৭ স্থপতি
সবসময় বাংলার স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছেন সোহরাওয়ার্দী

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (৮ সেপ্টেম্বর ১৮৯২ – ৫ ডিসেম্বর ১৯৬৩)
অবিভক্ত ভারত থেকে ব্রিটিশদের বিদায় করা, নতুন রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া কিংবা পাকিস্তানি শোষকশ্রেণির বিরুদ্ধে বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করার সংগ্রামে যেসব রাজনীতিবিদ নিরলস আত্মনিবেদন করে গেছেন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাদের অন্যতম। ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিভাজনে বর্তমান বাংলাদেশ কোন রাষ্ট্রের সঙ্গে থাকবে, নাকি অখণ্ড বাংলাদেশ হবে– এসব গুরুতর প্রশ্নে তিনি রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় এ অঞ্চলের জনগণের হয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন; সবসময় সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন বাংলার মানুষের স্বার্থরক্ষার জন্য।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক পথচলার শুরু স্বরাজ পার্টিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে। ১৯২৩ সালে বেঙ্গল প্যাক্ট স্বাক্ষরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দীও ভূমিকা রেখেছিলেন। এ চুক্তি পিছিয়ে থাকা মুসলিমদের এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
১৯২৪ সালে কলকাতা পৌরসভার ডেপুটি মেয়র হন সোহরাওয়ার্দী। মেয়র ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাস। ১৯২৮ সালে সর্বভারতীয় খিলাফত সম্মেলন এবং সর্বভারতীয় মুসলিম সম্মেলন অনুষ্ঠানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি। মুসলমানদের মধ্যে তার ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত মুসলিম লীগের সঙ্গে জড়িত হননি। ১৯২৬ সালের শুরুর দিকে ইনডিপেনডেন্ট মুসলিম পার্টি নামে একটি দল গঠন করেছিলেন। ১৯৩৬ সালের শেষের দিকে এই দল বাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লিগের সঙ্গে একীভূত হয়। এ সুবাদে তিনি বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লিগের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন।
পাকিস্তােনর সূচনালগ্নেই তিনি উপলব্ধি করেন, পাঞ্জাবিদের আগ্রাসন থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে নতুন দল প্রয়োজন। ১৯৪৯ সালেই আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের উদ্যোগ নেন
১৯৪৩ সালে শ্যামা-হক মন্ত্রিসভার পদত্যাগের পর গঠিত খাজা নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভায় শ্রমমন্ত্রী, পৌর সরবরাহ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন সোহরাওয়ার্দী। তার এবং আবুল হাশিমের চেষ্টায় ১৯৪৬-এর নির্বাচনে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লিগ বিপুলভাবে বিজয়ী হয়। এর পর থেকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি ব্যাপক সমর্থন প্রদান করেন।
তবে ভারত ভাগের পূর্বমুহূর্তে শরৎচন্দ্র বসুসহ অখণ্ড স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র তৈরির প্রস্তাবনা পেশ করেছিলেন সোহরাওয়ার্দী। তিনিসহ অনেকেই চেয়েছিলেন, কলকাতা পূর্ববঙ্গের সঙ্গে থাকুক, অন্যথায় বাংলাদেশকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক। কিন্তু বিভিন্ন চেষ্টা-তদবির করেও সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এতে অত্যন্ত মর্মাহত হন তিনি।
পাকিস্তােনর সূচনালগ্নেই সোহরাওয়ার্দী উপলব্ধি করেন, পাঞ্জাবিদের আগ্রাসন থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে নতুন রাজনৈতিক দল প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যে ১৯৪৯ সালেই আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের উদ্যোগ নেন তিনি।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে যুক্তফ্রন্ট গঠনে মওলানা ভাসানী ও শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে সোহরাওয়ার্দীও পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। যদিও তিনি সরাসরি প্রাদেশিক নির্বাচনের প্রার্থী ছিলেন না, তবুও সমগ্র পূর্ব বাংলায় চষে বেড়িয়ে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে জনমত গঠনে রাখেন ভূমিকা। তার বাগ্মিতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা সাধারণ ভোটারদের মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করতে সাহায্য করে।
১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণয়নে ছিল তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। একই বছর চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর পদত্যাগের পর ১২ সেপ্টেম্বর তিনি পাকিস্তানের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৫৭ সালের ১১ অক্টোবর পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৫৮ সালে ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করে সোহরাওয়ার্দীসহ অনেকের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেন। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সরকার তাকে বন্দি করে। জেল থেকে বেরিয়েই তিনি স্বৈরাচার আইয়ুববিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট গঠনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু স্বাস্থ্যগত কারণে দেশের বাইরে যাওয়ার পর ১৯৬৩ সালে লেবাননের বৈরুতে তার মৃত্যু হয়। ঢাকা হাইকোর্টের পশ্চিম পাশে তিন নেতার কবরের একটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তিনি।




