নারী হকি
অনেক সংগ্রামের পর এশিয়ান গেমসের মাইলস্টোনে

সংগৃহীত ছবি
হঠাৎ একটা ঢেউ লেগেছে মেয়েদের হকিতে। মেয়েদের হকি দল আছে, এমন খবরও জানত না দেশের ক্রীড়াঙ্গনের বেশিরভাগ মানুষ। তাদের জন্য হকির অর্জনটা একদম ‘পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনার’ মতো। প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলতে নেমেই বাংলাদেশ নারী হকি দল পেয়ে গেছে এশিয়ান গেমসের টিকিট।
রবিবার ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ নারী হকি দল। অর্পিতা পাল, নাদিরারা এশিয়ান গেমস নারী হকির বাছাইয়ের গ্রুপসেরা হয়ে পৌঁছে গেছে সেমিফাইনালে। গেমসে খেলা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এখন তাদের লক্ষ্য ফাইনাল। মেয়েদের অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে আছে বিকেএসপি। ২০২০ সালে বিকেএসপিতে যোগ হয় নারী হকি, তাদের শিক্ষার্থীদের নিয়েই গড়ে উঠেছে এ দল। সত্যি বললে, পুরুষ হকির মতো নারী হকির জাগরণের পেছনে আছে বিকেএসপি।
এটা হলো নারী হকির প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শুরু ও সাফল্যের মাইলস্টোন। কিন্তু তার আগেও এ দেশে রচিত হয়েছে নারী হকির গল্প। এ জন্য ফিরে তাকাতে হবে সত্তরের দশকে যখন মেয়েদের জন্য খেলার মাঠ অতটা উন্মুক্ত ছিল না।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সত্তরের দশকে নারীদের খেলাধুলাকে ভালো চোখে দেখত না সমাজের বড় একটি অংশ। তারপরও শত প্রতিবন্ধকতা দূরে ঠেলে কিছু মুক্তমনা নারী খেলাধুলা চালিয়ে যান। তাদের কজনের উদ্যোগে ১৯৭৮ সালে প্রথম শুরু হয় নারী হকির পথচলা। ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত পাক্ষিক ক্রীড়াজগত পত্রিকায় একটি প্রতিবেদনে মিলেছে হকির শুরুর গল্প— ২৮ ডিসেম্বর ১৯৭৮ শীতের সুন্দর অপরাহ্ণ। হকি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এক মনোজ্ঞ প্রদর্শনী নারী হকি প্রতিযোগিতা। উপলক্ষ বিভিন্ন খেলাধুলায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মেয়েদের মাঝে সার্টিফিকেট বিতরণ। উদ্যোক্তা বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থা।
হকি, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, বাস্কেটবল, জিমন্যাস্টিকস ও টেবিল টেনিসে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৩০০ উৎসাহী মেয়ের মাঝে সার্টিফিকেট বিতরণ করেন জাতীয় ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থার চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এরশাদ। ১৯৭৭-এর ডিসেম্বরে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল, মেয়েদের বিভিন্ন খেলায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। স্কুল-কলেজ তো আছেই, মহল্লায় মহল্লায়ও সাড়া পড়ে গেল। সবাই এসে ভিড় জমাল মহিলা ক্রীড়া উন্নয়ন সংস্থার কার্যালয়ে। একমাত্র শর্ত— নাচতে নেমে ঘোমটা নয়, খেলার পোশাকেই খেলতে হবে। তবুও মেয়েদের উৎসাহে ভাটা পড়েনি। সালমা রফিকের নেতৃত্বে হকি ও বাস্কেটবল প্রশিক্ষণ চলল। হকির কোচ ছিলেন নূরুল ইসলাম নান্না ও বশির আহমেদ।
শুরুর সারথি
