সেউতা সংকট
স্পেনকে ইইউ থেকে বের করে দেওয়ার বৃহত্তর ষড়যন্ত্র?
- শেনজেন স্থগিতের ডাক, ইসরায়েলি কূটনীতিকের কটাক্ষ, ইউরোপের অতি-ডান শিবিরে ‘ইসলামি আগ্রাসন’ প্রচার–আইনে বহিষ্কারের পথ নেই, কিন্তু মাদ্রিদকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা কি জোরালো হচ্ছে?

ছবি: রয়টার্স
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভেঙে পড়েছিল সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ। কেউ সাঁতরে, কেউ পাথুরে উপকূল ঘুরে, কেউ আবার সীমান্তের বাধা পেরিয়ে ঢুকে পড়েছিলেন স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায়। প্রবেশকারীর সংখ্যা নিয়ে স্পেন ও মরক্কোর হিসাবে অমিল থাকলেও, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ঘটনাটিকে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষের নজিরবিহীন ঢল হিসেবে বর্ণনা করেছে। পরে স্পেন জানায়, প্রায় ৬৯ হাজার ৫০০ মানুষ মরক্কোয় ফিরে গিয়েছেন। এখনও কয়েক হাজার মানুষ সেউতায় রয়েছেন; তাঁদের মধ্যে আট শতাধিক সঙ্গীহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক। দুই পাশে প্রাণহানির সংখ্যা ৮০ ছাড়িয়েছে।
কিন্তু সেউতার ঘটনা এখন আর শুধুই সীমান্তরক্ষীদের ব্যর্থতা, মানবপাচার কিংবা সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ভুল তথ্যের কাহিনি নয়। ইতালির শেনজেন কড়াকড়ি, ইউরোপের ২২ দেশের চাপ, মার্কিন রাজনৈতিক মহলের আক্রমণ এবং জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতের প্রকাশ্য কটাক্ষ–সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, স্পেন কি শুধু অভিবাসন সংকট সামলাচ্ছে, না কি তাকে ইউরোপের ভেতর রাজনৈতিকভাবে একঘরে করারও চেষ্টা চলছে?
গাজা, পশ্চিম তীর ও ইরান প্রশ্নে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের বিরুদ্ধে মাদ্রিদের কঠোর অবস্থান সেই সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে। তবে সেউতার ঢল ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে ঘটিয়েছে, এমন কোনও প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। এপির তথ্য যাচাইয়েও প্রতিশোধমূলক আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের দাবিকে প্রমাণহীন বলা হয়েছে।
ইইউ থেকে স্পেনকে ‘বের করে দেওয়া’ কি আদৌ সম্ভব?
রাজনৈতিক শিরোনামের আড়ালে আইনি বাস্তবতাটি পরিষ্কার করা জরুরি। বর্তমান ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তিতে কোনও সদস্যদেশকে অন্য সদস্যরা ভোট দিয়ে সরাসরি ইইউ থেকে বহিষ্কার করতে পারে–এমন বিধান নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তির ৫০ নম্বর অনুচ্ছেদে কোনও দেশের স্বেচ্ছায় ইইউ ছাড়ার পদ্ধতি রয়েছে; সিদ্ধান্তটি সংশ্লিষ্ট দেশকেই নিতে হয়।
অন্যদিকে ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা আইনের শাসনের গুরুতর ও স্থায়ী লঙ্ঘন ঘটলে কোনও সদস্যের ভোটাধিকারসহ কিছু অধিকার সাময়িক স্থগিত করা যায়। কিন্তু তখনও দেশটির সদস্যপদ ও চুক্তিগত দায়িত্ব বহাল থাকে। অর্থাৎ সেউতা সংকট দেখিয়ে স্পেনকে সরাসরি ইইউ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার কোনও সহজ আইনি পথ নেই।
ফলে এখানে ‘ইইউ থেকে বের করা’ কথাটি আইনগত প্রক্রিয়ার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। শেনজেন থেকে সাময়িক বিচ্ছিন্নতা, ইউরোপীয় মঞ্চে মাদ্রিদকে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া এবং অভিবাসন প্রশ্নে সানচেজ সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করাই আপাতত চাপের বাস্তব রূপ।
