ইসরায়েলি বোমার পাশাপাশি গাজায় নতুন আতঙ্কের নাম ইঁদুর

গাজা সিটির শরণার্থী শিবিরের আশ্রয় নেওয়া ৬৩ বছর বয়সী ইনশিরাহ হাজ্জাজ ইঁদুরের কামড়ে ক্ষত পা নিয়ে ভর্তি হন হাসপাতালে। ছবি: সংগৃহীত
রাতে গাজায় নামে অদ্ভূত নিস্তব্ধতা। এই নিস্তব্ধতা শান্তির নয়, বরং মৃত্যুর প্রতীক্ষার। প্রায় আড়াই বছর ধরে ইসরায়েলি বোমার কালো ছায়া জ্বালিয়ে দিয়েছে এখানকার প্রায় প্রতিটি বাড়ি। যেখানে ছিল আদরের ঠিকানা, সেখানে এখন শুধু ধ্বংসস্তূপের পাহাড়। আর সেই ধ্বংসস্তূপের পাশে, জীর্ণ তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছে লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি।
তাদের ঘর নেই, নিশ্চিন্ত ঘুম নেই, আছে শুধু যুদ্ধের ধুলো আর বেঁচে থাকার অনবরত লড়াই। প্রতিটি নিশ্বাসেই ভেসে আসে গুঁড়িয়ে যাওয়া ভবনের গন্ধ। আর প্রতিটি রাত যেন নতুন এক অনিশ্চয়তার গল্প লিখে যায়।
এই ভাঙা আশ্রয়গুলোর ভেতরেই এখন আরেক অদৃশ্য শত্রু ইঁদুর। তাদের রাজত্ব সবখানে। রাত নামলেই এরা ঢুকে পড়ে তাঁবুতে খাবারের খোঁজে। আবার কখনো কখনো ঘুমন্ত মানুষের শরীরেও রেখে যায় ভয়াবহ ক্ষতচিহ্ন। গাজার শরণার্থী শিবিরে ইঁদুর যেন এখন আতঙ্কের আরেক নাম। যেভাবে ইসরায়েলের বোমার ভয়ে থাকেন শরণার্থীরা, ঠিক একইভাবে তাদের মেনে জেঁকে বসেছে লম্বা লেজবিশিষ্ট এ স্তন্যপায়ীর ভয়।
গাজার একটি শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা ৬৩ বছর বয়সী ইনশিরাহ হাজ্জাজ। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তিনি। বয়সের ভাড়ে অসাড় হয়ে গেছে পা দুটোও। নিজের তাঁবুতে ঘুমানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি। একটি ছোট ইঁদুর ঘোরাফেরা করছিল তার বালিশের পাশে। সেটিকে উপেক্ষা করেই শুয়ে ছিলেন তিনি। রাতে কোনো এক সময় ইঁদুর ধীরে ধীরে খেতে শুরু করে তার পায়ের আঙুল। তিনি টের পাননি। পরদিন সকালে ক্ষতটি দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি।
ইনশিরাহ হাজ্জাজ বলেছেন, তখন মনে হয়েছিল, হয়তো তাঁবুর ভেতরে কোথাও পা লেগেছে, তাই ব্যথা বুঝিনি। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে আঙুল ফুলে যায়, নীল হয়ে ওঠে। এরপর প্রায়ই ঘুম থেকে উঠে নতুন নতুন ক্ষত দেখতে পান তিনি।
কয়েক মাস ধরেই ইঁদুরের উপদ্রবের সঙ্গে লড়াই করছেন গাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা। ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে ধ্বংস হয়েছে গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়ি। বর্তমানে গাজার ২২ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করছেন অস্থায়ী আশ্রয়ে।
কাঁচামালের তীব্র সংকট এবং নির্মাণসামগ্রী প্রবেশে ইসরায়েলের নিষেধাজ্ঞার কারণে তৈরি করেছে অপরিকল্পিত স্যানিটেশন ব্যবস্থা। অপরিষ্কার পানি ও বর্জ্য জমে থাকায় দ্রুত বংশবিস্তার করছে ইঁদুর ও পোকামাকড়।
হাজ্জাজ জানান, ক্ষত পা নিয়ে গাজার একটি ফিল্ড হাসপাতালে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে পরীক্ষা শেষে চিকিৎসক জানান, তার পা বিষক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে। আঙুলের দাগগুলো ইঁদুরের কামড়ের চিহ্ন।
চিকিৎসকেরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, ইঁদুরের কামড় ও আঁচড় হতে পারে প্রাণঘাতী। বিশেষ করে অবরোধের কারণে অ্যান্টিবায়োটিক ও চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতির মধ্যে।
এই শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় হাজ্জাজ একা নন। অন্যান্য একই ধরনের আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন শত শত মানুষ।
একই ধরনের ভয়াবহ ঘটনার শিকার হয়েছেন ইউসুফ আল-উস্তাজের ২৮ দিনের শিশু সন্তান আদম। রাতে শিশুর কান্না শুনে ঘুম ভেঙে গেলে মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে তিনি দেখেন, শিশুর মুখ রক্তে ভেজা।
ইউসুফ আল-উস্তাজ বলেছেন, ভয় আর শকে আমি স্থবির হয়ে গিয়েছিলাম। দেখি আমার শিশুর মুখ রক্তে ভরা, অসহ্য যন্ত্রণায় কাঁদছে। পরে তাঁবুর ভেতরে একটি বড় ইঁদুরও দেখতে পান তিনি।
শিশুটিকে দ্রুত রান্তিসি হাসপাতালে নেওয়া হলে তার গালে ইঁদুরের দাঁতের দাগ দেখতে পান চিকিৎসকেরা।
গাজার বিভিন্ন হাসপাতালে এ ধরনের শত শত শিশুর চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ইঁদুরের উপদ্রবের কারণে হজম ও শ্বাসতন্ত্রের রোগও বাড়ছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৬০ লাখ টনের বেশি ধ্বংসস্তূপ জমে আছে গাজায়। যা পরিষ্কার করতে সময় লাগতে পারে বহু বছর। প্রতি ব্যক্তির চারপাশে গড়ে প্রায় ৩০ টন ধ্বংসাবশেষ রয়েছে।
গাজা সিটি করপোরেশনের মুখপাত্র হুসনি মুহান্না বলেছেন, প্রতিদিন হাজারো অভিযোগ পেলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না ইঁদুরের সমস্যা। এই বিপর্যয়ের পরিমাণ আমাদের সক্ষমতার অনেক বাইরে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএও সম্প্রতি তাদের প্রতিবেদনে বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়স্থলে ইঁদুরের বিস্তার নিশ্চিত করে জরুরি ভিত্তিতে কীটনাশক ও প্রয়োজনীয় উপকরণের আহ্বান জানিয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা



