পিকি ব্লাইন্ডার্স
কোটি কোটি জাল পাউন্ডের সেই রহস্যময় ইতিহাস
- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাল পাউন্ড ছাপিয়ে ব্রিটিশ অর্থনীতি ধ্বংসের চেষ্টা চালায় নাৎসিরা
- প্রায় ৯০ লাখ জালনোট তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়
- ১৯৪৩ সালে মরক্কোর একটি ব্রিটিশ ব্যাংকে প্রথম জালনোট শনাক্ত হয়

ব্রিটিশ বাজারে জাল টাকা ছড়ানোর পরিকল্পনায় টিম রথের চরিত্র—সংগৃহীত
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধ শুধু বন্দুক, বোমা কিংবা ট্যাংকের মধ্যেই ছিল না সীমাবদ্ধ। ছায়ার আড়ালে চলছিল আরও ভয়ংকর কিছু পরিকল্পনা। এমনই এক পরিকল্পনা ছিল ব্রিটিশ অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার। আর সেই অস্ত্রে ছিল না কোনো মিসাইল বা যুদ্ধবিমান। ছিল জাল টাকা।
শুনতে সিনেমার গল্পের মতো লাগলেও, এটি ছিল বাস্তব। ইতিহাসে ‘অপারেশন বার্নহার্ড’ নামে পরিচিত সেই গোপন অভিযানে নাৎসি জার্মানি তৈরি করেছিল কোটি কোটি জাল ব্রিটিশ পাউন্ড। উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটেনের অর্থনীতিকে ভেঙে ফেলা, বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা এবং যুদ্ধের গতি নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসা।
এই অভিযানের নামকরণ করা হয়েছিল এসএস কর্মকর্তা ফ্রিডরিখ বার্নহার্ড ক্রুগারের নাম অনুসারে। বার্লিনের কাছাকাছি সাখসেনহাউজেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ১৪০ জনেরও বেশি ইহুদি বন্দিকে আলাদা করে রাখা হয়। তাদের অনেকেই ছিলেন দক্ষ শিল্পী, খোদাই বিশেষজ্ঞ, ছাপাখানার কর্মী কিংবা ব্যাংকিং বিষয়ে অভিজ্ঞ মানুষ। মৃত্যু-ভয়কে সামনে রেখে তাদের বাধ্য করা হয় ব্রিটিশ ব্যাংকনোটের হুবহু নকল তৈরি করতে।
মানুষ নয়, এআই চালাবে দেশ!
১৬ মে ২০২৬
তখনকার ব্রিটিশ নোটগুলো ছিল বর্তমান সময়ের নোটের তুলনায় অনেক সহজ। সাদা তুলাভিত্তিক কাগজে কালো কালি দিয়ে লেখা থাকত ব্যাংকের তথ্য, স্বাক্ষর ও নিরাপত্তা চিহ্ন। আকারেও ছিল বড়, প্রায় একটি এ-ফাইভ কাগজের মতো। কিন্তু সরল দেখতে হলেও নোটগুলোর ভেতরে ছিল অসংখ্য গোপন নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য।
বন্দিদের দিনের পর দিন আসল নোট পরীক্ষা করতে হতো। প্রতিটি দাগ, প্রতিটি চিহ্ন, প্রতিটি রেখা নিখুঁতভাবে নকল করতে বাধ্য করা হয়েছিল তাদের। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় ১৫০ ধরনের নিরাপত্তা চিহ্ন শনাক্ত করা হয়েছিল। যেগুলো জাল নোটেও হুবহু বসাতে হয়েছিল।
ধীরে ধীরে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় কাজটি যে আসল আর নকল নোট আলাদা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক সময় ব্যাংক কর্মকর্তারাও বিভ্রান্ত হয়ে যেতেন।
নাৎসিদের প্রথম পরিকল্পনা ছিল ভয়ংকর। তারা চেয়েছিল বিমান থেকে ব্রিটেনের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ জাল নোট ছড়িয়ে দিতে। হঠাৎ বাজারে এত টাকা চলে এলে মূল্যস্ফীতি তৈরি হবে। মানুষের আস্থা কমে যাবে এবং ব্রিটিশ অর্থনীতি ভেঙে পড়বে, এমনটাই ছিল তাদের ধারণা।
তবে পরে পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হয়। সেই জাল টাকা ব্যবহার করা হতে থাকে গুপ্তচরদের অর্থায়ন, অস্ত্র কেনা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক লেনদেনে। নিরপেক্ষ দেশগুলোতেও এসব নোট ব্যবহার করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
অপারেশন বার্নহার্ডে ঠিক কতগুলো জাল নোট তৈরি হয়েছিল। তার সুনির্দিষ্ট হিসাব আজও পাওয়া যায়নি। তবে অভিযানে যুক্ত বন্দিদের একজন অস্কার স্টেইনের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৯০ লাখ জাল নোট তৈরি হয়েছিল। বর্তমান সময়ের হিসাবে যার মূল্য প্রায় ৫ বিলিয়ন পাউন্ডের সমান।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় ছিল—এই পুরো কাজটি করানো হয়েছিল এমন মানুষদের দিয়ে, যাদের অনেককেই পরে হত্যা করা হতো। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের বন্দিদের কাছে এটি ছিল বেঁচে থাকার এক নিষ্ঠুর লড়াই। কাজ করতে পারলে হয়তো আরও কিছুদিন বাঁচার সুযোগ মিলবে, আর ব্যর্থ হলেই অপেক্ষা করছিল মৃত্যু।
