ফাইনালে ৪৪ বছরের বন্ধন

বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাস এমনিতেই সমৃদ্ধ। এর মধ্যেও কিছু পরিসংখ্যান এতটাই অদ্ভুত যে, সেগুলোকে প্রায় গল্পের মতো মনে হয়। তেমনই একটি গল্প জড়িয়ে আছে ইউরোপের দুই ক্লাব— বায়ার্ন মিউনিখ ও ইন্টার মিলানকে ঘিরে।
১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ পর্যন্ত টানা ১১ ফাইনালে ছিল বায়ার্ন ও ইন্টারের কেউ না কেউ। বিশ্বকাপে লড়াই করে দেশ, এখানে ক্লাব এলো কী করে? কাকতালীয় ব্যাপারটা হয়েছে এখানেই। ১৯৮২ থেকে ২০২২ সাল, প্রতি বিশ্বকাপ ফাইনালে দুই ক্লাবে খেলা অন্তত একজন হলেও ফুটবলারের উপস্থিতি ছিল মাঠে। ৪৪ বছর ধরে ফুটবলের সবচেয়ে বড় ম্যাচে দুই ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব চলে আসছে ধারাবাহিকভাবে।
শুরুটা ১৯৮২ সালের ফাইনালে। ইতালি ও পশ্চিম জার্মানির সেই ম্যাচে দুই দলের জার্সিতেই ছিলেন বায়ার্ন ও ইন্টারের একাধিক ফুটবলার। এরপর একে একে মেক্সিকো, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, রাশিয়া ও কাতার— প্রতিটি বিশ্বকাপ ফাইনালেই টিকে ছিল এই সংযোগ।
১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপের ফাইনালে আবারও পা রাখে পশ্চিম জার্মানি। এবার প্রতিপক্ষ ডিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। বায়ার্নের লোথার ম্যাথাউস, ডিয়েটর হোয়েনেস, নরবার্ট এডেরদের সঙ্গে তখন ছিলেন ইন্টারে চলে যাওয়া কার্ল হেইঞ্জ রুমেনিগেও। বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনা, পাশাপাশি বায়ার্ন-ইন্টারের সেই বন্ধন ছিল অটুট।
এরপর বছর গড়িয়েছে, বিশ্বকাপের আয়োজক বদলেছে, চ্যাম্পিয়ন বদলেছে, বদলেছে ফুটবলের ধারা। কিন্তু বদলায়নি একটি বিষয়— ফাইনালে বায়ার্ন ও ইন্টারের উপস্থিতি।
অনেক সময় দুই ক্লাবের খেলোয়াড়রা ছিলেন বিপক্ষ দলে, আবার কখনো একই দলের হয়ে শিরোপার জন্য লড়েছেন। ১৯৯০ সালে জার্মানরা বিশ্বকাপ জিতলেও তাদের লোথার ম্যাথাউস, ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমান ও আন্দ্রেয়াস ব্রেমে ছিলেন ইন্টারের খেলোয়াড়। ১৯৯৪ সালে ব্রাজিল-ইতালি ফাইনালে ইন্টারের নিকোলা বের্তি এবং বায়ার্নের জর্জিনিয়ো ছিলেন। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী দলে ছিলেন বায়ার্নের বিকসেন্তে লিজারাজু ও ইন্টারের ইউরি জোরকায়েফ। ২০০২ সালে ইন্টারের জয়জয়কার একাই ঘটিয়েছেন ব্রাজিল কিংবদন্তি রোনালদো। বিপক্ষে জার্মান দলে থাকা বায়ার্নের অলিভার কান, কারস্টেন ইয়াঙ্কার, টমাস লিঙ্কে ও ইয়েন্স জেরেমিসদের কেউই থামাতে পারেননি রোনালদোকে।
২০০৬ সালের বার্লিনের সেই স্মরণীয় ফাইনালে ইতালির হয়ে গোল করেছিলেন ইন্টারের মার্কো মাতেরাজ্জি। ফ্রান্সে ছিলেন বায়ার্নে খেলা উইলি স্যাগনল। ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডস দলেই ছিলেন দুই ক্লাবের তিনজন। বায়ার্নের আরিয়েন রবেন ও মার্ক ফন বোমেলের এবং ইন্টারের ওয়েসলি স্নেইডার।
সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত আসে ২০১৪ সালে। জার্মানি-আর্জেন্টিনা ফাইনালে বায়ার্নের সাতজন খেলোয়াড় মাঠে থাকলেও ইন্টারের কেউ কোনো দলের শুরুর একাদশে ছিলেন না। ম্যাচের শেষ দিকে বদলি হিসেবে ইন্টারের রদ্রিগো পালাসিও মাঠে নামায় অব্যাহত থাকে ধারাবাহিকতা।
২০২২ সালের ফাইনালেও ভাঙতে ভাঙতে শেষ পর্যন্ত রেকর্ডটি টিকে যায়। ফ্রান্সের হয়ে খেলেন বায়ার্নের দায়ো উপামেকানো এবং কিংসলে কোমান আর আর্জেন্টিনার হয়ে বদলি হিসেবে নামেন ইন্টারের লাউতারো মার্তিনেস।
অদ্ভুত এই গল্পের ধারাবাহিকতা এবারও থাকবে কি? যদি হতেই হয়, তবে ফাইনালে যেতে হবে ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, নেদারল্যান্ডস এমনকি কানাডার যেকোনো দুই দলকে।
কারণ ২০২৬ বিশ্বকাপে বায়ার্নের হয়ে খেলা এই দেশগুলোর হ্যারি কেইন, জামাল মুসিয়ালা কিংবা আলফোনসো ডেভিস, নয়তো ইন্টারের হয়ে খেলা লাউতারো মার্তিনেস, মার্কুস থুরাম ও ডেনজেল ডামফ্রিসকে উঠতে হবে ফাইনালে।




