বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনেও সৌদি আরব কেন নিরাপদ নয়?

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান— রয়টার্স
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক ব্যয়কারী দেশ সৌদি আরব। অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, শক্তিশালী রাডার, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং থাডের মতো প্রযুক্তি রয়েছে দেশটির হাতে। এসব অস্ত্র সংগ্রহে ব্যয় হয়েছে বিপুল অর্থ। তারপরও ইয়েমেনের হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুরোপুরি রক্ষা করতে পারছে না রিয়াদ। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, এত বিপুল সামরিক বিনিয়োগের পরও সৌদি আরবের নিরাপত্তায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে কেন? সমস্যা কি মার্কিন অস্ত্রের কার্যকারিতায়, নাকি আধুনিক যুদ্ধের পরিবর্তিত বাস্তবতায়?
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ এই প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সৌদি আরবের সামরিক ব্যয় ছিল প্রায় ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। অথচ দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো এখনো হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর কারণ বুঝতে হলে শুধু অস্ত্রের দাম বা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বিবেচনা করলে চলবে না। দেখতে হবে ভূগোল, যুদ্ধকৌশল, সামরিক সরবরাহ, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক রাজনীতির সামগ্রিক চিত্র।
প্রথমেই সৌদি আরবের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রায় ২১ লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে। পূর্বাঞ্চলে তেলক্ষেত্র ও শোধনাগার, মধ্যাঞ্চলে রাজধানী রিয়াদ, পশ্চিমাঞ্চলে বন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো এবং দক্ষিণে ইয়েমেন সীমান্ত। ফলে কয়েকটি অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা স্থাপন করেই গোটা দেশকে সমানভাবে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়।
হুমকিও আসছে একাধিক দিক থেকে। পূর্বদিকে ইরান, উত্তরে ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং দক্ষিণে ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলেছে। প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কোথায় মোতায়েন করা হবে, কোন স্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং সীমিতসংখ্যক ইন্টারসেপ্টর কীভাবে ব্যবহার করা হবে- এসব সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে। প্যাট্রিয়টকে অকার্যকর বলা যেমন ভুল, তেমনি এটিকে অভেদ্য প্রতিরক্ষাকবচ মনে করাও বাস্তবসম্মত নয়। প্যাট্রিয়টের PAC-2 সংস্করণ বিমান ও বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবেলায় ব্যবহৃত হয়। উন্নত PAC-3, বিশেষ করে PAC-3 MSE, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে বিশেষভাবে তৈরি। এটি সরাসরি আঘাতের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে।
বাস্তব যুদ্ধেও প্যাট্রিয়ট বহু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তার উদাহরণ। কিন্তু এর সফলতা নির্ভর করে লক্ষ্যবস্তুর গতি, উচ্চতা, গতিপথ, রাডারের তথ্য, প্রতিক্রিয়ার সময় এবং একই সঙ্গে কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র আসছে তার ওপর। কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থার শতভাগ সফলতার নিশ্চয়তা নেই।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হুথিদের পরিবর্তিত যুদ্ধকৌশল। তারা এখন শুধু প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভর করছে না। ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সমন্বিতভাবে ব্যবহার করছে। একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়।
বিশেষ করে নিচু দিয়ে উড়ে আসা ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। পৃথিবীর বক্রতা, পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং রাডারের অবস্থান শনাক্তকরণের সময় কমিয়ে দেয়। ফলে অত্যাধুনিক রাডার থাকলেও সব লক্ষ্যবস্তু যথেষ্ট আগে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। প্যাট্রিয়টের কার্যকারিতা তাই শুধু ইন্টারসেপ্টরের প্রযুক্তির ওপর নয়, গোটা প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ এই সংকটকে তীব্র করেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএসআইএসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তার যুদ্ধপূর্ব প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর মজুতের আনুমানিক ৬৫ শতাংশ ব্যবহার করেছে। ফলে নতুন কোনো বড় সংঘাত মোকাবেলায় মজুত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে এই পরিসংখ্যানের অর্থ এই নয় যে সৌদি আরবের জন্য কেনা বা সরবরাহ করা ৬৫ শতাংশ ইন্টারসেপ্টর যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করেছে। মার্কিন সামরিক মজুত এবং সৌদি আরবের নিজস্ব মজুত আলাদা বিষয়। সৌদি আরবও ইরান ও হুথিদের হামলা প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিন্তু সৌদি বাহিনীর বর্তমান মজুতের নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশিত হয়নি।
