প্রযুক্তি ব্যবহারের সুফল বিশ্বকাপে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াইয়ের জন্য নয়, মাঠে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নতুন নিয়ম যুক্ত করার কারণেও আলোচনায় এসেছে। বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের আগে কিছু পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে ফিফা। তাতে খেলার সময় নষ্ট হওয়া কমানো, সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্ভুলতা নিশ্চিতে সফল হওয়া গেছে অনেকটা। ফিফার রেফারিং কমিটির প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনাও নতুন উদ্যোগগুলোয় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
সময় নষ্ট হওয়া কমেছে
এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে সময় নষ্ট ঠেকানোর উদ্যোগে। বদলি হওয়া খেলোয়াড়কে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে মাঠ ছাড়তে হচ্ছে। গ্রুপ পর্বের ৭২ ম্যাচে মাত্র একজন খেলোয়াড় বদলিতে এ নিয়ম ভেঙেছে। তাই তার বদলে নামতে যাওয়া ফুটবলারকে এক মিনিট অপেক্ষা করতে হয়েছে। একইভাবে গোল কিক নিতে পাঁচ সেকেন্ডের বেশি সময় নেওয়ায় চারবার প্রতিপক্ষ কর্নার পেয়েছে। থ্রো-ইনের ক্ষেত্রেও সময়সীমা অতিক্রম করায় ১১ বার বলের দখল বদলে গেছে।
ইএসপিএনের রেফারিং বিশ্লেষক রেনাতা রুয়েল মনে করেন, ফুটবলে সময় নষ্টের প্রবণতা কমাতে এটি কার্যকর উদ্যোগ। তার মতে, রেফারিরা ঘড়ি দেখে নয়, গোল কিক-থ্রো-ইনে সময় গুনেছেন পরিস্থিতি বুঝে। চিকিৎসার অজুহাতে সময় নষ্ট কিংবা থ্রো-ইনে বিলম্ব— সব ক্ষেত্রেই নতুন নিয়ম ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ইতালীয় সংবাদপত্র লা গেজেত্তো দেল্লো স্পোর্ত অপটার তথ্য অনুযায়ী একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, এখন পর্যন্ত হওয়া ম্যাচগুলোয় গড়ে বল খেলার মধ্যে ছিল ৫৭ মিনিট ২২ সেকেন্ড করে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে এ সময় ছিল ৫৮ মিনিট ৮ সেকেন্ড, তখন ম্যাচের গড় দৈর্ঘ্য ছিল ১০২ মিনিট ৪৩ সেকেন্ড। এবার ম্যাচের গড় দৈর্ঘ্য নেমে এসেছে ৯৬ মিনিট ৮ সেকেন্ডে, কিন্তু বল খেলার মধ্যে থাকার হার বেড়ে হয়েছে ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ।
অফসাইডে গোল হওয়াও কমেছে
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও এবার বিশ্বকাপ নতুন মাত্রা পেয়েছে। কাতার বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি এবার আরও উন্নত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ব্যবস্থার মাধ্যমে অফসাইডের সিদ্ধান্ত আরও নিখুঁতভাবে দেখানো হচ্ছে। এর ফলে গড়ে প্রতি ম্যাচে অফসাইডের সংখ্যা ৩ দশমিক ৯ থেকে কমে ৩ দশমিক ৪-এ নেমেছে।
