আকাশ চষে বেড়ানো যার নেশা

ইউনাইটেড এয়ারলাইনস এর নতুন ‘ইউনাইটেড এলিভেটেড’ অভ্যন্তরীণ নকশায় উন্নতমানের পোলারিস বিজনেস ক্লাস স্যুট যুক্ত করা হয়েছে।
অধিকাংশ মানুষ ক্যালেন্ডার দেখে দিন গণনা করলেও রিচার্ড রবিনসন এ ক্ষেত্রে কিছুটা আলাদা। তার কাছে সময় মানেই হলো বিমানের বোর্ডিং পাস, সিট নম্বর আর টাইম জোন। গত এক বছরে নিজের বাড়িতে তিনি যতটা সময় কাটিয়েছেন, তার চেয়ে বেশি কাটিয়েছেন বিমানে ভ্রমণে।
২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত রিচার্ড চড়েছেন মোট ৯৪৫টি ফ্লাইটে। এই পথটুকু যদি মেপে দেখা হয়, তবে তিনি পার করেছেন পৃথিবীকে প্রায় ৬৪ বার ঘুরে আসার সমান দূরত্ব। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ১৩০টি বিমানবন্দর ব্যবহার করেছেন এবং সেবা নিয়েছেন ৩৫টি ভিন্ন ভিন্ন এয়ারলাইনসের।
রিচার্ডের মোট ভ্রমণের মধ্যে ৫২১টি ছিল বিজনেস ক্লাসে। এতবার ওড়ার পর এখন আর দামি ওয়াইন, শৌখিন চিজ বোর্ড কিংবা নামি ব্র্যান্ডের প্রসাধনী তাকে মোটেও টানে না। এমনকি বিমানের ভেতরের সিনেমা বা শৌখিন পোশাক নিয়েও তার তেমন কোনো আগ্রহ নেই।
তার কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিমানের আসনটি যেন পুরোপুরি বিছানার মতো সমতল হয় এবং সেখানে হাত-পা নাড়ানোর জন্য জায়গা থাকে পর্যাপ্ত। ৫২১ বার বিজনেস ক্লাসে ওড়ার পর তিনি বুঝেছেন, সিটের গঠন আর বাতাসের প্রবাহই হলো আসল আরাম।
বিজনেস ক্লাসের টিকিটের দাম ইকোনমি ক্লাসের চেয়ে প্রায় ৩-৪ গুণ বেশি। রিচার্ড পরামর্শ দেন, যদি নিজের পকেট থেকে টাকা খরচ করতে হয়, তবে খুব ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তিনি তার কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস দিয়েছেন।
২০১০ সালে একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ শুরুর পর থেকেই রিচার্ডের ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। তাকে প্রায়ই ছুটতে হয় হংকং, লন্ডন বা সিঙ্গাপুরের মতো শহরে। অনেক সময় সকালে মিটিং শেষ হতেই তাকে দুপুরের ফ্লাইটে রওনা দিতে হয়েছে অন্য দেশে।
বর্তমান বছরেও রিচার্ডের ব্যস্ততা কমেনি। বছরের শুরুতেই তিনি গিয়েছেন ফ্রাঙ্কফুর্ট। সেখান থেকে ভারত হয়ে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, টোকিও আর সিউল- সবখানেই তাকে নিয়মিত যাতায়াত করতে হয়েছে। তার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো লম্বা ভ্রমণে ঠিকমতো ঘুমানো।
রিচার্ড বলেছেন, ‘আমি যখন এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাই, তখন পৌঁছানোর পরেই আমাকে কাজে নামতে হয়। তাই যদি বিমানে পুরোপুরি শুয়ে ঘুমানো না যায়, তবে শরীর খুব খারাপ লাগে। লাই-ফ্ল্যাট সিট বা পুরোপুরি সমতল আসন না থাকলে জেট ল্যাগ কাটানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।’