একইভাবে ইরানের হামলায় কিছু মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার রাডার ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও সৌদি আরবের সব প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে-এমন সিদ্ধান্তের ভিত্তি নেই। ইন্টারসেপ্টর ফুরিয়ে যাওয়া, রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং একটি প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়া- তিনটি ভিন্ন ঘটনা।
আরেকটি বড় সমস্যা অর্থনৈতিক। একটি PAC-3 ইন্টারসেপ্টরের আনুমানিক মূল্য ৪০ থেকে ৫০ লাখ ডলার। অন্যদিকে আক্রমণকারী তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ব্যবহার করতে পারে। অর্থাৎ স্বল্পমূল্যের অস্ত্র প্রতিহত করতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষাকারীর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে। একাধিক ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হলে এই ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
এই অসম ব্যয়ের যুদ্ধই আধুনিক সংঘাতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আক্রমণকারীকে সব ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে হয় না। কয়েকটি সফল আঘাতেই বিমান চলাচল, তেল সরবরাহ, বিনিয়োগ এবং জনমনে নিরাপত্তাবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এখানে থাড প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও বোঝা প্রয়োজন। থাড মূলত উচ্চতায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য তৈরি। এটি প্যাট্রিয়টের বিকল্প নয়; বরং দুই ব্যবস্থা পরস্পরের পরিপূরক। নিচু দিয়ে আসা ছোট ড্রোনের বিরুদ্ধে থাড ব্যবহার করা এর প্রধান কাজ নয়। তাই শুধু থাড ও প্যাট্রিয়টের সংখ্যা বাড়ালেই সব ধরনের হামলা ঠেকানো যাবে না।
সৌদি আরবের নিজস্ব সামরিক পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। উন্নত অস্ত্র কেনার পাশাপাশি সেগুলোকে সমন্বিত কমান্ড, গোয়েন্দা তথ্য, আগাম সতর্কতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। সম্প্রতি রিয়াদের বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার আগে জনসাধারণকে পর্যাপ্ত সতর্কবার্তা না দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণরক্ষা একই নিরাপত্তাব্যবস্থার দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এ ছাড়া আকাশ প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ প্রতিরোধের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে ধ্বংস করা সম্ভব হলেও পরবর্তী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ বন্ধ করা আলাদা সামরিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ইয়েমেনের পাহাড়ি অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা মোবাইল লঞ্চার, গোপন স্থাপনা এবং দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হুথিদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। শুধু আকাশ প্রতিরক্ষা দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার মূল্যায়নেও ভারসাম্য প্রয়োজন। মার্কিন প্রযুক্তি সৌদি আরবকে উল্লেখযোগ্য প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দিয়েছে। বহু হামলা প্রতিহত হয়েছে এই ব্যবস্থাগুলোর সাহায্যে। কিন্তু অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং সৌদি আরবের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার রাজনৈতিক অঙ্গীকার এক বিষয় নয়। একইভাবে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ঘাটতির সম্পূর্ণ দায় ওয়াশিংটনের ওপর চাপানোও যুক্তিসংগত নয়।
সৌদি নেতৃত্বের সামনে তাই একটি বৃহত্তর কৌশলগত প্রশ্ন রয়েছে। শুধু আরও অস্ত্র কেনা, নাকি প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার জরুরি? আসলে কার্যকর বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা, সাশ্রয়ী ড্রোনবিধ্বংসী প্রযুক্তি, উন্নত রাডার সমন্বয়, পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর মজুত এবং নির্ভরযোগ্য বেসামরিক সতর্কতাব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর কূটনৈতিক উদ্যোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরবের বর্তমান অভিজ্ঞতা আধুনিক যুদ্ধের একটি মৌলিক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। বিপুল সামরিক ব্যয় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে পারে, কিন্তু পূর্ণ নিরাপত্তা কিনে দিতে পারে না। প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের পাশাপাশি প্রয়োজন সঠিক কৌশল, কার্যকর সমন্বয়, দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, এসব প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের কৌশল রপ্ত করা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু কেন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করা যাচ্ছে- তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন রয়েছে। সেটি হলো- যে অঞ্চলে সংঘাতের উৎসগুলো বিদ্যমান, সেখানে কেবল অস্ত্রের শক্তি দিয়ে কতদিন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব?
লেখক: সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক





