আজ রাতে পবিত্র কাবায় লাগানো হবে নতুন গিলাফ
- সোনা-রুপার সূচিকর্মে সজ্জিত পবিত্র গিলাফে ফুটে উঠেছে ইসলামি শিল্প, ঐতিহ্য ও ভালোবাসার অনন্য মহিমা

কাবা শরিফের বার্ষিক গিলাফ পরিবর্তনের আগে প্রিন্স সৌদ বিন মিশআল বিন আবদুল আজিজ নতুন কিসওয়া কাবার তত্ত্বাবধায়কদের কাছে হস্তান্তর করছেন
পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দু পবিত্র কাবা। প্রতিদিন অসংখ্য দৃষ্টি, অগণিত প্রার্থনা ও অশ্রুসিক্ত মুনাজাত এসে মিলিত হয় এই মহান ঘরকে ঘিরে। আর সেই কাবাকে আবৃত করে রাখা কালো রেশমের গিলাফ, ‘কিসওয়া’, মুসলিম বিশ্বের কাছে শুধু একটি কাপড় নয়; এটি ঈমান, শ্রদ্ধা, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক আবেগের এক জীবন্ত প্রতীক। নতুন হিজরি বছর ১৪৪৮ হিজরির সূচনাকে সামনে রেখে সেই কাবা শরিফের নতুন কিসওয়া প্রস্তুত সম্পন্ন করেছে সৌদি আরব।
দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের পক্ষ থেকে মক্কা অঞ্চলের উপগভর্নর প্রিন্স সৌদ বিন মিশআল বিন আবদুল আজিজ আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন কিসওয়াটি কাবা শরিফের তত্ত্বাবধায়কদের কাছে হস্তান্তর করেন। নতুন হিজরি বছরের শুরুতে মসজিদুল হারামে কাবা শরিফে এ কিসওয়া প্রতিস্থাপন করা হবে।
আজ ১৫ জুন স্থানীয় সময় এশার নামাজের পরই পবিত্র কাবায় লাগানো হবে এই নতুন কিসওয়া বা গিলাফ। প্রতিবছর সারা বিশ্বের বিরাট সংখ্যক মুসলিম এই মুহূর্তটি খুব আবেগ আর ভালোবাসা নিয়ে অনলাইনে লাইভ ভিডিও দেখেন।
পবিত্র কাবার কিসওয়া তৈরির দায়িত্ব পালন করেছে কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্স ফর দ্য হোলি কাবা কিসওয়া। প্রতিবছর সৌদি আরবে সম্পাদিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ ইসলামি কারুশিল্প প্রকল্পগুলোর অন্যতম এটি।
নতুন কিসওয়ার উচ্চতা ১৪ মিটার। এটি উন্নতমানের কালো রঙে রঞ্জিত প্রাকৃতিক রেশম দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এর উপরের অংশে রয়েছে ৯৫ সেন্টিমিটার প্রশস্ত ও ৪৭ মিটার দীর্ঘ একটি অলঙ্কৃত বেল্ট, যেখানে ১৬টি সূচিকর্ম করা প্যানেলে পবিত্র কোরআনের আয়াত ও নান্দনিক ইসলামি নকশা খচিত হয়েছে।
কিসওয়া সংযোজন ও সেলাই বিভাগের প্রধান সালাহ আল-সুলামি জানিয়েছেন, কিসওয়া তৈরির কাজ শুরু হয় সাদা সুতির আস্তরণ প্রস্তুতের মাধ্যমে। এরপর সূচিকর্ম করা রেশমি অংশগুলো ধাপে ধাপে একত্র করে চূড়ান্ত গিলাফ প্রস্তুত করা হয়।
প্রতিটি রেশমি প্যানেলের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪ মিটার এবং প্রস্থ এক মিটার। এসব অংশ জোড়া লাগাতে ব্যবহৃত হয় অত্যাধুনিক বিশেষায়িত যন্ত্র, যাতে লেজার-নির্দেশিত প্রযুক্তি সংযোজিত রয়েছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ নির্ভুলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
কিসওয়া তৈরির প্রক্রিয়া মোট সাতটি ধাপে সম্পন্ন হয়। শুরুতে পানি বিশুদ্ধকরণ, এরপর রেশম ধোয়া ও রঙ করার কাজ করা হয়। বাইরের আবরণের জন্য ব্যবহৃত হয় কালো রেশম, আর ভেতরের আবরণ ও রওজা শরিফের জন্য ব্যবহৃত হয় সবুজ রেশম।
