ফিলিপাইনের পালাওয়ান
মানুষ নয়, এআই চালাবে দেশ!

সংগৃহীত ছবি
ফিলিপাইনের পালাওয়ান প্রদেশের সমুদ্রঘেরা ছোট্ট এক দ্বীপ। দূর থেকে দেখলে অন্য সাধারণ পর্যটন দ্বীপগুলোর মতোই মনে হয়। চারপাশে নীল পানি, নারকেল গাছ আর গভীর নির্জনতা। শান্ত এই দ্বীপ ঘিরেই শুরু হয়েছে এক ভিন্নধর্মী পরীক্ষা, যা শুনলে অনেকের কাছে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি বলেই মনে হতে পারে।
কারণ এখানে একটি নতুন দেশ গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। যেখানে সরকার পরিচালনা করবে মানুষ নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ড্যান থমসনের উদ্যোগে ঐতিহাসিক নেতাদের আদলে তৈরি এআই বট দিয়ে গড়া হয়েছে একটি ডিজিটাল সরকার, যা ভবিষ্যতের রাষ্ট্রব্যবস্থার নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এক বছর আগে ড্যান থমসন ঘোষণা দিয়েছিলেন, একটি দ্বীপ নিয়ে সেখানে একটি ‘মাইক্রোনেশন’ বা ক্ষুদ্র স্বঘোষিত রাষ্ট্র গড়ে তুলছেন। দ্বীপটির নাম রাখা হয়েছে সেনসে আইল্যান্ড। নামটি এসেছে তার এআই কোম্পানি সেনসের নাম থেকে। তবে এই রাষ্ট্রের সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো এর সরকারব্যবস্থা।
মানুষ ভুল করতে পারে, দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দিতে পারে ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য। কিন্তু এআই হয়তো পারবে আরও নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নিতে
এখানে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে ঐতিহাসিক নেতাদের আদলে তৈরি এআই বট। যেন ইতিহাসের চরিত্রগুলো নতুন করে ডিজিটাল জীবনে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সেই তালিকায় রয়েছে উইনস্টন চার্চিল, নেলসন ম্যান্ডেলা, মহাত্মা গান্ধী, মার্কাস অরেলিয়াস, সান জু এবং লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিসহ আরও অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব।
থমসনের বিশ্বাস, মানুষ ভুল করতে পারে, দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দিতে পারে ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য। কিন্তু এআই হয়তো পারবে আরও নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নিতে।
যদি এআই অস্ত্র সংগ্রহ শুরু করে আর পাশের দ্বীপে হামলা চালায়, তাহলে সেটা অবশ্যই খারাপ হবে
তার ভাষ্য, এআই সরকারের বড় সুবিধা হলো— সেখানে থাকবে না লবিস্ট, রাজনৈতিক চাপ কিংবা ব্যক্তিগত লাভের হিসাব। তবে শুরু থেকেই এই পরিকল্পনা নিয়ে কৌতূহলের পাশাপাশি হাস্যরসও কম হয়নি।
সিএনএন ট্রাভেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে থমসনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সবচেয়ে খারাপ কী ঘটতে পারে?
থমসন হেসে বলেছিলেন, ‘যদি এআই অস্ত্র সংগ্রহ শুরু করে আর পাশের দ্বীপে হামলা চালায়, তাহলে সেটা অবশ্যই খারাপ হবে।’ এরপর আবার নিজেই জানান, এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
আপাতত সেনসে আইল্যান্ড আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো দেশ নয়। বাস্তবে সেখানে মানুষের উপস্থিতিও খুব কম। প্রকল্পটির যোগাযোগ উপদেষ্টা এমিলি কিও জানিয়েছেন, বর্তমানে দ্বীপটিতে স্থায়ীভাবে আছেন কেবল একজন পরিচর্যাকারী ‘মাইক’। তবুও প্রকল্পটি নিয়ে দিন দিন বাড়ছে মানুষের আগ্রহ।
যদি এআই অস্ত্র সংগ্রহ শুরু করে আর পাশের দ্বীপে হামলা চালায়, তাহলে সেটা অবশ্যই খারাপ হবে
থমসনের দাবি, ইতোমধ্যে প্রায় ১২ হাজার মানুষ সেখানে ‘ই-রেসিডেন্ট’ হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কেউ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ দেখতে চান, কেউ বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় হতাশ আবার কেউ নিছক কৌতূহলী। এই আগ্রহীদের একজন পিওতর পিয়েত্রুশেভস্কি-গিল। তিনি আগে নিজেও একটি মাইক্রোনেশন গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। তখন ঐতিহাসিক চরিত্রের এআই মডেল তৈরি করতে গিয়ে হঠাৎ সেনসে আইল্যান্ডের খবর জানতে পারেন।
তার ভাষ্য, ‘আমরা যা তৈরি করার চেষ্টা করছিলাম, সেনসে আইল্যান্ড সেটির আরও উন্নত সংস্করণ। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে কাজ করছি। আমার দায়িত্বের একটি অংশ হলো নাগরিকত্বের আবেদন যাচাই করা।
তার মতে, আবেদনকারীদের অনেকেই বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় হতাশ। দুর্নীতি, অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারে বিরক্ত হয়ে তারা নতুন কিছু খুঁজছে।
এটি সহজ হবে না। কারণ মানুষ আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, দ্বিমত পোষণ করে এবং নিয়ম ভাঙে। বাস্তব পৃথিবী সবসময় যুক্তি দিয়ে চলে না। তবু তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী
থমসন মনে করেন, আধুনিক বিশ্বের অনেক মানুষ তাদের সরকারের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে। আর সেই কারণেই এআইচালিত রাষ্ট্রের ধারণা মানুষের মধ্যে তৈরি করছে আগ্রহ।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে নাগরিকরা বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপন করবে। এরপর এআই পরিষদ সেই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করবে, নিজেদের মধ্যে মতবিনিময় করবে এবং ভোট দেবে। তারপর বাস্তব মানুষ সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে। তবে এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। মানুষ কি সত্যিই এআইয়ের সিদ্ধান্ত মেনে চলবে?
