আফগানিস্তানে হঠাৎ পাকিস্তানের হামলা কেন

সংগৃহীত ছবি
ইরান যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়েছে পাকিস্তান। প্রাথমিকভাবে হয়েছে সফলও। পাকিস্তানের কূটনীতিক প্রচেষ্টায় হয়েছে সাময়িক যুদ্ধবিরতি। এখনো চলছে স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধের তৎপরতা। এত প্রচেষ্টার মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে শান্তির পক্ষেই পাকিস্তানের অবস্থান। যদিও সর্বশেষ শান্তি আলোচনা এখনো সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই চলছে পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধ। একাধিকবার হয়েছে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি। সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামাবাদ ইরান যুদ্ধ নিয়ে মধ্যস্থতায় ব্যস্ত থাকায় কিছুটা স্থিতিশীল ছিল পরিস্থিতি। তবে সোমবার আফগানিস্তান দাবি করে পাকিস্তান থেকে ছোড়া মর্টার ও ক্ষেপণাস্ত্র দেশটির একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসামরিক বাড়িঘরে আঘাত হানে। এতে নিহতের ঘটনাও ঘটেছে।
কোনো স্পষ্ট উসকানি ছাড়াই হঠাৎ এই হামলার সময় নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র–ইরান শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর পাকিস্তান কি এখন ‘পিছিয়ে যাওয়ার পথ’ খুঁজছে?
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা আলোচনার আয়োজন করতে ব্যর্থ হয় পাকিস্তান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, চুক্তি না হলে ‘বোমা বর্ষণ’ হবে। অন্যদিকে তেহরান সতর্ক করেছে, তাদের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে নেওয়া হবে ‘চারগুণ’ প্রতিশোধ।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান কঠিন অবস্থায় পড়েছে। যুদ্ধ আবার শুরু হলে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো জড়িয়ে পড়তে পারে। যুদ্ধবিরতির আগে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব শিকার হয়েছিল একাধিকবার ইরানের হামলার।
হঠাৎ আফগানিস্তানে হামলা
পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে ন্যাটো-ধাঁচের প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে—একটির ওপর হামলা মানে উভয়ের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে সৌদি আরব আবার আক্রান্ত হলে অর্থনৈতিকভাবে চাপে থাকা পাকিস্তানকে সামরিকভাবে সহায়তা করতে হতে পারে রিয়াদকে। চলতি মাসেই এই চুক্তির অংশ হিসেবে পাকিস্তান প্রায় ১৩ হাজার সেনা ও ১২–১৮টি যুদ্ধবিমান সৌদি আরবে পাঠায়।
যুদ্ধ আবার শুরু হলে পাকিস্তান শুধু সামরিক নয়, কূটনৈতিক দিক থেকেও চাপে পড়বে, কারণ তখন তাকে মিত্র ইরানের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে দেশে তৈরি হতে পারে রাজনৈতিক অস্থিরতাও।
ইরান একটি শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় তাকে আক্রমণ করলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, কারণ দেশটির প্রায় ২০ শতাংশ জনগণ শিয়া।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব কারণেই পাকিস্তান আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘাত উসকে দিয়েছে।
নতুন কিছু নয়
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার সময় অতীতেও পাকিস্তান আফগান সীমান্তে সংঘাত বাড়িয়েছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান কাবুলসহ বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা চালায়, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান হামলার ঠিক আগের দিন। এতে তালেবানের তীব্র পাল্টা প্রতিক্রিয়া আসে এবং দুই দেশ কার্যত ‘খোলা যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়ে।
যদিও পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) আশ্রয়ের অভিযোগ করে আসছে। ৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামাবাদের একটি মসজিদে আত্মঘাতী হামলায় ৩০ জনের বেশি নিহত হওয়ার পরও পাকিস্তান কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করে ২৮ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানে হামলা চালায়।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিকভাবে দুর্বল আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পাকিস্তান দেখাতে পারে যে তারা নিজস্ব এক যুদ্ধে ব্যস্ত, যা সৌদি আরবকে সরাসরি সহায়তা না করার একটি অজুহাত তৈরি করে।
মধ্যস্থতা ভেস্তে যাওয়া
মার্চের শেষদিকে চীনের মধ্যস্থতায় আফগানিস্তান-পাকিস্তানের মধ্যে আবার যুদ্ধবিরতি হয়। একই সময়ে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার ভূমিকায় সক্রিয় হয়।
প্রথমদিকে কিছু অগ্রগতি হয়। এপ্রিলের শুরুতে পাকিস্তান মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল এবং ইরানি নেতাদের আলোচনায় বসাতে সক্ষম হয়। এতে কিছুটা উজ্জ্বল হয় পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি।
তবে পরবর্তী সময়ে এই প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়। ইরানের সঙ্গে আস্থার সংকট বাড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের দাবি মানাতে ব্যর্থ হয় পাকিস্তান। ফলে ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা আলোচনা শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়।
এরপর থেকেই ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে, এই আশঙ্কায় পাকিস্তান আবার পুরোনো কৌশলে ফিরে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সোমবার কুনার প্রদেশে হামলায় সৈয়দ জামালউদ্দিন আফগানি বিশ্ববিদ্যালয় আংশিক ধ্বংস হয় এবং বেসামরিক বাড়িঘর ধ্বংস হয় বলে আফগানিস্তান দাবি করেছে। প্রায় ১০ জন নিহত এবং ৮০ জনের বেশি আহত হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে একে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলেছে পাকিস্তান।
এই সহিংসতার সুনির্দিষ্ট কারণ স্পষ্ট নয়। আফগান গণমাধ্যম টোলো নিউজ জানিয়েছে, স্পিন বোলদাক এলাকায় রবিবার পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে এক শিশু আহত হওয়ার পর তালেবান পাল্টা হামলা চালায়।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বাইরের চাপ মোকাবিলায় আফগানিস্তানকে কি একটি ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য সংঘাত ক্ষেত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে পাকিস্তান?