একবার টোকিও থেকে ওয়াশিংটন যাওয়ার পথে একটি নামী বিমানে তিনি বসে কাটিয়েছিলেন ১৪ ঘণ্টা। সেই বিমানের আসনগুলো পুরোপুরি সমতল হতো না, বরং ১০ ইঞ্চি উঁচু হয়ে থাকত। রিচার্ডের মতে, সেই যাত্রা ছিল তার জীবনের অন্যতম কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা।
সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর রিচার্ড এখন সিট ম্যাপ ভালো করে দেখে, তবেই কোনো টিকিট কাটেন। কিছু বিমানে ১-২-১ লেআউট থাকে, যেখানে কাউকে বিরক্ত না করেই সিট থেকে উঠে হাঁটাচলা করা যায়। এই ধরনের খোলামেলা সিটই তার বেশি পছন্দ।
রিচার্ড জানান, কিছু বিমানে মাঝখানের দুটি সিট এমনভাবে রাখা হয় যে ঘুমানোর সময় অজান্তেই পা লেগে যেতে পারে পাশের যাত্রীর সঙ্গে। এই অস্বস্তিকর অবস্থা এড়াতে তিনি এড়িয়ে চলেন নির্দিষ্ট কিছু বিমানের ডিজাইন। বিশেষ করে যেখানে পা রাখার জায়গা খুব সরু, সেখানে উঠতে চান না তিনি।
অনেকেই হয়তো জানেন না, বিমানের ইঞ্জিনের মডেল অনুযায়ী ভেতরের তাপমাত্রা আর আর্দ্রতা কম-বেশি হয়। রিচার্ড ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছেন যে বোয়িং ৭৮৭ বা এয়ারবাস A350-এর মতো নতুন বিমানগুলো অনেক বেশি শান্ত এবং আরামদায়ক হয়।
সেরা এয়ারলাইনস হিসেবে তিনি সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসকে এগিয়ে রাখেন। বিশেষ করে তাদের খাবারের মেনু মুগ্ধ করে তাকে। মাঝ আকাশে ৩৫ হাজার ফুট উঁচুতে বসে টাটকা লবস্টার বা সিঙ্গাপুরি নুডলস খাওয়ার অভিজ্ঞতাকে তিনি অনন্য বলে মনে করেন।
অনেকেই ভ্রমণ করতে চান বিজনেস ক্লাসের চেয়েও দামি ফার্স্ট ক্লাসে। কিন্তু রিচার্ড মনে করেন, ফার্স্ট ক্লাসের জন্য বাড়তি হাজার হাজার ডলার খরচ করাটা স্রেফ অপচয়। কারণ এখন প্রায় সবধরনের আধুনিক সুবিধাই পাওয়া যায় বিজনেস ক্লাসে।
রিচার্ডের মতে, অল্প দূরত্বের ফ্লাইটে বিজনেস ক্লাস টিকিট কেনাটা অনেক সময় লোকসান হতে পারে। ইউরোপের কিছু দেশে বিজনেস ক্লাস সিট আর ইকোনমি ক্লাসের সিটের মধ্যে বিশেষ কোনো তফাত থাকে না, যা তার কাছে মনে হয় রীতিমতো প্রতারণা।
রিচার্ডের পরামর্শ হলো, যদি আপনার টাকা কোম্পানি দেয় এবং পৌঁছানোর পরেই আপনার গুরুত্বপূর্ণ কোনো মিটিং থাকে, তবে বিজনেস ক্লাসই সেরা। কিন্তু আপনি যদি নিজের জমানো টাকায় পরিবার নিয়ে ঘুরতে যান, তবে সেই বাড়তি টাকা দিয়ে একটি ভালো হোটেলে থাকাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
সবশেষে তিনি জানান, টিকিট কাটার আগে অবশ্যই ইন্টারনেটে সিট ম্যাপ চেক করে নেওয়া উচিত। যে বিমানে পুরোপুরি শোয়ার ব্যবস্থা নেই, সেখানে বাড়তি টাকা দেওয়া উচিত নয়। আর মাইল বা পয়েন্ট ব্যবহার করে টিকিট কাটলে অনেক সময় সাশ্রয়ী হওয়া সম্ভব।






