শতাধিক মামলা
কোন ‘তালা’য় বন্দি ইমরান খান

ছবি: এআই
শতাধিক মামলা, একে একে সরেছে সাজা তবু কোন ‘তালা’য় জেলবন্দি ইমরানকখনও রাষ্ট্রীয় উপহার বিক্রির অভিযোগে তিন বছরের জেল। কখনও গোপন কূটনৈতিক বার্তা প্রকাশের মামলায় ১০ বছর। বিয়ের বৈধতা নিয়েও সাত বছরের কারাদণ্ড। স্ত্রী বুশরা বিবির সঙ্গে আরও একটি তোশাখানা মামলায় ১৪ বছরের সাজা। গত তিন বছরে ইমরান খানের সামনে একের পর এক বন্ধ হয়েছে জেলের দরজা। আবার আপিলে সেই তালার অনেকগুলোই খুলেও গেছে। কোনও সাজা স্থগিত, কোনও রায় বাতিল, কোনও মামলায় পুরোপুরি খালাস। তবু আদিয়ালা কারাগার থেকে বেরোতে পারছেন না পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। কারণ এখন তাঁর মুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা আল-কাদির ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার ১৪ বছরের সাজা। বর্তমানে এটিই তাঁর বিরুদ্ধে বহাল থাকা একমাত্র কার্যকর দণ্ড।
২০২২ সালের এপ্রিলে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে ইমরানের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা হয়েছে। দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য প্রকাশ, সহিংসতায় উসকানি থেকে ব্যক্তিগত জীবন... অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। ইমরানের দাবি, তাকে নির্বাচনী রাজনীতি থেকে সরিয়ে রাখতেই মামলার এই জাল তৈরি করা হয়েছে। পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী সেই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, আদালত স্বাধীন ভাবেই মামলাগুলোর বিচার করছে।
যে ১৪ বছর এখনও বহাল
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এখন আল-কাদির ট্রাস্ট বা ১৯ কোটি পাউন্ডের দুর্নীতি মামলা। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই মামলায় ইমরানকে ১৪ বছরের এবং বুশরা বিবিকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয় দুর্নীতিবিরোধী আদালত।
অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ইমরান ও তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠিত আল-কাদির ট্রাস্ট এক আবাসন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় ৭০০ কোটি পাকিস্তানি রুপি, অর্থাৎ প্রায় আড়াই কোটি ডলার মূল্যের জমি পেয়েছিল। বিনিময়ে ব্রিটেনে অর্থপাচার তদন্তের পর পাকিস্তানে ফেরত আসা প্রায় ১৯ কোটি পাউন্ড নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ওই ব্যবসায়ীকে অবৈধ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল বলে প্রসিকিউশনের দাবি। ইমরান ও বুশরা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, জমিটি ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য দেওয়া হয়েছিল।
এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল চলছে। আর সেখানেই ইমরানের মুক্তির সবচেয়ে বড় আশা। কারণ অন্য বড় মামলাগুলির সাজা একে একে সরে গেলেও আল-কাদিরের রায় এখনও কার্যকর।
তোশাখানা: যে মামলা দিয়ে শুরু জেলযাত্রা
ইমরানের বর্তমান দীর্ঘ কারাবাসের শুরু ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট। তোশাখানা মামলায় তিন বছরের সাজা হওয়ার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদের কাছ থেকে পাওয়া দামি উপহার সরকারি তোশাখানায় নথিভুক্ত করার নিয়ম রয়েছে। ইমরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, প্রায় ১৪ কোটি পাকিস্তানি রুপির বেশি মূল্যের ঘড়ি, অলংকার, সুগন্ধি ও অন্য উপহার নিজের কাছে রেখে পরে বিক্রি করেছেন এবং সম্পদ বিবরণীতে তার পূর্ণ তথ্য দেননি। তালিকায় ছিল সাতটি দামি ঘড়ি, যার ছয়টিই রোলেক্স। একটি সীমিত সংস্করণের ‘মাস্টার গ্রাফ’ ঘড়ির মূল্যই ছিল প্রায় সাড়ে আট কোটি রুপি।
