২৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গায় মরিশাসজুড়ে কারফিউ
- তীব্র পানির সংকট ও পুলিশের গুলিতে রণক্ষেত্র মরিশাস

আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম শান্ত, সুসংগঠিত ও বিলাসবহুল পর্যটন স্বর্গ হিসেবে পরিচিত মরিশাস। এই দ্বীপরাষ্ট্রে বর্তমানে দেখা দিয়েছে নজিরবিহীন রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা। তীব্র পানির সংকট, লাগামহীন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং পুলিশের গুলিতে এক তরুণী গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় দেশটিতে ছড়িয়ে পড়েছে স্মরণকালের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী গণ-দাঙ্গা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মরিশাসের প্রধানমন্ত্রী নবীন রামগুলাম পুরো দেশজুড়ে রাত্রিকালীন অনির্দিষ্টকালের কারফিউ জারি করেছেন। একই সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামানো হয়েছে দেশটির বিশেষ আধা-সামরিক বাহিনী 'স্পেশাল মোবাইল ফোর্স'।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স, ওয়াশিংটন পোস্ট ও আফ্রিকা নিউজের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ১৯৯৯ সালের পর গত ২৭ বছরের ইতিহাসে এমন ভয়াবহ সহিংসতা ও লণ্ডভণ্ড পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপরাষ্ট্রটি।
খরা, পানির হাহাকার ও বিক্ষোভের সূচনা
মরিশাসে এই ক্ষোভের সূচনা মূলত অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ (৭ অক্টোবর) থেকে। দেশটির প্রধান প্রধান ওয়াটার রিজার্ভারগুলোর পানির স্তর বিপজ্জনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় রাজধানী পোর্ট লুইসসহ বিভিন্ন শহরে তীব্র খাবার পানির সংকট তৈরি হয়। দিনের পর দিন কল দিয়ে পানি না আসা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। বিভিন্ন এলাকায় নাগরিকেরা সড়ক অবরোধ করে কলস ও প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ শুরু করেন।
পুলিশের গুলি ও বারুদের বিস্ফোরণ
বিক্ষোভ চলাকালীন গত ৯ অক্টোবর পরিস্থিতি এক চরম ধ্বংসাত্মক রূপ নেয়। দেশটির ব্যু বাসিন-রোজ হিল এলাকার ক্যাম্প-লেভিউ সংলগ্ন পুলিশি ব্যারিকেডে এলোডি থমাস (২৭) নামের এক তরুণীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে এক পুলিশ সদস্য। গুলিতে ওই তরুণী রক্তাক্ত হয়ে লুটিয়ে পড়লে এবং আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হলে পুরো দ্বীপে দাবানলের মতো বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের ওপর পেট্রোল বোমা, আতশবাজি ও পাথর নিক্ষেপ শুরু করে। ক্ষুব্ধ নাগরিকেরা টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে প্রধান মহাসড়কগুলো অবরুদ্ধ করে ফেলে। একের পর এক সুপারমার্কেট লুটপাট, যানবাহন ভস্মীভূত এবং বেশ কয়েকটি পুলিশ ফাঁড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
সরকারের কড়া পদক্ষেপ ও রাত্রিকালীন কারফিউ
পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী নবীন রামগুলাম জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে অপরাধী চক্র ও সুযোগসন্ধানী ড্রাগ মাফিয়াদের দায়ী করে দেশজুড়ে প্রতিদিন রাত ৮টা ৩০ মিনিট থেকে ভোর পর্যন্ত কারফিউ জারির ঘোষণা দেন।
একই সাথে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মরিশাসের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চাইল্ডকেয়ার সেন্টার ও গণপরিবহন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ একাধিক ইউরোপীয় দেশ তাদের পর্যটকদের মরিশাস ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা ও ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি জারি করেছে। বিশ্বজুড়ে পর্যটনের জন্য খ্যাত শান্ত মরিশাসের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।