তবুও বন্দিরা নিখুঁতভাবে কাজটি করেছিল। কারণ তারা জানত, সামান্য ভুলও তাদের জীবনের শেষ ভুল হতে পারে। কিন্তু এত বড় পরিকল্পনাও শেষ পর্যন্ত একটি ছোট ভুলের কারণে ধরা পড়ে যায়।
ব্রিটিশ ব্যাংকনোটের প্রতিটির ছিল আলাদা সিরিয়াল নম্বর। জাল নোট তৈরি করা গেলেও সেই সিরিয়াল নম্বর তৈরির গোপন পদ্ধতি পুরোপুরি বুঝতে পারেনি নাৎসিরা। ফলে কিছু পুরোনো নম্বর বারবার ব্যবহার করা হচ্ছিল।
১৯৪৩ সালে মরক্কোর একটি ব্রিটিশ ব্যাংকে জমা পড়া একটি নোট প্রথম সন্দেহ তৈরি করে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে যাচাইয়ের সময় দেখা যায়, একই সিরিয়াল নম্বরের একটি নোট আগেই জমা পড়েছিল। তখনই ধরা পড়ে যায় বিশাল এই জালিয়াতির ঘটনা।
এরপর ব্রিটিশ সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। পাঁচ পাউন্ডের বেশি মূল্যমানের সব নোট বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়। যুদ্ধের কারণে এমন সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত কঠিন। কারণ তখন ব্রিটিশ মুদ্রা শুধু দেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহৃত হতো।
দীর্ঘ সময় বড় অঙ্কের নোট আর বাজারে ফেরানো হয়নি। ১০ ডলার নোট ফিরে আসে ১৯৬৪ সালে, ২০ ডলার আসে ১৯৭০ সালে এবং ৫০ ডলার নোট আবার চালু হয় ১৯৮১ সালে।
এই ঘটনার পর ব্রিটিশ নোটের নকশাতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়। নতুন নোটে রং যোগ করা হয়, নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য আরও জটিল করা হয়। যাতে ভবিষ্যতে এত বড় জালিয়াতি আর সম্ভব না হয়।
যুদ্ধের শেষ দিকে অপারেশন বার্নহার্ডে জড়িত বন্দিদের অস্ট্রিয়ায় সরিয়ে নেওয়া হয়। পরিকল্পনা ছিল সেখানে আবার জাল নোট তৈরির কাজ শুরু হবে। কিন্তু যুদ্ধের মোড় তখন বদলে গেছে। মিত্রবাহিনী দ্রুত এগিয়ে আসছিল। একসময় বন্দিদের হত্যা করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। মিত্রবাহিনীর হাতে মুক্তি পান তারা।
ধারণা করা হয়, যুদ্ধের শেষ দিকে অধিকাংশ জাল নোট পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল অথবা অস্ট্রিয়ার টপলিটজ হ্রদে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। পরে ১৯৫০-এর দশকে ডুবুরিরা হ্রদের তলদেশ থেকে কিছু জাল নোট উদ্ধার করেন। সেগুলোই আজ ইতিহাসের এক ভয়ংকর অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে আছে।
সম্প্রতি এই ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে জনপ্রিয় সিরিজ পিকি ব্লাইন্ডার্সের নতুন কাহিনিকে কেন্দ্র করে। বাস্তব এই ইতিহাসের নানা অংশ ব্যবহার করা হয়েছে নতুন গল্পে। ফলে অনেক মানুষ প্রথমবারের মতো জানতে পারছেন নাৎসিদের সেই ভয়ংকর জাল নোট অভিযানের কথা।
বর্তমানে কিছু জাল নোট জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। সংগ্রাহক অ্যান্ডি টেইলর তার ব্যক্তিগত সংগ্রহের বড় অংশ দান করেছেন হলোকাস্ট সেন্টার নর্থে। তার ভাষায়, এগুলো শুধু জাল টাকা নয়, ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী।
কারণ এই নোটগুলোর প্রতিটি পাতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধ, ভয়, বেঁচে থাকার সংগ্রাম। মানুষের অমানবিকতার এক অন্ধকার অধ্যায়।
আজও অপারেশন বার্নহার্ড ইতিহাসবিদ, গবেষক ও সাধারণ মানুষের কাছে বিস্ময়ের বিষয় হয়ে আছে। কারণ এটি শুধু জাল নোট তৈরির গল্প নয়, বরং যুদ্ধের সময় অর্থনীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের এক ভয়ংকর উদাহরণ।
নাৎসিরা বুঝেছিল, একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে দিলে যুদ্ধক্ষেত্রে গুলি ছোড়ার আগেই সেই দেশকে দুর্বল করে ফেলা সম্ভব। আর সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রেই ছিল অসহায় বন্দিদের জীবন। বহু বছর পেরিয়ে গেলেও উদ্ধার হওয়া জাল নোটগুলো আজও মানুষকে মনে করিয়ে দেয়। যুদ্ধের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলো শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, লুকিয়ে থাকে কাগজের টুকরোতেও।