তবে এ প্রযুক্তি নতুন বিতর্কও তৈরি করেছে। ইরানের ডিফেন্ডার খলিলজাদেহর বুটের সামান্য অংশ এগিয়ে থাকায় তার গোল বাতিল হয়। একইভাবে কলম্বিয়ার ডাভিনসন সানচেসও মাত্র কয়েক সেন্টিমিটারের ব্যবধানে অফসাইডে ধরা পড়েন। ফলে প্রযুক্তিগত নির্ভুলতা ও ফুটবলের আবেগ— দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ছিল বলের ভেতরের চিপ সেন্সর। প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম এই প্রযুক্তি বল স্পর্শের সামান্য মুহূর্তও শনাক্ত করেছে। ক্রোয়েশিয়া-পর্তুগাল ম্যাচে মাটানোভিচের অতি সূক্ষ্ম স্পর্শ শনাক্ত হওয়ার পর অফসাইডে থাকা পাসালিচের গায়ের স্পর্শের কারণে গোল বাতিল হয়। এমনকি ইংল্যান্ড-নরওয়ে ম্যাচে বল আকাশে ঝুলন্ত ক্যামেরার তারে লেগেছিল কি না, সেটিও একই প্রযুক্তির মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে।
কমেছে ফাউল
বর্ণবাদবিরোধী প্রয়াসেও এসেছে নতুন নিয়ম। মুখ ঢেকে অপমানজনক বা বৈষম্যমূলক মন্তব্য করলে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এবার এ নিয়মে দুটি লাল কার্ড দেখানো হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পুরো টুর্নামেন্টে বর্ণবাদ বা বৈষম্যের কোনো ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি।
শৃঙ্খলার পরিসংখ্যানেও পরিবর্তন স্পষ্ট। ২০২২ বিশ্বকাপে মাত্র চারটি লাল কার্ড দেখা গেলেও এবার সেমিফাইনালের আগেই তা বেড়ে হয়েছে ১৫টি। অন্যদিকে গড়ে হলুদ কার্ড ৩ দশমিক ৪ থেকে কমে ২ দশমিক ৭-এ নেমেছে। প্রতি ম্যাচে ফাউলের সংখ্যা ২৫ দশমিক ২ থেকে কমে হয়েছে ২২ দশমিক ৯, আর পেনাল্টিও কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রযুক্তি ও নতুন নিয়মের সমন্বয়ে ফুটবলকে আরও দ্রুত, নির্ভুল এবং ন্যায্য করে তোলার পথে এগোচ্ছে ফিফা।
রেফারি বডি ক্যামেরা
এবারের বিশ্বকাপে সম্ভবত দারুণ একটি সংযোগ বলা যায় এ প্রযুক্তিকে। এর মাধ্যমে মাঠের আবহ সরাসরি দেখতে পারছেন দর্শকরা। ক্রিকেটে অনেক আগেই এই ক্যামেরা যুক্ত হয়েছে আম্পায়ারের ক্যাপে। এবার ফুটবল রেফারির গায়ে এই ক্যামেরা যোগ করায় নতুন অ্যাঙ্গেলে খেলার অংশ দেখা যাচ্ছে।
রোবট ডগ
নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য এ বিশ্বকাপে ব্যবহৃত আরেকটি প্রযুক্তি রোবট ডগ। এই ক্যামেরার মাধ্যমে মাঠের মধ্যে বা গ্যালারিতে, এমনকি স্টেডিয়ামের বাইরে নিরাপত্তাহীনতার কোনো মুহূর্ত তৈরি হচ্ছে কি না, তা খেয়াল রাখছে আয়োজকরা। এতে করে গ্যালারি থেকে মাঠে বোতল বা অন্য কোনো বস্তু ছুড়ে মারার ঘটনা কমেছে। এ ছাড়া গ্যালারি থেকে ফুটবলারদের উদ্দেশ্য করে কোনো বিরূপ মন্তব্য করাও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। সবচেয়ে বড় বিষয় বর্ণবাদী মন্তব্য একেবারে নেই বললেই চলে।
এছাড়া তিন মিনিটের বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেক এ বিশ্বকাপের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এতে দুই দলের ফুটবলাররা আমেরিকার অতিরিক্ত গরমে শরীরকে চাঙ্গা করে নেওয়ার সময় পাচ্ছেন। একই সঙ্গে এ সময়ে মূল পরিকল্পনায় ছোটখাটো কিছু যোগ করার হলে তা করে নিতে পারছেন কোচরা। শুধু তাই নয়, এই ব্রেকের মাধ্যমে ম্যাচের ধারা নিজেদের দিকে নিতে পারছে কোনো একটি দল। এর বাইরে সম্প্রচারস্বত্ব কেনা প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ব্রেক সোনায় সোহাগা। এ সময়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করে নিতে পারছে তারা।




