কোরবানি ও আকিকা একসঙ্গে করার শরয়ী দৃষ্টিকোণ

প্রতীকী ছবি
ইসলামে ইবাদতের প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ সৌন্দর্য লক্ষ করা যায়। এখানে যেমন রয়েছে নির্দিষ্ট বিধান, তেমনি রয়েছে প্রয়োগের ক্ষেত্রে সহজ প্রশস্ততা। কোরবানি ও আকিকা এ দুটি ইবাদতও সেই একই নীতির অন্তর্ভুক্ত। উভয়টিই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু জবাইয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য, সময় ও প্রেক্ষাপট আলাদা। এ কারণেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে যে, একই পশু দ্বারা কি কোরবানি ও আকিকা একসঙ্গে আদায় করা বৈধ?
প্রথমেই বুঝতে হবে, কোরবানি ও আকিকা দুটিই ‘নুসুক’ বা আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত জবাই। পবিত্র কুরআনে ‘نُسُكِي’ শব্দের মাধ্যমে যে ইবাদতের কথা বলা হয়েছে, তাতে সব ধরনের কোরবানিমূলক জবাই অন্তর্ভুক্ত। হাদিসেও আকিকার ক্ষেত্রে ‘নুসুক’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, আকিকাও মূলত কোরবানির একটি ধরন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ وُلِدَ لَهُ وَلَدٌ فَأَحَبَّ أَنْ يَنْسُكَ عَنْهُ فَلْيَنْسُكْ عَنِ الْغُلَامِ شَاتَانِ مُكَافِئَتَانِ، وَعَنِ الْجَارِيَةِ شَاةٌ.
যার কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করে, সে যেন তার পক্ষ থেকে আকিকাহ করে। সে যেন ছেলের পক্ষ থেকে সমবয়স্ক দুটি বকরি এবং মেয়ের পক্ষ থেকে একটি বকরি জবাই করে। (আবু দাউদ, হাদিস : ২৮৪২)
সহিহ মুসলিমে সাহাবি জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে,
خرجنا مع رسول الله صلى الله عليه وسلم مهلين بالحج، فأمرنا رسول الله صلى الله عليه وسلم أن نشترك في الإبل والبقر، كل سبعة منا في بدنة.
‘আমরা হজের ইহরাম বেঁধে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে বের হলাম। তিনি আমাদের আদেশ করলেন যেন প্রতিটি উট ও গরুতে সাতজন করে শরিক হয়ে কোরবানি করি।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৩১৮/৩৫১)
এখানে শরিয়ত ‘একটি জবাই’কে একাধিক ইবাদতের জন্য যথেষ্ট বলে গণ্য করেছে, যদি নির্ধারিত শর্ত পূরণ হয়। এখান
থেকেই ফিকহবিদরা একটি মৌলিক নীতি নির্ধারণ করেছেন। উট বা গরুর ক্ষেত্রে ‘জবাইয়ে শরিক
হওয়া’ (شركة في الدم) একাধিক কোরবানির স্থলাভিষিক্ত হতে পারে।
এই মূলনীতির আলোকে অনেক আলেমের মত হলো, যখন আকিকাও ‘নুসুক’-এর অন্তর্ভুক্ত, তখন কোরবানির সঙ্গে আকিকাকে একত্রে আদায় করার অবকাশ রয়েছে। অর্থাৎ কেউ যদি একটি গরুতে শরিক হয়ে নিজের কোরবানির নিয়তের পাশাপাশি সন্তানের আকিকার নিয়তও করে, তবে উভয় ইবাদত আদায় হয়ে যাবে। এমন মত বহু ফকিহ গ্রহণ করেছেন।
তাবেঈ ইমাম ‘আতা ইবনে আবী রাবাহ (রহ.)-এর একটি মত এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন, একটি উট বা গরুতে কোরবানিকারী, হজের তামাত্তু পালনকারী এবং অন্য প্রয়োজনীয় কোরবানিদানকারী; এমন ভিন্ন ভিন্ন নিয়তের মানুষ একত্রে শরিক হতে পারে। এর দ্বারা বোঝা যায়, একই পশু বিভিন্ন ধরনের ‘নুসুক’-এর জন্য যথেষ্ট হতে পারে, যদি প্রত্যেকের নিয়ত স্বতন্ত্র থাকে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি যে, ইসলাম কখনোই মানুষকে কষ্টে ফেলতে চায় না। বরং সক্ষমতা ও বাস্তবতার আলোকে ইবাদতের ক্ষেত্রেও সহজতার পথ উন্মুক্ত রাখে। যারা আর্থিক বা পারিবারিক কারণে আলাদা আলাদা পশু জবাই করতে অক্ষম, তাদের জন্য এই মতটি একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে।
তবে সামর্থ্য থাকলে কোরবানি ও আকিকা পৃথকভাবে আদায় করাই অধিক উত্তম ও নিরাপদ। কারণ এতে উভয় ইবাদতের স্বাতন্ত্র্য ও পূর্ণতা বজায় থাকে। আর যদি একত্রে আদায় করা হয়, তাহলে তাও শরিয়তের একটি অনুমোদিত বিধানের মধ্যেই পড়ে।
মোট কথা, কোরবানি ও আকিকা একত্রে করা নিষিদ্ধ নয়; বরং এটি একটি গ্রহণযোগ্য ইজতিহাদী মতের ভিত্তিতে বৈধ। তবে উত্তম হলো আলাদাভাবে আদায় করা। এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই ইসলামের সৌন্দর্য; যেখানে কঠোরতা নয়, বরং জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বাস্তবতার সমন্বয়ে ইবাদতের পথ সুগম করা হয়েছে।
লেখক: শিক্ষার্থী, এন. আকন্দ কামিল মাদ্রাসা, নেত্রকোনা।



