ক্লাব ফুটবল
সৌদি ফেলে হঠাৎ কেন তুরস্কে যাচ্ছেন মহাতারকারা?

মিসরের ফুটবল কিংবদন্তি মোহাম্মদ সালাহ সম্প্রতি তুরস্কের ক্লাব ট্রাবজোনস্পোরে যোগ দিয়েছেন।
একসময় মনে করা হতো সৌদির টাকার কাছে বুঝি পুরো ফুটবল বিশ্বই নতজানু হয়ে পড়বে। পিআইএফের অফুরন্ত অর্থে নেইমার, করিম বেনজেমা ও এনগোলো কান্তের মতো তারকাদের ভিড়ে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে উঠেছিল ফুটবলের নতুন দুনিয়া। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই উন্মাদনায় ভাটা পড়তে শুরু করেছে। রেকর্ড ট্রান্সফারের লোভ ছেড়ে বিশ্বের বড় বড় তারকারা এখন ইউরোপীয় ফুটবলের মোহ বজায় রেখেই পাড়ি জমাচ্ছেন তুরস্কে।
সৌদি আরব যেখানে বিপুল পরিমাণ টাকা ওড়াচ্ছে, সেখানে তুরস্ক এমন এক সুযোগ তৈরি করেছে যা মধ্যপ্রাচ্যের লিগে হয়তো কখনোই সম্ভব নয়। সেটা হলো—ইউরোপীয় ফুটবল, দুর্দান্ত জীবনযাত্রা এবং গ্যালারির খাঁটি উন্মাদনা। তুরস্কের ক্লাবগুলোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো উয়েফার ইকোসিস্টেম। যেসব তারকা খেলোয়াড় তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং জাতীয় দলের জার্সিতে নিজেদের জায়গা ধরে রাখতে চান, তাদের জন্য ইউরোপীয় ফুটবল ছাড়ার ঝুঁকি অনেক।
ফুটবল দুনিয়ায় এটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে, সৌদিতে যাওয়া মানেই ক্যারিয়ারের শেষ লগ্নে কিছু অর্থ কামিয়ে নেওয়া। সেখানে প্রতিযোগিতার তেজ অনেক কম। তাছাড়া ইউরোপিয়ান ফুটবলের মতো কদর নেই। কিন্তু তুর্কি ক্লাবগুলো নিয়মিত চ্যাম্পিয়নস লিগ, ইউরোপা লিগ কিংবা কনফারেন্স লিগে খেলায় খেলোয়াড়েরা বিশ্ব ফুটবলের মূল লাইমলাইটে থাকতে পারেন। এর স্পষ্ট প্রমাণ মিলছে সাম্প্রতিক ট্রান্সফার উইন্ডোগুলোতে।
উদাহরণস্বরূপ, গালাতাসারাইয়ে যোগ দিতে ভিক্টর ওসিমেন কিংবা আল-ইত্তিহাদের ১০০ মিলিয়ন ইউরোর লোভনীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে লেরয় সানে ইউরোপে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বেলজিয়ামের জার্সিতে ২০২৬ বিশ্বকাপ খেলা রোমেলু লুকাকু ৩৩ বছর বয়সে ফেনেরবাচে যোগ দিয়ে প্রমাণ করেছেন, তিনি এখনো শীর্ষ স্তরের প্রতিযোগিতাতেই থাকতে চান। আতলেতিকো মাদ্রিদ বা বার্সেলোনার আগ্রহ এড়িয়ে দুসান ভ্লাহোভিচ বেসিকতাসে নাম লিখিয়েছেন।
ঐতিহ্যগতভাবে তুরস্কের ফুটবল বাজারে শুধু ইস্তাম্বুলের তিন জায়ান্ট—গ্যালাতাসারাই, ফেনেরবাচে ও বেসিকতাসের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। তবে ব্ল্যাক সাউথ কোস্টের ক্লাব ট্রাবজোনস্পোরে মোহাম্মদ সালাহ যোগ দেওয়া পুরো সমীকরণ বদলে গেছে। লিভারপুলে নয় বছর কাটিয়ে মিসরের এই কিংবদন্তি সৌদি আরব ও এমএলএসের বড় প্রস্তাব ফিরিয়ে ট্রাবজোনস্পোরে দুই বছরের ফ্রি এজেন্ট চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। ট্রাবজোনের শান্ত পরিবেশ, মুসলিম সংস্কৃতি এবং ক্লাবটিকে লিগ জেতানোর মিশন তাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
প্রশ্ন হলো, তুরস্কের অর্থনীতি এবং মুদ্রার দরপতনের মাঝেও ক্লাবগুলো কীভাবে এত বড় অঙ্কের বেতনে খেলোয়াড় কিনছে? এর পেছনে রয়েছে তাদের অভিনব ট্যাক্স কৌশল এবং ঝুঁকিপূর্ণ অর্থায়ন। ইউরোপের অন্যান্য লিগে খেলোয়াড়দের গ্রস বেতনের ওপর বিশাল অঙ্কের কর দিতে হয়। কিন্তু তুরস্কে চুক্তিগুলো হয় সম্পূর্ণ ‘নেট বেসিক’ বা কর ব্যতীত প্রাপ্ত অঙ্কে। আইনগতভাবে ক্লাবগুলোই পুরো ট্যাক্সের বোঝা নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়।
উদাহরণস্বরূপ, মোহাম্মদ সালাহ ট্রাবজোনস্পোরে বছরে প্রায় ১৪.৫ মিলিয়ন পাউন্ড নিট বেতন পাবেন। প্রিমিয়ার লিগের কোনো ক্লাবকে এই পরিমাণ অর্থ বেতন দিতে হলে সপ্তাহে পাঁচ লাখ পাউন্ডের বেশি গ্রস বেতন দিতে হতো। গ্যালাতাসারাই ভিক্টর ওসিমেনকে প্রায় ১৫ মিলিয়ন এবং লেরয় সানেকে ৯ মিলিয়ন ইউরো নিট বেতন দিচ্ছে। ফেনেরবাচে এনগোলো কান্তে ও এদেরসনরা ১১ মিলিয়ন থেকে শুরু করে আকর্ষণীয় বোনাস পকেটে পুরছেন।
অবশ্য এই বিশাল খরচের পেছনে রয়েছে সরকারি ও বাণিজ্যিক স্পনসরশিপের বড় ভূমিকা, রিয়েল এস্টেট চুক্তি এবং কখনো কখনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। যদিও একসময় আন্ডার-দ্য-টেবিল দ্বৈত চুক্তির দুর্নাম ছিল, তবে তুর্কি ফুটবল ফেডারেশন (টিএফএফ) ও ফিফার কঠোর নিয়ম এখন তা অনেকটাই শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে এসেছে। তবে এই উচ্চাভিলাষী ট্রান্সফার নীতির ওপর চোখ রাঙাচ্ছে উয়েফার নতুন ফিন্যান্সিয়াল সাসটেইনবিলিটি রেগুলেশনস এবং স্কোয়াড কস্ট আইন। ইতোমধ্যে অতিরিক্ত খরচ করতে গিয়ে ফেনেরবাচসহ বেশ কিছু ক্লাব জরিমানার মুখেও পড়েছে। সব মিলিয়ে রেকর্ড ট্রান্সফার আর উত্তাল গ্যালারির টানে তারকারা এখন সৌদির মরুভূমির চেয়ে ইস্তাম্বুল ও কৃষ্ণসাগরের তীরকেই বেশি বেছে নিচ্ছেন।









