অর্কিড
এক ফুলের জন্য দশ বছরের অপেক্ষা!

সংগৃহীত ছবি
নেদারল্যান্ডসের উত্তরের ছোট্ট শহর হিমস্কার্ক। কাঁচে ঘেরা বিশাল এক গ্রিনহাউসের ভেতর সারি সারি অর্কিড গাছ। কোথাও সাদা, কোথাও বেগুনি। কোথাও আবার গোলাপি রঙের নরম পাপড়ি। বাতাসে ভাসছে হালকা মিষ্টি গন্ধ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এটি যেন কোনো ফুলের রাজ্য। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে চলছে বছরের পর বছর ধরে বিজ্ঞান। গবেষণা আর নিঃশব্দ প্রতিযোগিতা।
একটি নতুন অর্কিড তৈরি করতে এখানে লেগে যায় প্রায় দশ বছর। যে ফুল কয়েকদিনের জন্য কারও ঘরের সৌন্দর্য বাড়ায়, তার জন্মের পেছনে চলে দীর্ঘ গবেষণা। এছাড়া থাকে অসংখ্য পরীক্ষা আর বছরের পর বছর অপেক্ষা।
এই সৌন্দর্যের আড়ালে থাকে অগণিত মানুষের শ্রম, ব্যর্থতা আর কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ। হাজার হাজার গাছের মধ্য থেকে মাত্র কয়েকটি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় নতুন এক অর্কিড।
ডাচ অর্কিড প্রজনন প্রতিষ্ঠান ফ্লোরিকালচুরার গবেষকেরা জানিয়েছে, নতুন অর্কিড তৈরি অনেকটা জুয়ার মতো। কারণ শুরুতে কেউ জানে না, শেষ পর্যন্ত কোন গাছটি সবচেয়ে সুন্দর ফুল দেবে।
হাজার হাজার গাছের মধ্যে আমরা শুরুতেই বেছে নিতে পারি কোনগুলো রাখব। প্রযুক্তি সবকিছু নয়। কারণ একটি ফুল শুধু জেনেটিক হিসাবের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের চোখ, অনুভূতি আর সৌন্দর্যবোধও
সবকিছুর শুরু হয় দুটি অর্কিড গাছ বেছে নেওয়ার মাধ্যমে। কোনো একটি গাছের রং সুন্দর। আরেকটির ফুল বেশি দিন টেকে। কোনোটি রোগ প্রতিরোধে শক্তিশালী, কোনোটি দ্রুত বড় হয়। গবেষকেরা এসব বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে সংকরায়ণ করেন। তারপর অপেক্ষা। কিন্তু অপেক্ষাটা খুব ছোট নয়।
প্রথমে ক্ষুদ্র বীজ থেকে ল্যাবরেটরিতে জন্ম নেয় হাজার হাজার ছোট চারা। এত ছোট যে খালি চোখে ঠিকমতো বোঝাও যায় না। কয়েক বছর আগেও গবেষকদের প্রতিটি গাছ বড় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। ফুল ফুটতে তিন বছর পার হয়ে যেত। তারপর দেখা যেত, কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য আসেনি। এখন প্রযুক্তি সেই দীর্ঘ অপেক্ষাকে কিছুটা কমিয়েছে।
গবেষণাগারে সাদা কোট পরা বিজ্ঞানীরা গাছের ডিএনএ পরীক্ষা করেন। তারা খুঁজে দেখেন,কোন গাছে ভবিষ্যতে কাঙ্ক্ষিত রং আসতে পারে, কোনটি বেশি দিন টিকবে, কোনটি রোগে কম আক্রান্ত হবে। ছোট চারার মধ্য থেকেই অযোগ্য গাছগুলো বাদ দেওয়া হয়।
ফ্লোরিকালচারের গবেষণা ব্যবস্থাপক ওয়ার্ট ফান জোনেভেল্ড বলেছেন, ‘হাজার হাজার গাছের মধ্যে আমরা শুরুতেই বেছে নিতে পারি কোনগুলো রাখব। প্রযুক্তি সবকিছু নয়। কারণ একটি ফুল শুধু জেনেটিক হিসাবের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের চোখ, অনুভূতি আর সৌন্দর্যবোধও।’
ল্যাব থেকে নির্বাচিত গাছগুলো এরপর চলে যায় বিশাল গ্রিনহাউসে। সেখানে বছরের পর বছর ধরে তাদের বড় করা হয়। নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, আলো, পানি আর পুষ্টি নিশ্চিত করতে হয় প্রতিদিন। একটি গাছের সামান্য পরিবর্তনও নজর এড়ায় না গবেষকদের।
সফলতার গল্পের পেছনে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য ব্যর্থ গাছের গল্প। যেসব গাছ শেষ পর্যন্ত টিকে যায়, তাদের আবার হুবহু প্রতিলিপি তৈরি করা হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ক্লোনিং। গাছের ‘মেরিস্টেম’ নামের বিশেষ কোষ ব্যবহার করে একই বৈশিষ্ট্যের আরও গাছ তৈরি করা হয়
