টার্গেট: ব্রেক্সিটের দূরত্ব হ্রাস
ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের ফি ছাড়ের ইঙ্গিত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর

সংগৃহীত ছবি
ব্রেক্সিটের পর যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে, তা কমানোর পথে আরও একটি বড় পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পড়ুয়াদের জন্য ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি কমিয়ে আনা যায় কি না, সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তিনি প্রস্তুত বলে জানা গেছে। তবে এই ছাড় কোনও একতরফা সিদ্ধান্ত হবে না; ইউরোপের সঙ্গে বৃহত্তর সমঝোতার অংশ হিসেবেই বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ শিক্ষার্থী ব্রিটেনে পড়তে গেলে ‘ইন্টারন্যাশনাল ফি’ দিতে হয়, যা ব্রিটিশ ও আইরিশ শিক্ষার্থীদের দেওয়া ‘হোম ফি’-র তুলনায় অনেক বেশি। ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের আবার আগের মতো কম খরচে ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি দীর্ঘদিন ধরেই জানিয়ে আসছে ইইউ।
ব্রেক্সিটের আগে ইইউর নাগরিকেরা ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের মতোই তুলনামূলক কম ফি-তে পড়াশোনা করতে পারতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারি ছাত্রঋণের সুবিধাও পেতেন। কিন্তু ২০২১ সাল থেকে সেই সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রিটেনে পড়ার খরচ অনেক বেড়ে যায়।
ইইউর অন্যতম দাবি
যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে নতুন সম্পর্ক গড়ার আলোচনায় শিক্ষার্থীদের ফি এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় পক্ষের দাবি, তাদের শিক্ষার্থীরা যেন ব্রিটিশ পড়ুয়াদের মতো একই হারে ফি দিতে পারে। বিনিময়ে যুব বিনিময় কর্মসূচি, বাণিজ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে।
ইউরোপীয় কর্মকর্তারা বলছেন, ব্রিটেন যখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ ছিল, তখন এই সুবিধা স্বাভাবিক ছিল। এখন সম্পর্ক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সেটি ফিরিয়ে আনার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
তবে লন্ডনের জন্য বিষয়টি সহজ নয়। কারণ ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের ‘হোম ফি’ সুবিধা দিলে ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় কমতে পারে। এর আগে হিসাব করা হয়েছিল, এমন সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয় খাতে বছরে কয়েক কোটি পাউন্ডের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
স্টারমারের পরিকল্পনা, বার্নহ্যামের পরীক্ষা
এই পরিকল্পনার সূত্রপাত হয়েছিল আগের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সময়ে। ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের আলোচনায় ব্রিটিশ সরকার ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের জন্য ফি কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করেছিল। প্রস্তাব ছিল, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য যে উচ্চ ফি দিতে হয়, সেটি কমিয়ে ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের সমতুল্য পর্যায়ে আনা যায় কি না।
এখন সেই আলোচনার উত্তরাধিকার পেয়েছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তাঁর সামনে একদিকে রয়েছে ইউরোপের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার সুযোগ, অন্য দিকে রয়েছে দেশের অভ্যন্তরে অভিবাসন ও সরকারি ব্যয়ের বিষয়ে রাজনৈতিক চাপ।
বার্নহ্যাম আগে থেকেই ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে কথা বলেছেন। তবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁকে ব্রেক্সিটপন্থী ভোটারদের মনোভাবও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। বিশেষ করে তাঁর নিজের নির্বাচনী এলাকা উত্তর ইংল্যান্ডের ভোটারদের মধ্যে অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
শুধু ছাত্র নয়, যুব বিনিময় নিয়েও আলোচনা
বিশ্ববিদ্যালয় ফি কমানোর বিষয়টি বৃহত্তর একটি যুব বিনিময় কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন চাইছে, তরুণদের জন্য ব্রিটেন ও ইউরোপের মধ্যে পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ বাড়ানো হোক। তবে ব্রিটিশ সরকার সংখ্যার উপর সীমা রাখতে চায়।
ইইউর কর্মকর্তারা ১ লাখের বেশি তরুণের অংশগ্রহণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে জানা গেছে। অন্য দিকে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা তুলনামূলক কম সীমা নিয়ে আলোচনা করছেন।
এই বিষয়টিই আলোচনার অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ব্রিটেন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন চায় আরও বেশি মানুষের চলাচলের সুযোগ।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বস্তি, রয়েছে প্রশ্নও
ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। ব্রেক্সিটের পর ইউরোপ থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মতে, বিদেশি শিক্ষার্থীরা শুধু ফি নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখেন।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, দেশের করদাতাদের অর্থে পরিচালিত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আবার বিশেষ সুবিধা দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত হবে। বিশেষ করে যখন ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে।
বার্নহ্যাম সরকার তাই বিষয়টি নিয়ে সতর্ক ভাবে এগোতে চাইছে। কোনও সিদ্ধান্ত হলে সেটি ইউরোপের সঙ্গে একটি বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবেই আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্রেক্সিটের পর ছিন্ন হওয়া সম্পর্ক জোড়ার চেষ্টায় শিক্ষা খাতকে নতুন সেতু হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে ব্রিটেন ও ইইউ। কিন্তু সেই সেতু কতটা শক্ত হবে, তা নির্ভর করছে ফি কমানোর প্রতিশ্রুতি, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং বাণিজ্যিক সমঝোতার জটিল সমীকরণের উপর।






