ইউবা, আমার বাবা : যে মানুষটি কাতারকে বদলে দিয়েছিলেন

কাতারের প্রয়াত সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির সঙ্গে তার কন্যা আল মায়াসা। ছবি : আলজাজিরা
মৃত্যু কখনো কখনো একটি জাতিকে থামিয়ে দেয়। মানুষের ভিড়, নীরব কান্না এবং অসংখ্য স্মৃতির ভেতর তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে একজন মানুষের প্রকৃত অর্জন। কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির মৃত্যু যেন এমনই একটি মুহূর্ত।
এই শোক শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি জাতির; শুধু কাতারের নয়, বরং সেই আরব বিশ্বেরও, যার আত্মবিশ্বাস, মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি সারাজীবন ভেবেছেন।
কাতারের সাবেক আমিরের মৃত্যুতে শোকাহত দেশটির জনগণ ও রাজপরিবার। এই প্রেক্ষাপটে তার কন্যা শেখা আল মায়াসা বিনতে হামাদ বিন খলিফা আল থানি তার বাবাকে স্মরণ করে একটি আবেগঘন নিবন্ধ লিখেছেন। যেখানে তিনি শুধু একজন পিতাকেই নয়, বরং আধুনিক কাতারের স্থপতি, দূরদর্শী নেতা এবং মানবিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে শেখ হামাদের জীবন ও আদর্শকে তুলে ধরেছেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা প্রকাশিত আল মায়াসার নিবন্ধটি আগামীর সময়ের পাঠকদের সুবিধার্থে মৌলিকত্ব বজায় রেখে ভাষান্তর করে তুলে ধরা হলো :
আমাদের পরিবারে আমরা তাকে ডাকতাম ‘ইউবা’ নামে। এই শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ নেই, কিন্তু এর মধ্যে রয়েছে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং নিরাপত্তার এক গভীর অনুভূতি। আমার কাছে তিনি শুধু একজন বাবা ছিলেন না, ছিলেন শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং এমন এক নেতা, যিনি আমাকে শিখিয়েছেন— যা কিছু করা হবে, তা ব্যক্তিগত গৌরবের জন্য নয়; তা হতে হবে দেশের জন্য, মানুষের জন্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।
আমার বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল, তিনি নিজের আগে কাতারকে স্থান দিয়েছিলেন। আমাদের পারিবারিক আলাপের কেন্দ্রবিন্দুতে সবসময় ছিল দেশ। ছুটির দিন কিংবা কর্মদিবস—কোনো পার্থক্য ছিল না। রাষ্ট্রের উন্নয়ন, মানুষের জীবনমান, নতুন সম্ভাবনা এবং আগামী দিনের কাতার— এসব নিয়েই তিনি ভাবতেন।
তার মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত আকর্ষণ। তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি অন্যদের অসম্ভবকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করতেন। যে কাতার একসময় ছোট, সীমিত সম্পদের একটি উপসাগরীয় রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই কাতারকে তিনি রূপান্তরিত করেছিলেন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রে।
তার নেতৃত্বে অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী হয়েছে, তেমনি বিকশিত হয়েছে শিক্ষা, সংস্কৃতি, কূটনীতি এবং গণমাধ্যম। তিনি শুধু আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ করেননি; তিনি একটি নতুন জাতীয় আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছিলেন।
অনেক আরব তরুণ আমাকে বলেছেন, কাতারে এসে তারা প্রথমবারের মতো নিজেদের আরব পরিচয় নিয়ে গর্ববোধ করেছেন। এটি শুধু একটি দেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের গল্পও।
আমার বাবা ক্ষমতায় এসেছিলেন পরিবর্তনের জন্য এবং ক্ষমতা ছেড়েছিলেন ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা রেখে। তিনি বিশ্বাস করতেন, নেতৃত্ব কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি একটি দায়িত্ব। আর যখন একজন নেতা তার দায়িত্ব সম্পন্ন করেন, তখন নতুন প্রজন্মের হাতে সেই দায়িত্ব তুলে দেওয়াই উচিত।
আরব বিশ্বের ইতিহাসে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনা খুব কমই দেখা যায়। কিন্তু তিনি সেই ব্যতিক্রমী পথই বেছে নিয়েছিলেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রের স্বার্থ সবসময় ব্যক্তিগত অবস্থানের ঊর্ধ্বে।
আমার ভাই শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির প্রতি তার আস্থা ছিল অসীম। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি তার নেতৃত্ব নিয়ে গর্বের সঙ্গে কথা বলেছেন। আজ সময় প্রমাণ করেছে, তার সেই সিদ্ধান্ত ছিল দূরদর্শী এবং কাতারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমি ছিলাম সেই তরুণদের একজন, যাদের তিনি নেতৃত্বের সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিষয় হলো, আমি ছিলাম তার মেয়ে—এবং তিনি কখনো আমাকে তার ছেলেদের চেয়ে কম কিছু ভাবতে দেননি।
