ভালুকের ছদ্মবেশে বিমা প্রতারণা, তিনজনের জেল

২০১০ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান বার্নার্ডিনো পর্বতমালার লেক অ্যারোহেড এলাকায় পার্ক করা রোলস-রয়েস ঘোস্ট গাড়িতে ভালুকের আক্রমনের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেয়া। ছবি: ক্যালিফোর্নিয়া ডিপার্টমেন্ট অফ ইন্সুরেন্স
"চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা, যদি না পড়ো ধরা" এই প্রবাদটির সঙ্গে আমাদের বেশির ভাগেরই পরিচয় আছে। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার মানুষের কাছেই নানা রূপে এ ধরনের প্রবাদ পরিচিত। তবে সমস্যা হলো চোর কিংবা জালিয়াতদের এই প্রবাদ জানা থাকলেও এটা নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা থাকে না। যেমন ছিল না যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন জালিয়াতের।
বিলাসবহুল গাড়ি ভেঙে বিমার টাকা হাতানোর এক আজব ফন্দি এঁটেছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার চারজন মানুষ। তবে তাদের এই 'বুদ্ধি' শেষ পর্যন্ত জেলের ঘানি টানার কারণ হয়ে দাঁড়াল। এই সপ্তাহে আলফিয়া জুকারম্যান, রুবেন তমরাশিয়ান এবং ভাহে মুরাদখানিয়ান নামের তিনজনকে ১৮০ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আর তাদের এই দলের চতুর্থ সদস্য আরারাত চিরকিনিয়ানর শুনানি হবে সেপ্টেম্বরে।
কী ছিল সেই কারসাজি? ঘটনাটি, আরও পরিষ্কারভাবে বললে ঘটনাগুলো সিনেমাকেও হার মানায়! তারা দাবি করেছিলেন যে, ক্যালিফোর্নিয়ার পাহাড়ে এক হিংস্র 'ভালুক' এসে তাদের দামি দামি গাড়িগুলোর ভেতরে ঢুকে কামড়ে-আঁচড়ে সব তছনছ করে দিয়েছে। প্রমাণ হিসেবে তারা তিনটে আলাদা বিমা কোম্পানিতে ভিডিওও জমা দিয়েছিলেন।
কিন্তু কথায় আছে না, চোরের সাত দিন আর গৃহস্থের একদিন! বিমা কোম্পানির এক তদন্তকারী যখন ভিডিওটি দেখছিলেন, তখন তার খটকা লাগে। খেয়াল করলেন, রোলস রয়েস গাড়ির ভেতরে ঢুকে ভালুকটি ঠিক যেভাবে নড়াচড়া করছে, তা কোনোভাবেই বন্য পশুর মতো নয়; বরং অবিকল মানুষের মতো!
ক্যালিফোর্নিয়ার ইনস্যুরেন্স কমিশনার রিকার্ডো লারা হাসতে হাসতে বলেন, "যেটা দেখে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল, সেটা আসলে সত্যি সত্যিই অবিশ্বাস্যই ছিল!"
তদন্তকারীরা যখন বিষয়টি নিয়ে একটু গভীরভাবে নাড়াচাড়া শুরু করলেন, তখন ক্যালিফোর্নিয়া ডিপার্টমেন্ট অফ ফিশ অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ-এর এক বিজ্ঞানী ভিডিও দেখে নিশ্চিত করলেন যে, এটা মোটেও ভালুক নয়; বরং "ভালুকের পোশাক পরা এক আস্ত মানুষ!" মজার ব্যাপার হলো, ১৯২০ সালের পর ক্যালিফোর্নিয়াতে নাকি বাদামি ভালুক দেখাই যায়নি!
এরপর পুলিশ যখন সেই সন্দেহভাজনদের বাড়িতে তল্লাশি চালাল, তখন তারা যা পেল তাতে সবার চোখ কপালে! সেখানে সুন্দর করে ভাঁজ করে রাখা ছিল সেই বিখ্যাত 'ভালুকের কস্টিউম', আর সঙ্গে ছিল ধারালো নকল নখ বা থাবা।
তদন্তকারীরা এই জালিয়াতি ধরার অভিযানের নাম দিয়েছিলেন ‘অপারেশন বিয়ার ক্ল’
তদন্তকারী ক্যাপ্টেন এরিক হুড বলেন, "আমি গত কয়েক বছরে অনেক জালিয়াতি দেখেছি, কিন্তু বিমার টাকা মারার জন্য আস্ত একটা ভালুকের ড্রেস কিনে এই নাটক সাজানো, এটা সত্যিই অদ্বিতীয়!"
শেষমেশ ২০১০ সালের রোলস রয়েস ঘোস্ট, ২০১৫ সালের মার্সিডিজ জি৬৩ এবং ২০২২ সালের মার্সিডিজ ই৩৫০—এই তিন দামি গাড়ির বিমা হাতিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন এখন শ্রীঘরের ভেতরে 'ভালুক ড্যান্স' দেওয়ার অপেক্ষায়!
যুক্তরাজ্যের পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান এর প্রতিবেদন অনুসারে, এই অদ্ভুত জালিয়াতিতে অভিযুক্ত তিনজন আদালতে ‘নো কনটেস্ট’ (অভিযোগ অস্বীকার না করা) আবেদন করেন।
আদালত তাদের প্রত্যেককে ১৮০ দিনের কারাদণ্ড প্রদান করেন। এছাড়া জুকারম্যান, রুবেন তমরাশিয়ানকে ৫২ হাজার ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই চক্রের চতুর্থ সদস্য আরারাত চিরকিনিয়ানের শুনানি আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে।
পুরো ঘটনাটি যেন এক মস্ত বড় শিক্ষা দিয়ে গেল, বিমা কোম্পানিকে বোকা বানাতে ‘ভালুক’ সাজা যায় ঠিকই, কিন্তু আইনের চোখে ধুলো দেওয়া অত সহজ নয়। দিনের শেষে সেই পুরনো প্রবাদটিই সত্যি হলো, ধরা পড়লে চুরি বিদ্যা আর মহাবিদ্যা থাকে না!



