হিলারি ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড কারা পান, বাংলাদেশ থেকে আর কে পেয়েছেন

‘হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’ হাতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি : সংগৃহীত
শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে এবার ‘হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার হাতে পুরস্কার তুলে দেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।
ড. ইউনূসই প্রথম নন, এর আগেও এক বাংলাদেশ এই পুরস্কার পেয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় নারী শিক্ষার্থীরা ২০২৫ সালে পান এই পুরস্কার।
এই পুরস্কার কী
‘হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’ মূলত নারী অধিকার, শান্তি, নিরাপত্তা ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি।
হিলারি ক্লিনটন ও জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটির (জিআইডব্লিউপিএস) যৌথ ব্যবস্থাপনায় এটি দেওয়া হয়। বর্তমানে এর লক্ষ্য হলো নারী অধিকার এগিয়ে নেওয়া এবং আরও শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের সম্মান জানানো।
পুরস্কারটির নাম হিলারি ক্লিনটনের নামে হলেও এটি শুধু নারীদের দেওয়া হয় না। অতীতে পুরুষ কূটনীতিক, শান্তি আলোচক ও সাবেক সরকারপ্রধানও এই সম্মান পেয়েছেন। অর্থাৎ নারী অধিকার, শান্তি ও নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখাই এখানে মূল বিবেচনা।
কবে থেকে শুরু
পুরস্কারটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ২০১৪ সালে। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জিআইডব্লিউপিএস ২০১৪ সালে ‘হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ডস ফর অ্যাডভান্সিং উইমেন ইন পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি’ চালু করে।
এর পেছনে ছিল জিআইডব্লিউপিএস প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে হিলারি ক্লিনটন জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। পরে হিলারি ক্লিনটন ও জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট জন জে. ডিগিওয়ার উদ্যোগে ইনস্টিটিউটটি গড়ে ওঠে।
প্রথমবার ২০১৪ সালে এ পুরস্কার পান ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ, কঙ্গোর চিকিৎসক ও মানবাধিকারকর্মী ডেনিস মুকওয়েগে এবং ন্যাটোর তৎকালীন মহাসচিব অ্যান্ডার্স ফগ রাসমুসেন। তাদের শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকার জন্য সম্মানিত করা হয়।
পরের বছরগুলোতে পুরস্কারের আওতা আরও বিস্তৃত হয়েছে। শান্তি আলোচক, মানবাধিকারকর্মী, নারী অধিকারকর্মী, সাংবাদিক, সাবেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান—বিভিন্ন ক্ষেত্রের ব্যক্তিরা এ সম্মান পেয়েছেন। পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকায় জুলিয়া গিলার্ড, ক্রিস্টিয়ান আমানপুর, মিশেল ব্যাশেলে, নাদিয়া মুরাদসহ আরও অনেকে রয়েছেন।
ড. ইউনূসকে কেন দেওয়া হলো
২০২৬ সালের পুরস্কারের মূল বিষয় ছিল নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করা। জর্জটাউন বলেছে, এ বছর এমন নেতাদের সম্মান জানানো হয়েছে যারা নারীদের অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়িয়ে তাদের সমাজের সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখছেন।
এই বিবেচনায় ড. ইউনূসের ক্ষেত্রে সামনে এসেছে গ্রামীণ ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণের দীর্ঘদিনের কাজ। হিলারি ক্লিনটন পুরস্কার দেওয়ার সময় গ্রামীণ ব্যাংকের কাজের কথা তুলে ধরে বলেছেন, তিনি নিজে এর কার্যক্রম দেখেছেন এবং এর মাধ্যমে নারীরা কীভাবে আত্মনির্ভরশীল ও ক্ষমতাবান হয়েছেন, তা প্রত্যক্ষ করেছেন।
তার মতে, ইউনূস এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিয়েছেন।
ইউনূসও পুরস্কার গ্রহণের সময় গ্রামীণ ব্যাংকের ৫০ বছরের কাজের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করা এবং নারীদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করাই তাদের কাজের অন্যতম লক্ষ্য।
এ বছরে আরও কারা পেলেন
২০২৬ সালে ইউনূসের সঙ্গে আরও দুজন ব্যক্তি ‘হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন। তারা হলেন ভারতের সেলফ-এমপ্লয়েড উইমেনস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক রীমা নানাবতী এবং ফ্যাশন ডিজাইনার ও টোরি বার্চ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা টোরি বার্চ।
এ ছাড়া জর্ডানের মাইক্রোফান্ড ফর উইমেনের বোর্ড চেয়ার মুনা সুখতানকে দেওয়া হয়েছে নতুন ‘জর্জটাউন অ্যাম্বাসাডরস অ্যাওয়ার্ড’।
বাংলাদেশ থেকে আগে কারা পেয়েছেন
২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রথম এই পুরস্কার পান জুলাই অভ্যুত্থানে নারী শিক্ষার্থী আন্দোলনের নেতারা। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিআইডব্লিউপিএস ২০২৫ সালের পুরস্কারে ‘উইমেন স্টুডেন্ট প্রটেস্ট লিডার্স অব বাংলাদেশ’-কে সম্মানিত করে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে এসব নারী শিক্ষার্থী নেতৃত্বের ভূমিকা রাখেন। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন এবং দমন-পীড়ন, যোগাযোগ বন্ধ ও সহিংসতার মধ্যেও আন্দোলন চালিয়ে যান। তাদের ‘গণতন্ত্র রক্ষায়’ ভূমিকার জন্য ২০২৫ সালের পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।
তাদের পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন তানজিনা তাম্মিম হাপসা। তিনি ২০২৪ সালের আন্দোলনের নেতৃত্বদাতা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের একজন ছিলেন। জর্জটাউনের তথ্য অনুযায়ী, তিনি নারী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংগঠিত করতে এবং আহতদের সহায়তায়ও কাজ করেন।
এখানে একটি বিষয় আলাদা করে দেখা দরকার। বাংলাদেশের নারী শিক্ষার্থী নেতারা দলগতভাবে ২০২৫ সালের পুরস্কার পেয়েছেন। অন্যদিকে ড. ইউনূস ২০২৬ সালে ব্যক্তি হিসেবে এই পুরস্কার পেলেন।
পুরস্কারটির গুরুত্ব কোথায়
পুরস্কারটির গুরুত্ব শুধু ব্যক্তিগত সম্মানে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে মূলত নারী নেতৃত্ব, শান্তি, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও গণতন্ত্র—এই বিষয়গুলোকে একসঙ্গে সামনে আনা হয়। সময়ের সঙ্গে পুরস্কারের ক্ষেত্রও বদলেছে।
কখনো শান্তি আলোচনায় নারীর অংশগ্রহণ, কখনো গণতন্ত্র রক্ষা, আবার কখনো নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর দুটি আলাদা অধ্যায় তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থীদের ভূমিকা স্বীকৃতি পেয়েছে। এক বছর পর সেই একই পুরস্কারে ড. ইউনূস সম্মানিত হলেন তার দীর্ঘ পাঁচ দশকের ক্ষুদ্রঋণ, দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কাজের জন্য।
ফলে হিলারি ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ডের ইতিহাসে বাংলাদেশ এখন ব্যক্তি ও দল—দুই ধরনের স্বীকৃতির সঙ্গেই যুক্ত।