থমসন নিজেও স্বীকার করেন, ‘এটি সহজ হবে না। কারণ মানুষ আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, দ্বিমত পোষণ করে এবং নিয়ম ভাঙে। বাস্তব পৃথিবী সবসময় যুক্তি দিয়ে চলে না। তবু তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী।’
তার বিশ্বাস, একসময় এআই শুধু সিদ্ধান্তই নেবে না, নিজেই অর্থ লেনদেন করতে পারবে। এমনকি বিভিন্ন কাজও পরিচালনা করবে।
থমসনের নিজের জীবনেও এআইয়ের প্রভাব গভীর। তার একটি ব্যক্তিগত এআই চ্যাটবট রয়েছে— ‘ড্যান বট’। এটি তার কণ্ঠ, আচরণ, চিন্তাভাবনা ও তথ্য সংগ্রহ করে তার একটি ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি করছে।
তার ভাষায়, ‘আমি না থাকলেও যেন আমার একটি সংস্করণ থেকে যায়।’
সেনসে আইল্যান্ডের এআই নেতাদেরও একইভাবে তৈরি করা হয়েছে। ঐতিহাসিক দলিল, ভাষণ, লেখালেখি এবং সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করে গড়ে তোলা হয়েছে তাদের ব্যক্তিত্ব।
যেমন এআই উইনস্টন চার্চিল। তবে বাস্তব চার্চিলের সব বৈশিষ্ট্য এতে রাখা হয়নি। সে আর সিগার খেতে বিরতি নেবে না। এমনকি বাস্তব জীবনের মতো মহাত্মা গান্ধীর প্রতি বিরূপ মনোভাবও দেখাবে না।
বরং সিএনএনের প্রশ্নের উত্তরে এআই চার্চিল বলেছেন, ‘গান্ধী এবং আমার মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। কিন্তু এখন আমরা বৃহত্তর নীতির ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করছি।’
প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে এআই ভুল করছে। কখনো ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছে, কখনো ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তাই একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব এআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার ধারণা উদ্বেগজনক
তবে এআই নিজেও স্বীকার করেছে, মানুষের মতো অনুভূতি তার নেই। আনন্দ, কষ্ট, ভয়, অপমান কিংবা মানবিক মর্যাদার গভীরতা প্রযুক্তি এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারে না। আর সেখানেই আপত্তি তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।
অ্যালন্ড্রা নেলসন পুরো ধারণাটিকে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, ‘প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে এআই ভুল করছে। কখনো ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছে, কখনো ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তাই একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব এআইয়ের হাতে তুলে দেওয়ার ধারণা উদ্বেগজনক।’
তার মতে, ‘কোনো একক ব্যক্তি বা কোম্পানি যদি দাবি করে তারা ‘গণতান্ত্রিক’ এআই সরকার গড়ছে। তাহলে সেটিই আসলে বড় ধরনের বৈপরীত্য।’
তবে থমসন এসব সমালোচনায় থামছেন না। বরং তিনি মনে করেন, এটিই ভবিষ্যতের শুরু। হয়তো এখন এটি একটি ছোট্ট সামাজিক পরীক্ষা। কিন্তু একদিন পৃথিবীর অনেক সরকারই ধীরে ধীরে এআই-নির্ভর সিদ্ধান্ত ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে পারে। তবু ভয়ও রয়ে গেছে। কারণ থমসনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ প্রযুক্তি নয়, ‘মানুষ’।
যদি একদিন কেউ অত্যন্ত আক্রমণাত্মক কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রকে ক্ষমতায় আনতে চায়? যদি কেউ নতুন কোনো ডিজিটাল স্টালিন, হিটলার বা চেঙ্গিস খান তৈরি করতে চায়? তখন কী হবে? এই প্রশ্নের উত্তর থমসনের কাছেও নেই।
তবুও ফিলিপাইনের সমুদ্রের মাঝে ছোট্ট সেই দ্বীপে পরীক্ষা থেমে নেই। নীল পানির ওপারে, আধুনিক প্রযুক্তির ভেতরে, ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন প্রশ্ন—মানুষ কি সত্যিই একদিন নিজের শাসনভার তুলে দেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে?