এরপর প্রতি মিটারে ৯ হাজার ৯০০-এরও বেশি সুতা সমন্বিত বিশেষ কাপড় বোনা হয়। সেই কাপড়ে স্থানান্তর করা হয় কোরআনের আয়াত ও অলঙ্করণমূলক নকশা। পরে বিশুদ্ধ রুপা এবং সোনার প্রলেপযুক্ত রুপার সুতা দিয়ে সূক্ষ্ম সূচিকর্ম করা হয়। কোরআনের আয়াতগুলোর নিচে বিশেষভাবে তুলা স্থাপন করা হয়, যাতে ক্যালিগ্রাফিগুলো উঁচু ও আরও দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে।
কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, একটি কিসওয়া তৈরিতে প্রায় ৮২৫ কিলোগ্রাম কাঁচা রেশম, ১২০ কিলোগ্রাম সোনার প্রলেপযুক্ত রুপার তার, ৬০ কিলোগ্রাম বিশুদ্ধ রুপা এবং ৪১০ কিলোগ্রাম কাঁচা তুলা ব্যবহার করা হয়।
কিসওয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর ক্যালিগ্রাফি। ২৪ ক্যারেট সোনার প্রলেপযুক্ত রুপার সুতা দিয়ে এতে পবিত্র কোরআনের আয়াত সূচিকর্ম করা হয়। এসব আয়াত লেখা হয় ‘সুলুস’ (থুলুথ) লিপিতে, যা ইসলামি স্থাপত্য, মসজিদ অলঙ্করণ ও শিল্পকলায় বহুল ব্যবহৃত এবং অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি আরবি ক্যালিগ্রাফি শৈলী।
এই অনন্য সূচিকর্ম, শৈল্পিক নকশা ও দৃষ্টিনন্দন ক্যালিগ্রাফিই কিসওয়াকে কাবা শরিফের সবচেয়ে পরিচিত ও বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।
কিসওয়ার শিল্প-ঐতিহ্য সংরক্ষণে যারা অসামান্য অবদান রেখেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার আবদুর রহিম আমিন বুখারি। ১৩৩৫ হিজরিতে মক্কায় জন্মগ্রহণকারী এই শিল্পী জীবনের তিন দশকের বেশি সময় পবিত্র কাবা-সংক্রান্ত কাজে উৎসর্গ করেন।
তিনি ২১টি কিসওয়া তৈরির কাজে অংশগ্রহণ করেন এবং কাবা শরিফের তিনটি দরজার ক্যালিগ্রাফি ও অলঙ্করণ তত্ত্বাবধান করেন। কাবার দরজার পর্দা ও পবিত্র স্থাপনাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অলঙ্করণমূলক নকশা তৈরিতেও তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এই অনন্য সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ বাদশাহ ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের শাসনামলে কিসওয়ার ওপর তার নাম লিপিবদ্ধ করা হয়।
নতুন কিসওয়া প্রস্তুতের এই সংবাদ মুসলিম বিশ্বের জন্য শুধু একটি আনুষ্ঠানিক খবর নয়; এটি এক গভীর আবেগের উপলক্ষ। কারণ কাবার দিকে মুখ করেই বিশ্বের প্রায় দুইশ কোটি মুসলমান প্রতিদিন নামাজ আদায় করেন, দোয়া করেন, ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং নিজেদের হৃদয়ের কথা মহান রবের কাছে নিবেদন করেন। সেই কাবাকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রতিটি ঐতিহ্য, প্রতিটি কারুকাজ এবং কিসওয়ার প্রতিটি সেলাই যেন বহন করে মুসলিম উম্মাহর ভালোবাসা, ভক্তি ও আত্মিক বন্ধনের ইতিহাস।
নতুন হিজরি বছরের সূচনায় যখন পবিত্র কাবা নতুন কিসওয়ায় আবৃত হবে, তখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে থাকা অসংখ্য মুসলমানের হৃদয়েও নতুন করে জেগে উঠবে বাইতুল্লাহর প্রতি আকর্ষণ, শ্রদ্ধা ও অশ্রুসজল ভালোবাসা। কালো রেশমের সেই গিলাফ তখন শুধু কাবার আবরণই হবে না; বরং তা হয়ে উঠবে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ঐতিহ্য ও আল্লাহর ঘরের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
সুত্র: সিয়াসত ডটকম




