যুক্তরাষ্ট্রকে অবিশ্বস্ত বলল ইরান, শান্তি আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কোনো আস্থা নেই বলে জানিয়েছে ইরান। দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা বলছেন, তেহরান আলোচনার পথ বন্ধ করেনি, তবে ওয়াশিংটন আন্তরিকতার প্রমাণ না দিলে স্থায়ী কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ইরান ঘোষণা দিয়েছে, আপাতত তাদের সামরিক অভিযান শেষ হলেও ইসরায়েল নতুন করে হামলা চালালে দেওয়া হবে আরও কঠোর জবাব।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি জানাচ্ছিলেন, নীতিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে ইরানের কোনো আপত্তি নেই। তবে তার জন্য ওয়াশিংটনকে প্রমাণ করতে হবে যে, সত্যিই আলোচনার নিয়ম মেনে চলতে আগ্রহী তারা।
‘যদি আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে তারা সত্যিকার অর্থে আলোচনায় বিশ্বাসী এবং আলোচনার নিয়ম মেনে চলে, তাহলে ইরানের কোনো সমস্যা নেই। কারণ আমরা সংলাপ ও আলোচনার যুক্তিতে বিশ্বাসী।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছেন আজিজি। বলছিলেন, ‘বহুবার বলেছি, আলোচনাকে যুদ্ধক্ষেত্রেরই ধারাবাহিকতা হিসেবে গ্রহণ করেছি আমরা। এ আলোচনাকে মনে করছি সংগ্রামেরই অংশ।’ তার ভাষ্য, ইরানের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা কিংবা কার্যকর কোনো সমঝোতার কাঠামো গড়ে তোলার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তরিকতা দেখা যাচ্ছে না। তিনি মন্তব্য করেন, ‘এই আচরণ চলতে থাকলে উত্তর হবে, না। আমাদের কোনো আস্থাই নেই।’
এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় দেশটির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিও চায় না, আবার সংলাপও চায় না।
‘আমরা কেবল প্রতিশ্রুতি বা স্লোগান নির্ভর হয়ে সামনে এগোতে চাই না; বরং ইরানি কর্তৃত্ব ও যৌক্তিকতার সঙ্গে আমাদের একটি সুকৌশলী বিজয় অন্বেষণ করতে হবে।’
গালিবাফ আরও বলেন, ‘সামরিক ক্ষেত্র, কূটনৈতিক ক্ষেত্র, জনগণের অংশগ্রহণের ক্ষেত্র এবং জনগণের সেবার ক্ষেত্র, এগুলো একই কাপড়ের সুতা ও তন্তুর মতো। যদি কূটনীতিকে কেবল বদ্ধ ঘরের সংলাপ এবং কূটনৈতিক হাসি হিসেবে বিবেচনা করি আমরা, তবে শুরুতেই হব ব্যর্থ।’
তার ভাষ্য, ‘আমাদের লক্ষ্য যুদ্ধের অবসান এবং স্থিতিশীল নিরাপত্তা। বিরোধী পক্ষের ওপর আমাদের কোনো আস্থা নেই। নৌ অবরোধকে শত্রুর জন্য আরেকটি ব্যর্থতায় পরিণত করব আমরা।’
একই ধরনের অবস্থান তুলে ধরেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা জাতীয় ক্ষমতার দুটি ডানার মতো। আমরা যুদ্ধের ময়দান ছাড়িনি, আলোচনার টেবিলও ছাড়িনি।’
অন্যদিকে ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফের দাবি, সাম্প্রতিক হামলায় নতুন মাত্রার প্রতিরোধক্ষমতা প্রদর্শন করেছে ইরান। তিনি বলেন, ‘শক্তিশালী ইরানের নতুন পর্যায়ের প্রতিরোধক্ষমতা দেখিয়েছে অপারেশন নাসর।’
তার দাবি, ইরানের সাম্প্রতিক হামলার পর আবারও যুদ্ধবিরতির জন্য অনুরোধ করতে বাধ্য হয়েছে ইসরায়েল। তবে ইরান যুদ্ধ চায় না, কিন্তু নিজেদের ভূখণ্ড ও মূল্যবোধ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না বলেও জানান তিনি।
এর মধ্যে এক বিবৃতিতে চলমান সামরিক অভিযান সমাপ্তির ঘোষণা দিয়েছে ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর। তবে বিবৃতিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ইসরায়েল যদি ইরান বা লেবাননে নতুন করে হামলা চালায়, তাহলে আগের চেয়ে আরও কঠোর ও শক্তিশালী জবাব দেবে তেহরান।
এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি একযোগে ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর ৪০ দিন পর ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ওয়াশিংটন ও তেহরান। ১১ ও ১২ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রায় ২১ ঘণ্টার আলোচনা হলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। এরপর থেকে অব্যাহত রয়েছে নতুন বৈঠকের চেষ্টা।
মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সোমবার এক বার্তায় জানান, শান্তি আলোচনা সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। সব পক্ষকে সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
এপ্রিলের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে দেশটির বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালির উপকূলে ইরানের নজরদারি স্থাপনায়ও হামলা চালানো হয়। এর জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান যুদ্ধবিরতিতে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিক পক্ষ নয়, তবু রবিবারের আগ পর্যন্ত ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি হামলা বন্ধ ছিল। তবে নতুন করে দুই দেশের মধ্যে হামলা শুরু হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শান্তি আলোচনা আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।




