‘আমার গল্প শেষ হয়নি এখনো’

আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল।
যে মানুষটিকে নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে প্রশ্ন ছিল— তিনি কি আদৌ বিশ্বকাপে খেলবেন? খেললেও কি আগের সেই জাদু দেখাতে পারবেন? সময় যেন নিজেই সেসব সংশয়ের জবাব লিখছে।
কিংবদন্তিদের বয়স বাড়ে কিন্তু জাদু ফুরোয় না। দুই ম্যাচে তো লিওনেল মেসি শুধু খেলেননি, রীতিমতো ফুটবল পায়ে নতুন করে রাঙাতে শুরু করেছেন বিশ্বকাপ। আলজেরিয়ার জালে তিনবার বল পাঠিয়েছেন, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে যোগ করেছেন আরও দুটি। আর সেই সঙ্গে গড়েছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৮ গোলের নতুন মাইলফলক। আগের ম্যাচে ছুঁয়েছেন ১৬ গোল করা ক্লোসাকে, এ ম্যাচে জোড়া গোলে সেটিকে ছাড়িয়ে গেছেন।
বয়সের হিসাব, চোটের শঙ্কা, ফুরিয়ে যাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী— সবকিছু উপহাস করে তিনি আবারও দাঁড়িয়ে আছেন বিশ্ব ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দুতে। যেন সময়ের কাছে হার মানতে অস্বীকার করা এক ফুটবলশিল্পী, যার পায়ের ছোঁয়ায় এখনো জন্ম নেয় বিস্ময়।
কাতারে মেসি অধরা বিশ্বকাপ নিয়েছিলেন নিজের করে। তাতে জড়িয়ে ছিল বিশ্বকাপে দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা, স্বপ্নভঙ্গ, চাপ-তাপ ইত্যাদি। তাও আবার সৌদি আরবের কাছে হেরে শুরু হয়েছিল। তাই যেন খুব সতর্ক হয়েছিলেন কাতারে। কিন্তু এবার যেন বিশ্বকাপকে বানিয়েছেন উপভোগের মঞ্চ। ২০২৬-এর এই মঞ্চে জাদুকরকে দেখে মনে হচ্ছে— গল্পটা এখনো শেষ হয়নি। বরং নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে মেসির শুরুটা দেখে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি এক ট্র্যাজিক নায়কের গল্প হয়ে থাকবে। শুরুতেই পেনাল্টি মিস। তারপর হারিয়েছেন আরেকটি সহজ সুযোগ। বিশ্বকাপ ইতিহাসে তিন পেনাল্টি মিসের কালো রেকর্ডও যোগ হলো তার নামের পাশে। যে মানুষটিকে নিয়ে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন, তার কাঁধেই যেন জমা হচ্ছিল হতাশার ভার।
কিন্তু মহাকাব্যের নায়করা কি এত সহজে হার মানেন? মেসিও মানেননি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আবার উঠে দাঁড়ালেন। যে পায়ে পেনাল্টি মিসের রেকর্ড হয়েছে, সেই পায়ে অসাধারণ এক গোল করে এগিয়ে নেন দলকে। যেন বার্সেলোনার সেই মেসি ফিরেছেন ম্যাজিক নিয়ে। সেই দেখে হতাশ মুখগুলোতে ফিরে আসে বিজয়ের উল্লাস। ম্যাচ শেষ হওয়ার আগমুহূর্তে আরেকটি গোল করেন ঠিক তারুণ্যের ক্ষিপ্রতায়।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল। দুই ম্যাচে পাঁচ গোল। বিশ্বকাপে ১৮ গোলের নতুন ইতিহাস। আর তার চেয়েও বড় কথা, এখনো বেঁচে আছে অসম্ভব স্বপ্ন। অসম্ভব কল্পনা।
মেসি শুধু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়ছেন না, লড়ছেন সময়ের বিরুদ্ধে, বয়সের বিরুদ্ধে, সন্দেহের বিরুদ্ধেও। প্রতিটি গোল যেন একেকটি উত্তর, প্রতিটি উদযাপন যেন একেকটি ঘোষণা—
‘আমার গল্প এখনো শেষ হয়নি।’




