সাদা চাদরে মুড়ে সোনম ওয়াংচুককে নিয়ে গেল পুলিশ, দেশ জুড়ে প্রতিবাদের ডাক অভিজিৎ দিপকের

সাদা চাদরে মুড়ে সোনম ওয়াংচুককে পুলিশে নিয়ে যাচ্ছে (বামে) এবং বক্তব্য রাখছেন অভিজিৎ দীপকে। ছবি : আগামীর সময়
নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে টানা ২১ দিনের অনশন। শরীর ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। ওজন কমেছে প্রায় সাড়ে ৯ কেজি। চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন গুরুতর শারীরিক ঝুঁকির কথা। এমন পরিস্থিতিতে শনিবার সকালে সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে বলপূর্বক সফদরজং হাসপাতালে স্থানান্তর করেছে দিল্লি পুলিশ। পুলিশের দাবি, দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশ ও চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঘটনাটি ঘিরে যে প্রশ্ন উঠছে, তা শুধু একজন অনশনকারীর চিকিৎসা নয়— এটি কি সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা?
গত ২৮ জুন থেকে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে চলা আন্দোলনের সমর্থনে অনশন শুরু করেছিলেন সোনম ওয়াংচুক এবং এআইএসএ-র তিন কর্মী নেহা, আমিন ও মনীশ। তাদের অভিযোগ, নিট পরীক্ষায় অনিয়ম এবং সেই বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত ছাত্রছাত্রীদের মৃত্যুর ঘটনায় সরকার দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চললেও কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে কোনো অর্থবহ রাজনৈতিক সংলাপ বা উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে আন্দোলনকারীদের দাবি।
শনিবার সকালে পুলিশ ওয়াংচুককে হাসপাতালে নিয়ে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দিল্লি পুলিশের বক্তব্য, কিছু বিক্ষোভকারী বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তবে সংযম বজায় রেখে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে দাবি করেছেন, তাকে মারধর করা হয়েছে এবং কিছু সময়ের জন্য আটক রাখা হয়েছিল। তিনি দেশ জুড়ে প্রতিবাদের আহ্বান জানিয়েছেন।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল ওয়াংচুককে সাদা চাদরে মুড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেই দৃশ্য বহু মানুষের মনে প্রশ্ন তুলেছে— একজন শান্তিপূর্ণ অনশনকারীকে এভাবে সরিয়ে নেওয়া কি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ?
এআইএসএ নেত্রী নেহার বক্তব্য আরও উদ্বেগজনক। তার অভিযোগ, সকালে সাদা পোশাকের পুলিশ প্রথমে আন্দোলনস্থলে আসে, পরে বড় পুলিশবাহিনী পৌঁছে অনশনকারীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। প্রতিবাদীদের মানবশৃঙ্খলের কারণে তাকে, আমিন ও মনীশকে সরানো সম্ভব হয়নি।
নেহার ভাষায়, সরকার ২১ দিন ধরে আমাদের উপেক্ষা করেছে। এখন আন্দোলন ভাঙতে চাইছে। তার প্রশ্ন, যদি একজন অনশনকারীর স্বাস্থ্য নিয়ে সরকার সত্যিই উদ্বিগ্ন হয়, তবে আন্দোলনের দাবিগুলো নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ আগে কেন নেওয়া হলো না? কেন ২১ দিনের মাথায় এসে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছাল, যেখানে আদালত, চিকিৎসক ও পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে?
অন্যদিকে সোনম ওয়াংচুক অনশনের ২০তম দিনে এক ভিডিও বার্তায় বলেছিলেন, আমি আমার শরীরের ২০ শতাংশ হারিয়েছি। এখন সময় এসেছে সরকার যুবসমাজের কণ্ঠস্বর শুনুক।
এর আগে, নিট পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ এবং সেই বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত ছাত্রছাত্রীদের মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে গত ২৮ জুন থেকে এই অনশন কর্মসূচি শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, দেশের লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত এই ইস্যুতে কেন্দ্র সরকার এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
শুক্রবার চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, অনশন শুরুর পর থেকে সোনম ওয়াংচুকের ওজন প্রায় সাড়ে ৯ কিলোগ্রাম কমেছে। একই সঙ্গে রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রাও উদ্বেগজনকভাবে ওঠানামা করছিল। অন্য অনশনকারীদের অবস্থাও ক্রমশ খারাপ হচ্ছিল বলে চিকিৎসকরা সতর্ক করেছিলেন।
তবে সোনমকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলেও আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। বরং এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারের ভূমিকা, প্রতিবাদের অধিকার এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ নিয়ে নতুন করে জাতীয় স্তরে বিতর্ক শুরু হয়েছে।