৩০ জুলাই সেউতায় কী ঘটেছিল
সংকটের বিস্ফোরণ ঘটে গত ৩০ জুলাই (বৃহস্পতিবার)। তার আগের কয়েক দিন ধরেই মরক্কো থেকে সাঁতরে সেউতায় ঢোকার ঘটনা বাড়ছিল। কিন্তু ওই দিন হাজার হাজার মানুষ একযোগে তারাজাল সীমান্ত ও উপকূলের দিকে এগিয়ে যান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে স্পেন সেনাসদস্য, গার্দিয়া সিভিল এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে।
স্প্যানিশ গোয়েন্দাদের প্রাথমিক মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক স্তরে পরিকল্পিত কোনও অভিযানের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী কিছু সময়ের জন্য কার্যকর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করেনি–এমন ইঙ্গিত রয়েছে। মরক্কো বলেছে, মানবপাচারকারী চক্র ও অনলাইনে ছড়ানো গুজবই মানুষকে সীমান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
গুজবের কেন্দ্রে ছিল স্পেনের সুপ্রিমকোর্টের ৮ জুলাইয়ের একটি রায়। আদালত বলেছিল, সাঁতরে বা সমুদ্রপথে প্রবেশকারীদের আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে মরক্কোয় ঠেলে দেওয়া যাবে না। কিন্তু এর অর্থ সেউতায় পৌঁছালেই স্পেন বা ইউরোপে থাকার অধিকার পাওয়া নয়। অভিযোগ, পাচারকারীরা সেই রায়ের অপব্যাখ্যা করে সীমান্ত ‘খুলে গেছে’–এমন প্রচার চালিয়েছিল।
শেনজেনের হুমকি, কিন্তু ইইউ সদস্যপদ নয়
সেউতার পর সবচেয়ে নাটকীয় প্রতিক্রিয়া আসে ইতালি থেকে। ৩১ জুলাই (শুক্রবার) দেশটির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার স্পেন থেকে বিমান ও সমুদ্রপথে ইতালিতে যাওয়া নির্দিষ্ট অ-ইউরোপীয় যাত্রীর ওপর এক মাসের জন্য সীমান্ত পরীক্ষা ফিরিয়ে আনে। স্প্যানিশ বা অন্য ইইউ নাগরিকদের সাধারণ যাতায়াত বন্ধ হয়নি।
তার আগেই ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি স্পেনকে শেনজেনের অবাধ চলাচলব্যবস্থা থেকে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব তুলেছিলেন। স্পেন ইতালীয় রাষ্ট্রদূতকে তলব করে প্রতিবাদ জানায়। ফ্রান্সও কিছু সময়ের জন্য সীমান্ত পরীক্ষা বাড়ায়।
সেউতা স্পেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূখণ্ড হলেও সেখানে মূল ভূখণ্ডের মতো একইভাবে অবাধ শেনজেন চলাচল কার্যকর হয় না। সেউতা থেকে স্পেনের মূল ভূখণ্ড বা অন্য শেনজেন গন্তব্যে যেতে বন্দর ও বিমানবন্দরে আলাদা নথি পরীক্ষা দিতে হয়। ফলে সেউতায় প্রবেশ করলেই গোটা ইউরোপে বাধাহীনভাবে ছড়িয়ে পড়া সম্ভব–এই প্রচারের বাস্তব ভিত্তি দুর্বল।
স্পেনের পাল্টা বার্তা
ইতালির সিদ্ধান্তের পর ৩১ জুলাই মাদ্রিদে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে মানুয়েল আলবারেস বলেছেন, শেনজেন অঞ্চলের অখণ্ডতা “সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত” রয়েছে। তিনি এ নিয়ে চলা প্রচারকে “উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি” বলে অভিহিত করেন।
এরপর সোমবার (৩ আগস্ট) আলবারেস ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে সংহতি দাবি করে মনে করিয়ে দেন, অন্য দেশে অভিবাসন সংকট দেখা দিলে স্পেন তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এখন সেউতার ঘটনায় মাদ্রিদও একই ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন শেষ পর্যন্ত স্পেনের দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রশংসা করেন। তবে ইউরোপের বহির্সীমান্ত, মানবপাচারবিরোধী অভিযান এবং ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও সামনে আসে।
ইসরায়েলি কটাক্ষে নতুন মোড়
সেউতা সংকটের কূটনৈতিক মাত্রা আরও তীব্র হয় গত শুক্রবার (৩১ জুলাই)৷ জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পেনের অভিবাসননীতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেছেন, যে স্পেন ইসরায়েলকে নিয়মিত নীতির পাঠ দেয়, সেই দেশকেই এখন নিজের অভিবাসন সংকট ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে।
ড্যানন আরও প্রশ্ন তোলেন, স্পেন কেন আফ্রিকায় কথিত “ঔপনিবেশিক ছিটমহল” ধরে রেখেছে। তাঁর ইঙ্গিত ছিল সেউতা ও মেলিলার দিকে। তিনি স্পেনে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার দাবিও করেছিলেন; যদিও সেউতা সংকটের জন্য এমন কোনও জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়নি।
স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে একই দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সংক্ষিপ্ত কিন্তু ইঙ্গিতপূর্ণ জবাব দেন–“এখন সবকিছু বেশ পরিষ্কার হতে শুরু করেছে।” স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমে মন্তব্যটিকে মাদ্রিদের ওপর সম্ভাব্য সমন্বিত রাজনৈতিক চাপের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
স্পেনকে আক্রমণ করতে গিয়ে মরক্কোকেও অস্বস্তিতে ফেলল ইসরায়েল?
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে এই বৈপরীত্যটিই সামনে আনা হয়েছে–ইসরায়েলি মহল স্পেনের সংকটকে রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে গিয়ে নিজের ঘনিষ্ঠ মিত্র মরক্কোর দাবির ভাষাই গ্রহণ করেছে।
রাবাত বহুদিন ধরে সেউতা ও মেলিলাকে মরক্কোর ভূখণ্ড বলে দাবি করে। ড্যাননের ‘ঔপনিবেশিক ছিটমহল’ মন্তব্য সেই দাবিকেই শক্তি দেয়। অথচ ২৯ এপ্রিল মাদ্রিদের একটি অনুষ্ঠানে স্পেনে ইসরায়েলের কূটনৈতিক প্রতিনিধি ডানা এরলিখ বলেছিলেন, সেউতা ও মেলিলা নিয়ে মরক্কোর দাবিকে সমর্থন করার কথা ইসরায়েল ভাবছে না।
অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে সরকারি কূটনৈতিক অবস্থান ও জাতিসংঘে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের রাজনৈতিক ভাষার মধ্যে দৃশ্যমান ফারাক তৈরি হয়েছে। সেটি কোনও আনুষ্ঠানিক নীতি পরিবর্তনের প্রমাণ নয়; তবে স্পেনকে আক্রমণ করতে গিয়ে ইসরায়েল মরক্কোর ভূখণ্ড দাবিকে পরোক্ষ বৈধতা দিয়েছে, এমন ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
‘ইসলামি আগ্রাসন’–অতি ডান শিবিরের প্রস্তুত ভাষ্য
সোমবার (৩ আগস্ট) প্রকাশিত আল জাজিরার মতামত নিবন্ধে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ নাজার লিখেছেন, সেউতার মানবিক বিপর্যয় সামনে আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে “ইসলামিক ইনভ্যাশন” বা ‘ইসলামি আগ্রাসন’ কথাটি ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং অতি-ডান নেটওয়ার্কে #স্টপইসলাম হ্যাশট্যাগ ছড়িয়ে পড়ে।
নাজারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইউরোপের জাতীয়তাবাদী ডানপন্থীরা সেউতাকে শুধু সীমান্তব্যবস্থার ব্যর্থতা হিসেবে নয়, মুসলিম অভিবাসনের বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘সভ্যতার যুদ্ধ’-এর প্রমাণ হিসেবে হাজির করেছে। তাঁর মতে, এই ভাষ্য ভিক্টর অরবান, গির্ট উইল্ডার্স, মেরিন ল্য পেন এবং ব্রিটেনের টমি রবিনসনের মতো নেতাদের দীর্ঘদিনের রাজনীতির সঙ্গে মিলে যায়। এটি অবশ্য আল জাজিরার সংবাদগত সিদ্ধান্ত নয়; নিবন্ধে স্পষ্ট করা হয়েছে, মতামতটি লেখকের নিজস্ব।
নাজার আরও যুক্তি দিয়েছেন, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে ইউরোপীয় জনমতের ক্ষোভকে মানবিক বা আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন হিসেবে না দেখে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফল হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। এতে অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি, মুসলিমবিদ্বেষ এবং ফিলিস্তিনপন্থী সংহতির বিরুদ্ধে সন্দেহ–তিনটি বিষয়কে একই নিরাপত্তা ভাষ্যে জুড়ে দেওয়া হয়।
এই প্রচারে লাভ কার
সেউতার ঘটনাকে ‘সভ্যতার সংকট’ বানাতে পারলে ইউরোপের অতি-ডানপন্থীরা নিজেদের কড়া সীমান্তনীতি ন্যায্য বলে তুলে ধরতে পারে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের বর্তমান সরকারও ইউরোপের ডানপন্থী দলগুলোর কাছে নিজেকে ‘উগ্র ইসলামের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরক্ষা’ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে–আল জাজিরার মতামত নিবন্ধটির মূল রাজনৈতিক যুক্তি এটিই।
দ্য গার্ডিয়ানে সোমবার (৩ আগস্ট) অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ববিদ রুবেন অ্যান্ডারসনও লিখেছেন, সেউতা সংকটকে ইউরোপের অতি-ডান শিবির যে ভাবে ব্যবহার করেছে, তা ভবিষ্যতে অভিবাসনকে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের উৎসাহ বাড়াতে পারে। ইউরোপের আতঙ্কিত ও বিভক্ত প্রতিক্রিয়া বহিরাগত শক্তিকে দেখায়–সীমান্তে সামান্য চাপ দিয়েই ইইউর অভ্যন্তরে বড় রাজনৈতিক ফাটল তৈরি করা সম্ভব।
স্পেন–ইসরায়েল বিরোধের পুরনো পটভূমি
স্পেন ২০২৪ সালের ২৮ মে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। মাদ্রিদ বলেছিল, সিদ্ধান্তটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নয়; দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে। কিন্তু গাজা যুদ্ধ, পশ্চিম তীরের বসতি এবং ফিলিস্তিনিদের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে সানচেজ সরকারের ধারাবাহিক সমালোচনায় দুই দেশের দূরত্ব বাড়ে।
চলতি বছরের ১৩ জুলাই বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে আলবারেস অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজার অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে আসা পণ্যের ওপর ইউরোপজুড়ে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার দাবি জানান। তিনি বলেছিলেন, স্পেন জাতীয় পর্যায়ে এমন আমদানি আগেই বন্ধ করেছে।
এর আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি, স্পেনসহ ২০টি দেশ ইসরায়েলের পশ্চিম তীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের পদক্ষেপের নিন্দা করে। যৌথ বিবৃতিতে ওই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং কার্যত ভূখণ্ড সংযুক্তির প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
এই পটভূমিতে সেউতা নিয়ে ড্যাননের আক্রমণকে নিছক অভিবাসননীতি বিষয়ক মন্তব্য হিসেবে না দেখে গাজা প্রশ্নে পুরনো বিরোধের সম্প্রসারণ হিসেবেও দেখছেন অনেকে।
ওয়াশিংটনের আক্রমণ, কিন্তু তথ্যের সঙ্গে অমিল
মার্কিন রাজনৈতিক মহলের একাংশ স্পেনের অভিবাসী নিয়মিতকরণ কর্মসূচিকে সেউতার ঢলের জন্য দায়ী করেছে। কিন্তু এপির তথ্য যাচাই অনুযায়ী, ওই কর্মসূচি নতুন করে সেউতায় প্রবেশকারীদের জন্য প্রযোজ্য নয়। নির্দিষ্ট সময়ের আগে স্পেনে অবস্থানকারী ব্যক্তিরাই এর আওতায় আবেদন করতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষাও মাদ্রিদের বিরুদ্ধে কড়া ছিল। ল্য মঁদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর নেতৃত্বাধীন দপ্তর সানচেজ সরকারের বিরুদ্ধে ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসন সহজ করার অভিযোগ তোলে। কিন্তু সেউতার ঢল ওয়াশিংটনের নির্দেশে ঘটেছে–এমন কোনও প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।
মরক্কোই কি সবচেয়ে সরাসরি চাবিকাঠি
সেউতা সংকটের সবচেয়ে সরাসরি ভূরাজনৈতিক ব্যাখ্যা ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র নয়–বরং মরক্কো ও স্পেনের অসম সম্পর্ক। ২০২১ সালে পলিসারিও ফ্রন্টের নেতা ব্রাহিম ঘালিকে চিকিৎসার জন্য স্পেনে আশ্রয় দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের পর মরক্কো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করলে প্রায় আট থেকে দশ হাজার মানুষ সেউতায় ঢুকেছিলেন।
বর্তমান সংকটের আগেও মরক্কোর প্রতিদ্বন্দ্বী আলজেরিয়ার সঙ্গে স্পেনের সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার খবর ছিল। স্প্যানিশ গোয়েন্দাদের ধারণা, রাবাত হয়তো ঢলটি সরাসরি আয়োজন করেনি, কিন্তু কার্যকর হস্তক্ষেপ না করে মাদ্রিদকে বার্তা দেওয়ার সুযোগ নিয়েছিল। মরক্কো অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২১ সালের সংকটের সময়ই সতর্ক করেছিল, মরক্কো ও স্পেনের রাজনৈতিক খেলায় অভিবাসীদের ‘ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাঁচ বছর পর সেউতা আবার একই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়েছে।
তাহলে কি স্পেনকে ইউরোপ থেকে ঠেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র?
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উত্তরটি প্রমাণিত নয়। স্পেনকে ইইউ থেকে জোর করে বহিষ্কারের আইনি পথও বর্তমান চুক্তিতে নেই। ইতালির পদক্ষেপ শেনজেনের সীমিত ও সাময়িক নিয়ন্ত্রণ; ইইউ সদস্যপদ বাতিল নয়। ড্যাননের বক্তব্যও ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক ভূখণ্ডনীতি বদলের ঘোষণা নয়। আল জাজিরার লেখাটিও একটি রাজনৈতিক মতামত, তদন্তমূলক প্রমাণ নয়।
তবে আরেকটি সত্যও উপেক্ষা করা যাবে না। মানবিক বিপর্যয়টি ঘটার পরপরই ইস্যুটিকে ব্যবহার করে স্পেনের অভিবাসননীতি আক্রমণ করা হয়েছে, শেনজেন থেকে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়ার দাবি উঠেছে, সেউতা-মেলিলায় স্পেনের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে এবং গাজায় মাদ্রিদের অবস্থানকে মুসলিম অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা হয়েছে।
অর্থাৎ সমন্বিত ষড়যন্ত্রের প্রমাণ নেই; কিন্তু সমন্বিত না হলেও একই দিকে কাজ করা রাজনৈতিক স্বার্থের উপস্থিতি স্পষ্ট। ইসরায়েলি কূটনৈতিক আক্রমণ, মার্কিন ডানপন্থীদের ভাষ্য এবং ইউরোপীয় অতি-ডান শিবিরের অভিবাসনবিরোধী প্রচার–প্রত্যেকের উদ্দেশ্য আলাদা হতে পারে, কিন্তু সম্মিলিত ফল একটিই: সানচেজ সরকারকে রক্ষণাত্মক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া এবং স্পেনের ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের রাজনৈতিক মূল্য বাড়িয়ে তোলা।
সেউতার সীমান্তে তাই শুধু হাজার হাজার মানুষই ঢোকেনি। সেই ফাঁক দিয়ে ইউরোপের ভেতরে ঢুকে পড়েছে পুরনো আদর্শিক সংঘাত–অভিবাসন বনাম নিরাপত্তা, মুসলিম পরিচয় বনাম ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ এবং ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়ানো বনাম ইসরায়েলপন্থী ভূরাজনীতি।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু কে সীমান্ত খুলেছিল, তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন: মানুষের দুর্দশাকে কাজে লাগিয়ে কারা স্পেনকে ইউরোপের ভেতর একঘরে করতে চাইছে, আর কারা সেই আতঙ্ককে নিজের রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করছে?






