দুই অধিনায়কের দুই দর্শন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
স্প্যানিশ অধিনায়ক রোদ্রি বিশ্বকাপ ট্রফিটি যদি উঁচিয়ে ধরেন, তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কোনো উদযাপনের ছবি দেখার সুযোগ নেই। কারণ, এই মিডফিল্ডারের কোনো অফিসিয়াল প্রোফাইলই নেই! এই চরম প্রচারবিমুখতাই তার আসল পরিচয়। মাঠে হয়তো ড্রিবলিং বা স্কিল দিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দেন না, কিন্তু নিজের শান্ত নেতৃত্ব আর লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলের খেলার গতিপথকে সচল রেখে স্পেনকে বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে আসার অন্যতম নায়ক রোদ্রি।
লিওনেল মেসি একেবারে উল্টো দর্শনের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মিলিয়ন মিলিয়ন ফলোয়ার। তার পোস্ট সাড়া ফেলে পুরো বিশ্বে। ম্যাচের গতিপথ বদলে দেন জাদুকরী স্কিলে। এবারের বিশ্বকাপেই করেছেন ৮ গোল, অ্যাসিস্ট ৪টি। বিশ্বকাপ ট্রফি কি টানা দ্বিতীয়বার উঠবে তার হাতে? উত্তর মিলবে ফাইনাল শেষেই। তবে ফাইনালের গতিপথ নিশ্চিতভাবেই নিয়ন্ত্রণ করবেন রোদ্রি বা মেসি।
২০২৪ ইউরো জয়ী অধিনায়ক আলভারো মোরাতাকে বিশ্বকাপ দলেই নেননি স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তাই বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার ঠিক আগে কোচ অধিনায়কের আর্মব্যান্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রোদ্রিকে। বিশ্বকাপে অসাধারণ পারফর্ম করা রোদ্রিকে নিয়ে স্প্যানিশ দৈনিক এএস লিখেছে, ‘তরুণ এই দলটিতে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের একজন রোদ্রি। অভিজ্ঞতার জন্যই জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব পেয়েছেন তিনি। ফুটবলার হিসেবে তার প্রোফাইলটা একটু অন্য ঘরানার। তার কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নেই, শরীরে কোনো ট্যাটু নেই। তিনি শতভাগ গাম্ভীর্য ও দায়িত্বশীলতার প্রতীক। এর মানে এই নয় যে, লামিন ইয়ামালের মতো অন্য ধাঁচের খেলোয়াড়রা খারাপ। তবে লুইস দে লা ফুয়েন্তে তার দলে যে ধরনের মনোভাব দেখতে চান, রোদ্রি তার আদর্শ উদাহরণ।’
বিশ্বকাপে স্পেনের কাণ্ডারি রোদ্রি। মাঝমাঠে তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন খেলা। স্পেন সবসময়ই খেলে পাসনির্ভর ফুটবল। আর রোদ্রির ৭০৫টি পাস এই বিশ্বকাপেই সর্বোচ্চ। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়াম আর সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে রোদ্রির পারফরম্যান্স বুঝিয়েছে, ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে মাঠ কাঁপানো সেই অপ্রতিরোধ্য খেলোয়াড়টি ফিরেছেন চেনা ছন্দে।
২০২৪ সালে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন এই মিডফিল্ডার। সে বছরই সেপ্টেম্বরে ডান হাঁটুতে গুরুতর চোট পেয়ে দীর্ঘদিনের জন্য চলে যান মাঠের বাইরে। তার অভাব হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল ক্লাব ও জাতীয় দল। ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির পারফরম্যান্সেও এর বড় প্রভাব পড়ে।
ফাইনালে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার আগে রোদ্রি ‘মার্কা’কে বলেছেন, ‘কেউ যদি ভেবে থাকে যে, আমরা কোনোরকম কঠিন পরীক্ষা ছাড়াই বিশ্বকাপ জিতে যাব, তবে তারা ভুল ভাবছে। আর্জেন্টিনা বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। তবে এই টুর্নামেন্ট জেতার জন্য আমাদের দলটিও যথেষ্ট পরিপক্ব। দলের পারফরম্যান্স প্রতিনিয়ত উন্নত হচ্ছে। বিশ্বকাপ জুড়েই আমরা ধৈর্য ধরে রেখেছি আর এখন আমরা শিরোপা জয়ের লক্ষ্যেই মাঠে নামব।’
বিশ্বকাপ ট্রফি যদি লিওনেল মেসির হাতে ওঠে, তাহলে তা ২০২২ সালের কাতারের চেয়েও বড় কিছু হবে। মেসি ফুটবলে সম্ভাব্য সবকিছু জিতে ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের কাতারে বসে অনায়াসে অবসর নিতে পারতেন। কিন্তু মাঠে প্রতিটি সেকেন্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার যে আনন্দ, সেটি এখনো উপভোগ করছেন তিনি। এই ৩৯ বছর বয়সেও তিনি যেন এক বিস্ময়ের বাক্স, যিনি সব প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গেছেন। ফুটবলের বিবর্তনের এক অনন্য উদাহরণ মেসি। তিনি সবসময় ধারাবাহিক ছিলেন, প্রতিটি ম্যাচে খেলতে চেয়েছেন, এমনকি প্রীতি ম্যাচগুলোতেও।
একটা সময় বার্সেলোনার ফর্ম দেশের জার্সিতে আনতে না পারায় সমালোচিত হতেন মেসি। কোচ লিওনেল স্কালোনির হাত ধরে মেসির ক্যারিয়ারের মোড় পুরোপুরি ঘুরে যায়। ২০২২ বিশ্বকাপটা তার পায়ের জাদুতেই জিতেছে আর্জেন্টিনা। এবারও ৮ গোল আর ৪ অ্যাসিস্ট করে মেসিই আর্জেন্টিনাকে নিয়ে গেছেন ফাইনালে। শুধু এই বিশ্বকাপেই নয়, কয়েক বছর ধরে আর্জেন্টিনা খেলছে মেসিকে কেন্দ্র করে ফুটবলীয় কৌশল বা মানসিক শক্তি, দুই দিক থেকেই। প্রতিটি জয়ের সঙ্গে আর্জেন্টিনার মানুষ এই জাদুকরকে আরও বেশি ভালোবেসে আপন করে নিচ্ছেন। আর ৩৯ বছর বয়সেও মেসি ভক্তদের জন্য নিজের শেষ সুরটি (লাস্ট ট্যাঙ্গো) এখনো বাজিয়ে চলেছেন।
মেসি যতদিন মাঠে খেলছেন, চোখের সামনে আছেন, ততদিন হয়তো তার সেই অতিমানবীয় রূপটি কিছুটা সাধারণ মনে হতে পারে। তবে বিদায় নিলেই মেসি হয়ে উঠবেন ধরাছোঁয়ার বাইরের এক অনন্য আবেগের প্রতীক।
বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার আগে মেসি বলেছেন, ‘স্পেন দল হিসেবে খুবই ভালো আর আমি তাদের অনেক খেলোয়াড়কেই চিনি। তাদের অনেকেই বার্সায় খেলে— যে ক্লাবটিকে আমি ভালোবাসি আর এখন নিয়মিত অনুসরণ করি। আমরা জানি, এটি কঠিন একটি ম্যাচ হতে যাচ্ছে, তবে আমরা প্রস্তুত।’




