জেলেপল্লী থেকে আকাশচুম্বী ইমারতের দেশ

UAE এর বিবর্তনের ঝলক।
১৯৫০ সালের শেষের দিকের কথা। একজন মার্কিন সাংবাদিক আবুধাবিতে এসে পৌঁছালেন। এসে দেখলেন, থাকার মতো কোনো হোটেল নেই, গাড়ি চলার মতো কোনো রাস্তা নেই, বিদ্যুৎও নেই। যে বিদেশি পরিবারটি তখন সেখানে বাস করত, তারা রাতের খাবারে খেত টিনের কৌটার মাংস, আর মাঝে মাঝে সাগরের এক ধরনের প্রাণী দিয়ে বানানো ঝোল। তিনি সেখানে গিয়েছিলেন একটা কারণে। ব্রিটিশ আর ফরাসি কিছু মানুষ তখন সাগরের নিচে তেল খুঁজছিল। কিন্তু এখনো এক ফোঁটা তেলও পাওয়া যায়নি।
আজ, প্রায় সত্তর বছর পর, সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু দালান। সেখান থেকে উড়ে যাচ্ছে দুনিয়ার অন্যতম বড় বিমান সংস্থার প্লেন। আর সেখানকার মানুষের আয় ছাড়িয়ে গেছে জাপানের মতো ধনী দেশকেও। এতটা বদলে যাওয়া সত্যিই অবাক করার মতো। কিন্তু এই বদলের পেছনে যে গল্পটা লোকে বলে বেড়ায়—উট চালানো আর মুক্তো খোঁজা মানুষগুলো রাতারাতি জাদুর মতো বদলে গেল—সেই গল্পটা পুরোপুরি ঠিক নয়। আসল ইতিহাসটা আরও চমৎকার।
অনেকেই ভাবেন, আজকের সংযুক্ত আরব আমিরাত বুঝি সরাসরি সেই মুক্তো খোঁজা জেলেদের হাতেই গড়া। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। বিশ শতকের শুরুতেও এই উপকূলের মানুষের প্রধান কাজ ছিল সাগরে ডুব দিয়ে মুক্তো তোলা। গ্রীষ্মের পুরো সময়টা পুরুষরা কাটাতেন নৌকায়, সাগরে ভেসে ভেসে। কিন্তু ১৯৩০ সালের দিকে জাপানিরা কৃত্রিমভাবে মুক্তো বানানো শুরু করল, আর তখন সারা পৃথিবীতে চলছিল মহামন্দা। এই দুইয়ে মিলে মুক্তোর ব্যবসা একেবারে ধ্বসে পড়ল। মজার ব্যাপার হলো, এটা ঘটেছিল তেল আসারও অনেক আগে। মানে যখন তেলের যুগ শুরু হলো, ততদিনে মুক্তো শিকারের যুগ প্রায় এক প্রজন্ম আগেই শেষ হয়ে গেছে।
আরেকটা মজার তথ্য হলো, ১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বরের আগে "সংযুক্ত আরব আমিরাত" নামে কোনো দেশই ছিল না। প্রথমে ছয়টি অঞ্চল মিলে, আর পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে আরেকটি অঞ্চল যোগ দিয়ে গড়ে উঠল এই দেশ। এর আগে এই জায়গাটা পরিচিত ছিল অন্য নামে, আর সেখানে ছিল সাতটি আলাদা শেখের শাসন, যারা অনেক আগে থেকেই ব্রিটিশদের সাথে চুক্তি করে রেখেছিল। তেল কিন্তু দেশ হওয়ারও আগে চলে এসেছিল। ১৯৫৮ সালে সাগরের নিচে প্রথম তেল পাওয়া গেল। আবুধাবি তাদের প্রথম তেল বিদেশে পাঠাল ১৯৬২ সালে, আর দুবাই পাঠাল ১৯৬৯ সালে।
তখন পাকা রাস্তা না থাকার কারণটা খুব সহজ—রাস্তায় চলার মতো গাড়িই তো কারও ছিল না! এমনকি ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তাদের নিজেদের কোনো টাকাও ছিল না। তারা ব্যবহার করত ভারতের ছাপানো একধরনের মুদ্রা। তবে বদল শুরু হলো আবুধাবির তখনকার শাসক শেখ জায়েদের হাত ধরে। তিনি তেল থেকে পাওয়া প্রথম টাকা দিয়ে স্কুল, হাসপাতাল, বাড়িঘর বানালেন, আর আবুধাবি থেকে আল আইন পর্যন্ত একটা পাকা রাস্তা তৈরি করলেন। অর্থাৎ, দেশ হিসেবে জন্ম নেওয়ার আগেই সেখানে উন্নয়নের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল।