পরে অবশ্য মেয়েদের প্রশিক্ষণে বড় ভূমিকা রাখেন প্রয়াত আব্দুস সালাম, এহতেশাম সুলতানের মতো জাতীয় দলের কোচরা। শুরুর সেই মেয়েদের একজন আয়েশা জামান খুকি জানালেন কতটা কঠিন ছিল স্টিক হাতে তুলে নেওয়া, ‘আমাদের পরে ওরা হকিকে কোথায় নিয়ে গেছে! আমরা তো অত সুযোগ পাইনি। যখন মেয়েরা ঘরের বাইরে হতে পারত না, তখন আমরা হকি খেলছি। সালমা আপার উদ্যোগে আমরা শুরু করি। ব্যাংকার নাজমা শামিম আপারও অবদান কম নয়। নান্না ভাই ও বশির ভাই শিখিয়েছেন খেলাটা। আমরা জেলা পর্যায়ে কয়েকটি টুর্নামেন্ট খেলি। পরে ১৯৮১ সালে এরশাদ সরকার ক্ষমতায় এসে মেয়েদের হকি ও কাবাডি খেলা বন্ধ ঘোষণা করে। যেটা মেনে নেওয়া আমাদের জন্য ভীষণ কঠিন ছিল।’
তার কথাতেই পরিস্কার, ওখানেই থমকে গিয়েছিল মেয়েদের হকি। একটা খেলা সরকারিভাবে এমন বিধি-নিষেদের মধ্যে পড়ে গেলে আর সামনে এগোনোর সুযোগ থাকে না। স্বভাবিকভাবে হতোদ্যম হয়ে পড়েছিলেন হকির মেয়েরা।
শুরুর কয়েকজন: কাজী নাসিমা, আয়েশা জামান খুবি, নাসিমা পারভীন পুতুল, লাজুল আক্তার কস্তুরি, শাকিলা জাফর, মিউরেল গোমেজ, মুনমুন, নাহিদ, শাহীন, লাভলী, আফসানা, মালা, নাজনীন ও কলিন্স।
নান্নুর হাতে পুনর্জাগরণ
ক্রীড়া পরিদপ্তরের সহকারী পরিচালক তারিকুজ্জামান নান্নু নিজেও হকি খেলতেন। বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করলেও দায়িত্বে থাকাকালীন লেগে ছিলেন নারী হকিকে একটা কাঠামোয় দাঁড় করানোর কাজে। নারী হকির পুনর্জাগরণের শুরুটা তার হাত ধরে ২০০৪ সালে, ‘সে বছর আমরা ঢাকায় কয়েকটি স্কুল নিয়ে কাজ শুরু করি। কামরুন্নেসা স্কুল এবং ধানমন্ডি গার্লস স্কুলের মেয়েদের দুই শিফটে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি। পরে ভিকারুননিসা নূন স্কুলকেও সম্পৃক্ত করা হয় এবং ২০০৯ সালে প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা জেলা ক্রীড়া অফিসের উদ্যোগে মেয়েদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। ঢাকায় সফল হওয়ার পর বিভিন্ন জেলায় সম্প্রসারণ করি।’
নিজে হকি খেলোয়াড় হওয়ায় এর প্রতি ছিল তার বিশেষ টান। ক্রীড়া পরিদপ্তর ২০১৬ সালে জেলাভিত্তিক ক্যাম্প থেকে সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে ঢাকায় আবাসিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। ২০১৮ সালে কলকাতা ওয়ারিয়র্স নামে একটি দলকে ঢাকায় এনে তিন ম্যাচ সিরিজ খেলানো হয়। ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জেতে ক্রীড়া পরিদপ্তরের প্রশিক্ষিত দলটি। এ সাফল্যের পর ফেডারেশন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয় এবং ২০১৯ সালের অনূর্ধ্ব-২১ এএইচএফ কাপের জন্য সম্মিলিত ক্যাম্প শুরু হয়। সেই আসর দিয়ে বাংলাদেশ নারী দলের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাত্রা শুরু হয় ২০১৯ সালে। প্রথম ম্যাচেই বাংলাদেশ ২-০ গোলে হারায় শ্রীলঙ্কাকে। এরপর ২০২৩ সালে ওমানে ফাইভ-এ-সাইড টুর্নামেন্টে অংশ নেয়। ২০২৪ সালে সিঙ্গাপুরে অনূর্ধ্ব-২১ এএইচএফ কাপে রানার্সআপ হয় বাংলাদেশ। এভাবেই গড়ে ওঠে আজকের নারী হকি দল, যাদের স্টিকের জাদুতে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ।




