গাজার প্রতি সাত পরিবারের একটি নারীপ্রধান

যুদ্ধের ধাক্কায় বিপর্যস্ত গাজার এক নারী। ফাইল ছবি
যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছে ঘর, স্বজন ও স্বাভাবিক জীবন। বাস্তুচ্যুতির কঠিন বাস্তবতায় খাবার, পানি আর সন্তানদের বেঁচে থাকার সংগ্রামেই দিন কাটছে গাজার অনেক নারীর। স্বামী হারিয়ে একাই পরিবার সামলাতে হচ্ছে বহু নারীকে। জাতিসংঘের তথ্য বলছে, এখন গাজার প্রায় প্রতি সাতটি পরিবারের একটি নারীপ্রধান।
জাতিসংঘের সংস্থা ইউএন উইমেনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর গাজায় প্রায় ১৬ হাজার নারী স্বামী হারিয়েছেন। ফলে গাজায় প্রায় ১৪% পরিবার এখন নারীপ্রধান পরিবার।
এমন অসংখ্য বাস্তুচ্যুত ও স্বজনহারা নারীর জন্য গাজায় তৈরি হয়েছে একটি ’'’, যেখানে তারা বলতে পারছেন নিজেদের কষ্ট, ভয় ও অভিজ্ঞতার কথা। দেইর আল-বালাহ এলাকায় চালু হওয়া এই উদ্যোগে নারীদের দেওয়া হচ্ছে মানসিক সহায়তা, সচেতনতা সেশন এবং যুদ্ধের চাপ মোকাবিলায় ব্যবহারিক পরামর্শ।
বুধবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীদের জন্য এই ’নিরাপদ স্থান’ উদ্যোগ পরিচালনা করছে কালেকটিভ ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টস। এখানে দলীয় আলোচনা, মানসিক সহায়তা এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন যুদ্ধের মধ্যে থাকা নারীরা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আল-আমাল ক্যাম্পের এক তাঁবুতে পাঁচ সন্তান নিয়ে বাস করেন ৩৯ বছর বয়সী ওলা সালেহ। প্রতিদিন সকাল ৯টার দিকে সন্তানদের সামলে তাবুঁ থেকে বের হন তিনি। কয়েক মিনিট হেঁটে পৌঁছে যান আরেক তাবুঁতে; যা নারীদের জন্য নির্ধারিত ’নিরাপদ স্থান’। সেখানে কয়েক ঘণ্টার জন্য তিনি সুযোগ পান মা হিসেবে দায়িত্ব, বাস্তুচ্যুতি ও শোকের ভার থেকে কিছুটা দূরে থাকার।
গত বছরের আগস্টে স্বামী আবদুল জলিল সালেহকে হারান ওলা। পরিবারের জন্য খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে যাওয়ার সময় নিহত হন তিনি। স্বামীর মৃত্যুর পর পাঁচ সন্তানকে একাই বড় করছেন ওলা।
তিনি জানান , প্রতিটি দিন মনে হয় আগের দিনের চেয়ে কঠিন। বাড়ছে দায়িত্ব এবং আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে স্বামীর অনুপস্থিতির ভার ।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার অনেক নারীরই নেই শোক প্রকাশের সুযোগ। বিদ্যুৎ ও পর্যাপ্ত সুবিধাবিহীন তাঁবুতে বসবাস করে তাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হচ্ছে খাবার, পানি ও সন্তানদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার জন্য।
নারীদের জন্য এই 'নিরাপদ স্থান'এর মাঠ সমন্বয়ক আলা দাউদ বলেন, উদ্যোগটির লক্ষ্য হলো নারীদের এমন একটি পরিবেশ দেওয়া, যেখানে তারা স্বাধীনভাবে বলতে পারেন নিজেদের কথা এবং পেতে পারেন মানসিক ও ব্যবহারিক সহায়তা।
গাজার মধ্যাঞ্চলের আল-ফারাহ স্কুলে এই কার্যক্রম শুরু হয় গত সপ্তাহে। ভবিষ্যতে এটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে গাজার অন্যান্য বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থলেও। উত্তর গাজাতেও চলছে একই ধরনের কার্যক্রম।
সেশনগুলোতে আলোচনা করা হয় পারিবারিক চাপ, অর্থনৈতিক সংকট, মানসিক স্বাস্থ্য এবং বাস্তুচ্যুত অবস্থায় সন্তান লালন-পালনের মতো বিষয় নিয়ে। কার্যক্রম শুরুর প্রথম দিন অংশ নেন প্রায় ৬০ জন নারী। পরে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেড়ে পৌীঁছায় ৭০ থেকে ৭৫ জনে।
ওলা সালেহ বলেন, এই সেশন তার কষ্ট দূর করে না, তবে তা সহনীয় করে তোলে। এখানে এসে তিনি আশা ও ইতিবাচক শক্তি পান।
এই উদ্যোগে অংশ নেওয়া ৬৩ বছর বয়সী সুয়াদ আল-গারাবালি নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে সহায়তা করছেন অন্য নারীদের। যুদ্ধের আগে তিনি থাকতেন গাজা সিটির শুজাইয়া এলাকায়। বাড়ি ধ্বংস হওয়ার পর বাস্তুচ্যুত হয়ে এখন থাকছেন দেইর আল-বালাহতে ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে একটি তাঁবুতে।
যুদ্ধে তিনি হারিয়েছেন দুই ছেলেকে। ২৪ ও ৩৫ বছর বয়সী ওই দুই ছেলে নিহত হন পৃথক বিমান হামলায়। নিজের কষ্টের মধ্যেও তিনি তরুণ মায়েদের পরার্মশ দেন সন্তান লালন-পালন ও কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায়।
আলা দাউদের মতে, এসব ‘নিরাপদ স্থান’ শুধু কাউন্সেলিংয়ের জায়গা নয়, বরং যুদ্ধের সময়ে গাজার নারীরা যে বিশাল দায়িত্ব বহন করেছেন, তার স্বীকৃতিও। নারীরা দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি ও প্রচণ্ড চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের ভূমিকা ও ত্যাগ স্বীকার করা হলে তারা অনুভব করেন যে তাদের কষ্টের মূল্যায়ন হচ্ছে।