প্রথম মামলার তিন বছরের সাজা পরে স্থগিত হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আর একটি তোশাখানা মামলায় ইমরান ও বুশরাকে ১৪ বছর করে সাজা দেওয়া হলেও সেটিও পরে স্থগিত করা হয়। আপিলের নিষ্পত্তি এখনও বাকি। ফলে তোশাখানার মামলা শেষ হয়ে যায়নি, কিন্তু ওই সাজাগুলি এখন তাঁকে জেলে রাখার মূল কারণ নয়।
‘সাইফার’-এর ১০ বছরও নেই
আর একটি বহুল আলোচিত মামলা ছিল রাষ্ট্রীয় গোপন নথি বা সাইফার মামলা। ২০২২ সালে ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের পাঠানো গোপন কূটনৈতিক বার্তার বিষয়বস্তু প্রকাশ করার অভিযোগ আনা হয় ইমরানের বিরুদ্ধে।
ইমরান ওই বার্তাকেই সামনে রেখে দাবি করেছিলেন, তার সরকার উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ষড়যন্ত্র হয়েছিল এবং পাকিস্তানের ক্ষমতাশালী সামরিক প্রতিষ্ঠানের অংশ তাতে ভূমিকা রেখেছিল। ওয়াশিংটন ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী দু’পক্ষই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে এই মামলায় ইমরানের ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়। কিন্তু পরে আপিলে সেই দণ্ড সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যায়।
বিয়ে নিয়েও সাত বছরের জেল
বুশরা বিবির আগের বিবাহবিচ্ছেদের পর ইসলামী বিধান অনুযায়ী ‘ইদ্দত’ শেষ হওয়ার আগেই ইমরানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল, এই অভিযোগেও দু’জনকে সাত বছর করে জেলে পাঠানো হয়েছিল।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে, জাতীয় নির্বাচনের কয়েক দিন আগে সেই সাজা দেওয়া হয়। ইমরান তখন অভিযোগ করেছিলেন, রাজনৈতিক ভাবে অপমান করতেই তার ব্যক্তিগত জীবন আদালতে টেনে আনা হয়েছে। পাঁচ মাস পর, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে, আপিল আদালত ইমরান ও বুশরা–দু’জনকেই মামলা থেকে খালাস দেয়।
অর্থাৎ তিন বছর, ১০ বছর, সাত বছর, ১৪ বছর–এক সময় যে সাজাগুলির স্তূপ দেখে ইমরানের দীর্ঘ কারাবাস প্রায় নিশ্চিত মনে হয়েছিল, তার অধিকাংশই এখন স্থগিত বা বাতিল।
কিন্তু ৯ মে এখনও বিপজ্জনক
আল-কাদিরের পাশাপাশি ইমরানের জন্য আর একটি বড় আইনি ঝুঁকি ২০২৩ সালের ৯ মে-র সহিংসতা।
ওই দিন আল-কাদির মামলায় ইমরানকে গ্রেপ্তারের পর পাকিস্তানজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি ভবন, সেনা সদর দপ্তরের প্রবেশপথ এবং লাহোরে এক সামরিক কর্মকর্তার বাসভবনসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুর হয়।
সরকারের অভিযোগ, পিটিআই নেতৃত্ব ও ইমরানের উসকানিতেই ওই সহিংসতা ঘটেছিল। ইমরান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বহু পিটিআই কর্মীর বিচার হয়েছে, কয়েক জন বেসামরিক ব্যক্তিকে সামরিক আদালতেও সাজা দেওয়া হয়েছে। ইমরানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে হওয়া সংশ্লিষ্ট মামলাগুলির বিচার এখনও চলছে। ফলে আল-কাদিরের সাজা আপিলে বাতিল হলেও ৯ মে-র মামলাগুলো তার সামনে নতুন বাধা তৈরি করতে পারে।
মামলা ছাপিয়ে এখন চিকিৎসা নিয়ে যুদ্ধ
