত্র প্রস্তাব দ্রুততম সময়ের মধ্যে জমা দিতে হবে। সভায় ডিপি ওয়ার্ল্ড থেকে এনসিটি, এনসিটির পেছনে ব্যাপকআপ ইয়ার্ড এবং প্রথমবার চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনার প্রস্তাব আসে।
সেই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতেই ৪ জুন বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বৈঠক হয়। বৈঠকে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল হোসেন, সচিব জাকারিয়া, পিপিপির প্রধান নির্বাহী আশিক চৌধুরী, চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বৈঠকের পর প্রথমে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব ফারজানা হোসেনের স্বাক্ষরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে দুটি সুনির্দিষ্ট বিকল্প বা সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। একটি হচ্ছে, চলমান নেগোসিয়েশন বা দর-কষাকষির প্রক্রিয়াটি যদি যৌক্তিক মনে হয়, তবে তা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, বন্দর কর্তৃপক্ষ যদি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এই নেগোসিয়েশন বা আলোচনা এগিয়ে নিতে ইচ্ছুক না হয়, তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি সরাসরি বাতিল করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
প্রথম নির্দেশনা জারির পর একইদিন, একই কর্মকর্তার স্বাক্ষরে আরেকটি চিঠিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চালিয়ে যাওয়ার সবুজ সংকেত দেওয়া হয়। ফলে একইদিন সরকারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। অভিযোগ উঠেছে, অফিস সময়সূচির পর এমন নির্দেশনা আসে বিশেষ এক কর্তার ভারবাল নোটের মাধ্যমে। যদিও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সচিব জাকারিয়া এমন কিছুর বিষয় নাকচ করেছেন।





