ইংলিশ চ্যানেলে কড়া নজরদারির চুক্তি যুক্তরাজ্য-ফ্রান্সের

সংগৃহীত ছবি
অবৈধ অভিবাসী হতে গিয়ে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে চান অনেকেই।
এবার ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে অবৈধ অভিবাসীদের যুক্তরাজ্যে যাওয়া ঠেকাতে ফ্রান্সের সঙ্গে তিন বছরের নতুন চুক্তি করেছে ব্রিটেন। ফরাসি উপকূলে আইনশৃঙ্খলা তৎপরতা বাড়ানো এবং এর বিনিময়ে যুক্তরাজ্যের বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা— এ দুই ভিত্তির ওপর গড়ে উঠেছে নতুন এই পরিকল্পনা।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে ফ্রান্স উপকূলে মোতায়েন করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৫০ শতাংশেরও বেশি বাড়াবে ফ্রান্স। অন্যদিকে এ চুক্তিতে যুক্তরাজ্য দেবে ৭৬ কোটি ৬০ লাখ ইউরো পর্যন্ত অর্থায়ন। তবে এর প্রায় এক-চতুর্থাংশ নির্ভর করবে পরিকল্পনাটি কতটা কার্যকর হয় তার ওপর।
নতুন চুক্তিটি আগের স্যান্ডহার্স্ট চুক্তিরই নবায়ন বলে মনে করছেন অনেক কূটনীতিবিদ। এ চুক্তির আওতায় ফরাসি উপকূল থেকে অভিবাসীদের বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা ঠেকাতে আর্থিক সহায়তা দিত ব্রিটেন। প্রথম এ চুক্তি হয় ২০১৮ সালে। পরে ২০২৩ সালে একবার এর নবায়ন হয়।
দীর্ঘদিন ধরেই লন্ডনের অভিযোগ, ফরাসি উপকূল থেকে অভিবাসী ও পাচারকারীদের ঠেকাতে যথেষ্ট কাজ করছে না প্যারিস। ব্রিটিশ রাজনীতিতে এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যু। সে কারণে যুক্তরাজ্য চাইছিল, নবায়িত চুক্তিতে ব্রিটিশ করদাতাদের অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, থাকুক তার স্পষ্ট শর্ত।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিতে বলা হয়েছে, যৌথ বার্ষিক মূল্যায়নে যদি দেখা যায় নতুন পদক্ষেপেও যথেষ্ট ফল আসছে না, তাহলে অর্থায়ন অন্য পদক্ষেপে সরিয়ে নেওয়া হবে।
শর্তসাপেক্ষ অংশ বাদ দিলেও ব্রিটেনের মূল বিনিয়োগ ৫৮ কোটি ইউরো, যা আগের চুক্তির তুলনায় ৪ কোটি ইউরো বেশি।
রাজনৈতিক দিক থেকেও এ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। অভিবাসন ইস্যুতে ডানপন্থিদের চাপের মুখে আছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ লোক, লেবার পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া ঘিরে চলমান বিতর্ক ঘিরেও চাপে রয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেকের ধারণা, মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি বড় ধাক্কা এড়াতে পারে কি না, স্টারমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটা নির্ভর করছে তার ওপরও।
নতুন পরিকল্পনার আওতায় ড্রোন, হেলিকপ্টার ও ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা মোতায়েন করবে ফ্রান্স। যাতে বিশেষ করে ট্যাক্সি বোট ব্যবহার করে সমুদ্রযাত্রা ঠেকানো যায়। উত্তর ফ্রান্সের সৈকতে সহিংসতা ও প্রতিকূলের ভিড় সামলাতে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন করা হবে প্রশিক্ষিত পুলিশ।
ব্রিটিশ হোম অফিস জানিয়েছে, এ চুক্তি কার্যকর হলে উত্তর ফ্রান্সে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা, গোয়েন্দা ও সামরিক সদস্যের সংখ্যা বাড়বে প্রায় ৪২ শতাংশ।
এ ছাড়া নতুন একটি জাহাজ এবং ২০-এর বেশি অতিরিক্ত সামুদ্রিক কর্মকর্তা দেবে ফ্রান্স। যাতে লক্ষ করা যায় যাতে কথিত ট্যাক্সি বোটগুলোকে। পুরো প্যাকেজের মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড ব্যয় হবে সৈকত এলাকায় নজরদারি বাড়াতে। আর নতুন কৌশল কার্যকর প্রমাণিত হলে দেওয়া হবে অতিরিক্ত ১৬ কোটি পাউন্ড। তবে এ শর্তসাপেক্ষ অর্থ পেতে ফ্রান্সকে কী লক্ষ্য অর্জন করতে হবে, তা এখনো জানায়নি সরকার।
এদিকে কনজারভেটিভ দলের সদস্যরা অভিযোগ করেছে, সরকার কোনো শর্ত ছাড়াই অর্ধ বিলিয়ন পাউন্ড তুলে দিচ্ছে ফ্রান্সের হাতে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে বেড়েছে অবৈধ প্রবেশ। ২০২৫ সালে এভাবে ৪১ হাজার ৪৭২ জন যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন। শুধু শনিবারই ৯টি নৌকায় ৬০২ জন পৌঁছান ডোভারে। ফলে ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত এই সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৬ হাজার।
উত্তর ফ্রান্সের শরণার্থীশিবিরে থাকা কয়েকজন অভিবাসী বিবিসিকে বলেছেন, তারা এখনো ভালো জীবনের সম্ভাব্য ঠিকানা হিসেবে দেখেন যুক্তরাজ্যকে।
এদিকে লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা বলছে, পাচারকারীদের ব্যবসায়িক মডেল স্থায়ীভাবে ভেঙে দেওয়া এবং ফ্রান্সের সঙ্গে বড় আকারের প্রত্যাবাসন চুক্তিই হতে পারে এ সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
তবে শরণার্থী-অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, শুধু পুলিশি কড়াকড়ি দিয়ে এ যাত্রা বন্ধ হবে না। বরং তা হয়ে উঠতে পারে আরও বিপজ্জনক। তারা আরও বলেছে, পারাপার ঠেকানোর একমাত্র উপায় হলো, শরণার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্যে আশ্রয় চাওয়ার নিরাপদ পথ খুলে দেওয়া।
গত মাসে ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয় ও সুইস গবেষণা সংস্থা বর্ডার ফরেনসিকসের প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের আমলে চ্যানেল পাড়ি দিতে গিয়ে বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যা।



