কোরআনের বাণী
অন্যের গৃহে প্রবেশের ইসলামী শিষ্টাচার

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : নূর, আয়াত : ২৮
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
فَاِنۡ لَّمۡ تَجِدُوۡا فِیۡهَاۤ اَحَدًا فَلَا تَدۡخُلُوۡهَا حَتّٰی یُؤۡذَنَ لَكُمۡ ۚ وَ اِنۡ قِیۡلَ لَكُمُ ارۡجِعُوۡا فَارۡجِعُوۡا هُوَ اَزۡكٰی لَكُمۡ ؕ وَ اللّٰهُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ عَلِیۡمٌ
২৮. যদি তোমরা ঘরে কাউকেও না পাও তাহলে সেখানে প্ৰবেশ করবে না যতক্ষণ না তোমাদেরকে অনুমতি দেয়া হয়। যদি তোমাদেরকে বলা হয়, ‘ফিরে যাও’, তবে তোমরা ফিরে যাবে, এটাই তোমাদের জন্য অধিক পবিত্ৰ। আর তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আল্লাহ সবিশেষ অবগত।
এই আয়াত ইসলামের সামাজিক শিষ্টাচার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা তুলে ধরেছে। পূর্ববর্তী আয়াতে অনুমতি নিয়ে এবং সালাম দিয়ে অন্যের ঘরে প্রবেশের নির্দেশ দেওয়ার পর এখানে সেই বিধানের আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা এসেছে।
আল্লাহ তাআলা প্রথমে বলেছেন, যদি কোনো বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় সেখানে কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে নিজের ইচ্ছামতো ভেতরে প্রবেশ করা যাবে না। কারণ কোনো ঘরের মালিক বা বাসিন্দা উপস্থিত না থাকলেও ঘরটি তার ব্যক্তিগত সম্পদ এবং তার গোপনীয়তার অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে। অনেক সময় ঘরে মূল্যবান জিনিসপত্র, পারিবারিক তথ্য বা ব্যক্তিগত বিষয় থাকতে পারে। তাই কেবল দরজা খোলা দেখেই বা পরিচিত হওয়ার কারণে প্রবেশ করা বৈধ নয়। অবশ্য যদি পূর্বানুমতি থাকে অথবা বিশেষ দায়িত্বের কারণে প্রবেশের প্রয়োজন হয়, তাহলে ভিন্ন কথা।
এরপর আল্লাহ বলেছেন, যদি ঘরের অধিবাসীরা স্পষ্টভাবে বলে, “ফিরে যান”, তাহলে কোনো রকম কষ্ট, অপমানবোধ বা ক্ষোভ না রেখে ফিরে যেতে হবে। মানুষের ব্যক্তিগত সময়, পারিবারিক অবস্থা এবং বিভিন্ন প্রয়োজন থাকতে পারে। কেউ অতিথি গ্রহণের উপযুক্ত অবস্থায় নাও থাকতে পারেন। তাই কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া তার অধিকার। ইসলামের শিক্ষা হলো, এ অবস্থায় ফিরে যাওয়াকে অপমান মনে না করে ভদ্রতা ও তাকওয়ার পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করা।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হুয়া আযকা লাকুম’ অর্থাৎ ‘এটাই তোমাদের জন্য অধিক পবিত্র।’ এর অর্থ হলো, অনুমতি ছাড়া প্রবেশ না করা এবং ফিরে যেতে বলা হলে ফিরে আসা মানুষের চরিত্র, অন্তর ও সমাজকে পবিত্র রাখে। এতে সন্দেহ, অবিশ্বাস, কু-ধারণা, পারিবারিক অশান্তি এবং সামাজিক বিরোধ কমে যায়। ব্যক্তি অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে শেখে এবং পারস্পরিক সম্পর্ক আরও সুন্দর হয়।
আয়াতের শেষে আল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহ তোমরা যা কর সে সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।” অর্থাৎ কেউ বাহ্যিকভাবে শিষ্টাচার মেনে চললেও যদি অন্তরে অসন্তোষ পোষণ করে, কিংবা গোপনে অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় জানার চেষ্টা করে, আল্লাহ তা জানেন। আবার যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে আল্লাহর বিধান মেনে অন্যের গোপনীয়তাকে সম্মান করে, আল্লাহ তার এই আনুগত্যও জানেন এবং তার প্রতিদান দেবেন।
এই আয়াত থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, ইসলামে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা একটি মৌলিক মানবাধিকার। অন্যের ঘর, পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ঈমানি চরিত্রের অংশ। অনুমতি ছাড়া প্রবেশ না করা, অন্যের সিদ্ধান্তকে সম্মান করা এবং ফিরে যেতে বলা হলে বিনয়ের সঙ্গে ফিরে আসা একজন মুসলিমের উত্তম আদব ও সভ্যতার পরিচয়। এই শিক্ষার অনুসরণে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে পারস্পরিক বিশ্বাস, নিরাপত্তা ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
তাফসির উৎস: তাফসিরে তাবারি, তাফসিরে ইবনে কাসির, তাফসিরে কুরতুবি, তাফসিরে -সা'দি; সূরা নূর, আয়াত ২৭-২৮।