গাছগুলো কখনো নেদারল্যান্ডস থেকে বিমানে করে পাঠানো হয় ভারতে। আবার কখনো ট্রাকে করে যায় পোল্যান্ডে। বিভিন্ন পরিবেশে কেমন আচরণ করে, তা দেখার জন্যই এই ভ্রমণ। এই পুরো যাত্রায় হাজার হাজার গাছ বাদ পড়ে যায়।
কোনোটির ফুল ঠিকমতো ফোটে না। কোনোটি দেখতে সুন্দর নয়। কোনোটি বাজারে মানুষের পছন্দ হবে না বলে মনে করেন গবেষকেরা।
ওয়াগেনিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পল আরেন্স বলেছেন, ‘প্রজনন আসলে বাদ দেওয়ার শিল্প।’ অর্থাৎ সফলতার গল্পের পেছনে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য ব্যর্থ গাছের গল্প। যেসব গাছ শেষ পর্যন্ত টিকে যায়, তাদের আবার হুবহু প্রতিলিপি তৈরি করা হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ক্লোনিং। গাছের ‘মেরিস্টেম’ নামের বিশেষ কোষ ব্যবহার করে একই বৈশিষ্ট্যের আরও গাছ তৈরি করা হয়।’
তবে এই প্রযুক্তিও প্রতিষ্ঠানগুলো গোপন রাখে। কারণ অর্কিডের বাজারে প্রতিযোগিতা ভয়ংকর। বিশ্বজুড়ে অর্কিডের বাজারের মূল্য শত শত মিলিয়ন ডলার। নতুন কোনো অর্কিড জনপ্রিয় হয়ে গেলে সেটি একটি কোম্পানিকে কোটি কোটি টাকা এনে দিতে পারে। তাই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই নিজেদের গবেষণা, জেনেটিক মার্কার আর ক্লোনিং পদ্ধতি গোপন রাখে।
একটি নতুন অর্কিড বাজারে আনার আগে সেটিকে প্রমাণ করতে হয় যে এটি সত্যিই আলাদা। ইউরোপে ব্রিডার্স রাইটস আর যুক্তরাষ্ট্রে পেটেন্টের মাধ্যমে সেই নতুন ফুলের মালিকানা নিশ্চিত করা হয়।
অর্কিড প্রজনন কিছুটা জুয়ার মতো। এই জুয়ায় কখনো বছরের পর বছর পরিশ্রম করেও ব্যর্থ হতে হয়। আবার কখনো হঠাৎই জন্ম নেয় এমন একটি ফুল, যা বাজারে সাড়া ফেলে দেয়
ডিএনএ বিশ্লেষণ এখানে অনেকটা ফরেনসিক বিজ্ঞানের মতো কাজ করে। নতুন গাছের জিনগত বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে দেখা হয়, এটি আগের কোনো ফুলের সঙ্গে মিলে যায় কি না। তবে এত প্রযুক্তি, গবেষণা আর বিনিয়োগের পরও শেষ সিদ্ধান্তটা এখনো মানুষই নেয়।
ফ্লোরিকালচারের ব্রিডিং ম্যানেজার স্টেফান কুইপার ও তার সহকর্মীরা শেষ পর্যন্ত নিজের চোখে দেখে ঠিক করেন, কোন ফুল বাজারে যাবে। কারণ একটি ফুলের সৌন্দর্য কেবল মাপজোক দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।
একটি অর্কিড হয়তো সব পরীক্ষায় পাস করেছে। তার রং উজ্জ্বল, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ভালো, ফুলও টিকে দীর্ঘদিন। কিন্তু সেটি যদি মানুষের চোখে সুন্দর না লাগে। তাহলে সেই ফুলের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
স্টেফান কুইপার বলেছেন, ‘অর্কিড প্রজনন কিছুটা জুয়ার মতো। এই জুয়ায় কখনো বছরের পর বছর পরিশ্রম করেও ব্যর্থ হতে হয়। আবার কখনো হঠাৎই জন্ম নেয় এমন একটি ফুল, যা বাজারে সাড়া ফেলে দেয়।’
গ্রিনহাউসের ভেতর সারি সারি অর্কিডের দিকে তাকালে হয়তো বোঝা যায় না, একটি ফুলের পেছনে কত দীর্ঘ সময় লুকিয়ে আছে। কত মানুষ দিনের পর দিন কাজ করেছে। কত গাছ জন্ম নিয়েও শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়েছে।
কিন্তু সেই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যখন কোনো নতুন অর্কিড প্রথমবারের মতো ফুটে ওঠে। তখন সেটি শুধু একটি ফুল থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে এক দশকের অপেক্ষা, বিজ্ঞান আর সৌন্দর্যের এক নীরব বিজয়।