এর মধ্যেই ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে সংঘাত তৈরি হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, কারাগারে তার একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। একটি চিকিৎসা প্রতিবেদনে ৭৩ বছরের ইমরানের ‘লেভেল থ্রি প্লাস’ উদ্বেগজনিত সমস্যার কথাও উঠে আসে, যার পর সুপ্রিমকোর্ট হস্তক্ষেপ করে।
১৮ আগস্ট পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, ইমরানকে আদিয়ালা কারাগার থেকে ইসলামাবাদের বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে। তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসককেও মেডিক্যাল বোর্ডে রাখার নির্দেশ ছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে শিফায় না নিয়ে সরকারি পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (পিমস) নেওয়া হয়। সেখানে কয়েক ঘণ্টা পরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা তাকে ‘মেডিক্যালি ফিট’ ঘোষণা করেন এবং ২১ আগস্ট ভোরে ফের আদিয়ালা জেলে পাঠানো হয়। সরকার বলেছে, শিফা হাসপাতালের পথে পিটিআই কর্মীদের জমায়েতের কারণে নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
পিটিআই সেই যুক্তি মানেনি। ২২ আগস্ট সুপ্রিমকোর্টে আদালত অবমাননার আবেদন করে দলটি। তাদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট হাসপাতাল, ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সরকার ইচ্ছাকৃত ভাবে সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ অমান্য করেছে।
সেনাবাহিনীর সঙ্গে কি বদলাচ্ছে সুর?
আইনি লড়াইয়ের পাশেই চলছে আর একটি রাজনৈতিক হিসাব। দীর্ঘদিন পিটিআই সমর্থকেরা পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব, বিশেষ করে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে ইমরানের বন্দিত্বের জন্য দায়ী করে আসছেন। ইমরানও মুনিরের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় সরব হয়েছেন।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী জুলফিকার বুখারি বলেছেন, ইমরান মুক্তি পেলে সেনাবাহিনী বা মুনিরের সঙ্গে এমন কোনও সংঘাতে যাবেন না, যাতে পাকিস্তানের ক্ষতি হয়। এটিকে সমঝোতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হলেও বুখারি একই সঙ্গে জানিয়েছেন, পিটিআই ও সেনাবাহিনীর মধ্যে এখন কোনও আনুষ্ঠানিক আলোচনা নেই। ইমরান নিজে এই নরম অবস্থানের সঙ্গে কতটা একমত, সেটিও স্পষ্ট নয়।
অন্য দিকে পিটিআই ২৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী কর্মসূচির পরিকল্পনা বহাল রেখেছে। তাদের দাবি, ইমরানের মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তি, পরিবার ও আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাৎ এবং তার মুক্তি।
তাই ইমরানের আইনি হিসাব এখন আপাতদৃষ্টিতে সহজ, অথচ রাজনৈতিক ভাবে ভয়ঙ্কর জটিল। সাইফারের ১০ বছর নেই, ইদ্দতের সাত বছর নেই, তোশাখানার সাজাগুলি স্থগিত কিন্তু আল-কাদিরের ১৪ বছর এখনও বহাল। সঙ্গে ঝুলছে ৯ মে-র একাধিক মামলা।
তিন বছর আগে একটি তোশাখানা রায় যে জেলযাত্রার দরজা বন্ধ করেছিল, সেই মামলার সাজাই আজ আর তাঁকে আটকে রাখছে না। একটির পর একটি তালা খুলেছে, কিন্তু নতুন তালা থেকে গেছে।
এখন তাই পাকিস্তানের সবচেয়ে আলোচিত বন্দিকে ঘিরে প্রশ্ন ‘কত মামলা’ নয়। প্রশ্ন হলো, আল-কাদিরের ১৪ বছর যদি আপিলে ভেঙে পড়ে, তখন কি সত্যিই খুলবে আদিয়ালার দরজা? না কি শতাধিক মামলার স্তূপ থেকে সামনে আসবে আর একটি নতুন তালা?