আজকের আমিরাতের সাফল্য পুরোপুরি সত্যি। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু দালানের কথা উঠলেই আসে দুবাইয়ের বুর্জ খলিফার নাম, যার উচ্চতা ৮২৮ মিটার। কিন্তু এই খেতাব হয়তো বেশিদিন টিকবে না। সৌদি আরবের জেদ্দা টাওয়ার ২০২৬ সালের এপ্রিলে একশো তলা পার করে ফেলেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৮ সালের দিকে এটা প্রায় ১,০০৮ মিটার উঁচু হয়ে বুর্জ খলিফাকে ছাড়িয়ে যাবে। আকাশপথেও তারা কম যায় না। দুবাইয়ের বিমান সংস্থা এমিরেটস যাত্রী বহনে দুনিয়ার সেরাদের একটি। তাদের কাছে আছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমান এ৩৮০-এর বিশাল একটা বহর। আর টাকার হিসেবে তো তারা রীতিমতো ঈর্ষণীয় জায়গায়। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, আমিরাতের একজন মানুষের গড় বার্ষিক আয় প্রায় পঞ্চাশ হাজার মার্কিন ডলার—যা তাদের বসিয়ে দিয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর কাতারে।
এই বিশাল সম্পদের মূল উৎস হলো তেল-গ্যাস। কিন্তু এই তেলের বেশিরভাগটাই আবুধাবির দখলে। দুবাইয়ের কাছে তেল তেমন নেই। তাই দুবাই বেছে নিল অন্য পথ—ব্যবসা, বিমান চলাচল, বাড়িঘর বেচাকেনা আর পর্যটন। আজ টিভি বা ইন্টারনেটে আমরা যে চোখ ধাঁধানো দালানগুলো দেখি, তার বেশিরভাগই দুবাইয়ের এই বুদ্ধিদীপ্ত পরিকল্পনার ফল।
এই গল্পটাকে অনেকেই বেশি সহজ করে বলে ফেলে। মনে হয় যেন উটের পিঠ থেকে নেমেই মানুষ একদম সোজা প্রাসাদে উঠে গেল! কিন্তু আসল সত্যিটা হলো, এই দ্রুত বদলের পেছনে ছিল তেল নামের এক মহামূল্যবান সম্পদ। আর তার চেয়েও বড় কথা হলো, সেখানকার শাসকদের একটা দারুণ সিদ্ধান্ত। তারা তেলের টাকা শুধু জমিয়ে রাখেননি, বাইরেও পাচার করেননি। বরং সেই টাকা দিয়ে বানিয়েছেন বন্দর, বিশ্ববিদ্যালয়, রাস্তা আর বিমানবন্দর।
এটা সত্যিই এক অভাবনীয় দ্রুত বদল। কিন্তু এটা এমন কোনো জেলে বা মুক্তো শিকারির গল্প নয়, যে সকালে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির সামনে হঠাৎ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দালান দেখতে পেয়েছিল। বরং এটা এমন এক গল্প, যেখানে তেল আসার আগেই মুক্তো শিকার থেমে গিয়েছিল, দেশ গড়ার আগেই শুরু হয়েছিল তেলের যুগ, আর নতুন দেশটি তার প্রথম কয়েক দশক ব্যয় করেছিল নিজের ভিত মজবুত করতে—আর সেই কঠোর পরিশ্রমের ফলই আজ আমাদের কাছে মনে হয় এক রূপকথার গল্প।
সূত্রঃ স্পেস ডেইলি