তিনি আমাকে শিখিয়েছেন যে স্বপ্ন দেখার কোনো সীমা নেই। তিনি আমাকে সাঁতার শিখিয়েছেন, গাড়ি চালাতে শিখিয়েছেন, পৃথিবী দেখতে শিখিয়েছেন এবং মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল—উদারতা।
তিনি আমাকে বিদেশে পড়াশোনা করতে পাঠিয়েছেন, নতুন সংস্কৃতি জানতে উৎসাহ দিয়েছেন এবং সবসময় নিজেকে চ্যালেঞ্জ করতে শিখিয়েছেন। তিনি চাইতেন আমরা পৃথিবীকে জানি, বুঝি এবং সেই অভিজ্ঞতা নিজেদের দেশকে এগিয়ে নিতে কাজে লাগাই।
একজন রাষ্ট্রনায়কের ব্যস্ত জীবনের মধ্যেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত যত্নশীল বাবা। তিনি ফোনে আমার কণ্ঠ শুনেই বুঝতে পারতেন আমি ভালো আছি কি না। যদি আমার কণ্ঠে সামান্য ক্লান্তিও টের পেতেন, তিনি বারবার খোঁজ নিতেন।
তার এই মানবিক দিকটি মানুষ খুব কমই দেখেছে। কিন্তু যারা তাকে কাছ থেকে চিনতেন, তারা জানেন—তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তাদের প্রতি আন্তরিক যত্ন নেওয়া।
২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর আমি তার সঙ্গে কাজ শুরু করি। এরপর আমরা বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ভ্রমণ করেছি। শিকাগো, নিউইয়র্ক, টোকিও কিংবা সিঙ্গাপুর—প্রতিটি সফর ছিল শেখার নতুন অভিজ্ঞতা।
তার কর্মস্পৃহা ছিল অবিশ্বাস্য। তিনি কখনো স্থির থাকতেন না। প্রতিটি অর্জনের পর তিনি নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করতেন।
আমার বয়স যখন ২৩ বছর, তখন তিনি আমাকে ইসলামিক আর্ট জাদুঘরের দায়িত্ব দেন। জাদুঘর উদ্বোধনের পরদিন আমি ভেবেছিলাম, হয়তো কিছুটা উদযাপনের সুযোগ থাকবে। কিন্তু তিনি শুধু একটি প্রশ্ন করেছিলেন—‘আমরা পরবর্তী কোন জাদুঘরটি তৈরি করছি?’
এই একটি প্রশ্নই তার চরিত্রকে ব্যাখ্যা করে। তিনি কখনো অতীতের সাফল্যে থেমে থাকেননি। তার দৃষ্টি সব সময় ছিল সামনে।
তিনি বিশ্বাস করতেন, সংস্কৃতি একটি জাতির বিলাসিতা নয়; এটি তার উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। তাই তিনি জাদুঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক অবকাঠামো নির্মাণকে জাতীয় অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।
তার সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল সেন্সরশিপ বিলুপ্ত করা এবং আলজাজিরা প্রতিষ্ঠা করা। এটি শুধু কাতারের জন্য নয়, সমগ্র আরব বিশ্বের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল।
তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী না করে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। তাই তিনি শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম এবং সৃজনশীলতাকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন।
তিনি সংলাপে বিশ্বাস করতেন। মতবিরোধকে তিনি কখনো সংঘাত হিসেবে দেখেননি। বরং তিনি মনে করতেন, ভিন্নমতই ভালো সিদ্ধান্তের পথ খুলে দেয়।
তার কাছে সব সিদ্ধান্তের একটাই মানদণ্ড ছিল—কাতারের সর্বোত্তম স্বার্থ।
বিকালের দিকে তিনি প্রায়ই নতুন উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শনে যেতেন। কখনো সাধারণ মানুষের বাড়িতেও যেতেন, তাদের খোঁজখবর নিতে। তিনি জনগণের কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসতেন।
কোনো শিশু, কোনো প্রবীণ কিংবা কোনো সাধারণ নাগরিক তার হাসি থেকে বঞ্চিত হননি।
দূরদর্শী নেতার আড়ালে তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ স্বামী, বাবা এবং দাদা। পরিবারের প্রতি তার ভালোবাসা এবং সম্মান ছিল গভীর।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে নেতৃত্ব মানে শুধু নির্দেশ দেওয়া নয়; নেতৃত্ব মানে উদাহরণ সৃষ্টি করা।
আজ যখন বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ কাতারে এসে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন, তখন আমরা তার সবচেয়ে বড় সৃষ্টি দেখতে পাচ্ছি—একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি।
একজন মানুষের মৃত্যু তার পদ বা ক্ষমতাকে মুছে দেয়, কিন্তু তার ভালোবাসা এবং উত্তরাধিকারকে মুছে দিতে পারে না।
আমার বাবাকে সম্মান জানানোর অর্থ হলো—ঐক্যবদ্ধ থাকা, কঠোর পরিশ্রম করা এবং আমাদের দেশ ও অঞ্চলের জন্য সর্বোত্তম কিছু অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, অসম্ভব বলে কিছু নেই। প্রয়োজন শুধু সাহস, দৃষ্টি এবং মানুষের প্রতি অটুট বিশ্বাস।
আগামী দিনে যখন আমরা আবার কাজে ফিরব, তখন আমাদের আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। নিজেদের সর্বোত্তম সংস্করণে পরিণত হতে হবে। বিনয়ী, উদার এবং মানবিক থাকতে হবে— যেমনটি তিনি আমাদের শিখিয়েছেন।
আমার কাছে তিনি শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ক নন। তিনি ছিলেন আমার ‘ইউবা’—আমার প্রিয় বাবা, যার স্মৃতি এবং শিক্ষা আমাদের পথ দেখিয়ে যাবে বহু বছর ধরে।
ভাষান্তর : মাহমুদুল হাসান রিফাত









