কোরআনের বাণী
যেদিন সকল মিথ্যার মুখোশ উন্মোচিত হবে

প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : নূর, আয়াত : ২৫
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
یَوۡمَئِذٍ یُّوَفِّیۡهِمُ اللّٰهُ دِیۡنَهُمُ الۡحَقَّ وَ یَعۡلَمُوۡنَ اَنَّ اللّٰهَ هُوَ الۡحَقُّ الۡمُبِیۡنُ
২৫. সেদিন আল্লাহ তাদের হক্ক তথা প্রাপ্য প্রতিফল পুরোপুরি দেবেন এবং তারা জেনে নেবে যে, আল্লাহই সুস্পষ্ট সত্য।
এই আয়াতটি মূলত সেইসব মানুষদের প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে, যারা মুমিনদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ, অপপ্রচার ও অন্যায় আচরণ করেছিল। বিশেষ করে আয়েশা (রা.)-কে কেন্দ্র করে যে ভয়াবহ অপবাদ ছড়ানো হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে সুরা নূরের বেশ কয়েকটি আয়াত নাজিল হয়। এখানে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিচ্ছেন, দুনিয়ায় কেউ হয়তো মিথ্যাকে সত্যের রূপ দিতে পারে, প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে, কিন্তু আখিরাতের দিন কোনো কিছুই গোপন থাকবে না। সেদিন প্রত্যেকে তার কাজের যথাযথ প্রতিফল পাবে।
আয়াতে উল্লেখিত “يُوَفِّيهِمُ” শব্দের অর্থ হলো পূর্ণরূপে পরিশোধ করা। অর্থাৎ আল্লাহ কাউকে সামান্যও কম দেবেন না। ভালো কাজের পূর্ণ প্রতিদান যেমন দেওয়া হবে, তেমনি অন্যায়, অপবাদ, জুলুম ও পাপেরও নির্ভুল বিচার হবে। পৃথিবীর আদালতে প্রমাণের অভাব, ক্ষমতার প্রভাব কিংবা মানুষের দুর্বলতার কারণে অনেক সময় ন্যায়বিচার সম্ভব হয় না। কিন্তু আল্লাহর আদালতে কোনো অন্যায় হবে না।
তাফসিরে ইবনে কাসিরে বলা হয়েছে, এই আয়াতের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করবে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি, বিচার ও সতর্কবার্তা সবই সত্য ছিল। দুনিয়ায় অনেকে আল্লাহর বিধান নিয়ে সন্দেহ করে, গুনাহকে হালকা মনে করে কিংবা মনে করে অন্যায় করেও পার পাওয়া যাবে। কিন্তু আখিরাতে বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে যাবে।
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَيَعْلَمُونَ أَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ الْمُبِينُ
‘তারা জেনে নেবে যে, আল্লাহই সুস্পষ্ট সত্য।”
এখানে “الْحَقُّ الْمُبِينُ” অর্থ এমন সত্য, যা একেবারে প্রকাশ্য ও সন্দেহাতীত। অর্থাৎ সেদিন আর কারো কাছে কোনো বিভ্রান্তি থাকবে না। মানুষ বুঝতে পারবে, আল্লাহর অস্তিত্ব সত্য, তার বিচার সত্য, জান্নাত-জাহান্নাম সত্য এবং কুরআনের প্রতিটি সতর্কবার্তা সত্য ছিল।
ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেছেন, এই আয়াত মানুষকে দুটি বড় শিক্ষা দেয়। প্রথমত, কোনো অন্যায় বা অপবাদকে তুচ্ছ মনে করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, দুনিয়ায় বিচার না পেলেও মুমিনের হতাশ হওয়ার কারণ নেই। কারণ আল্লাহর কাছে প্রতিটি হিসাব সংরক্ষিত আছে।
বর্তমান সমাজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গুজব, চরিত্রহনন ও মিথ্যা অপবাদের বিস্তার এই আয়াতকে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। অনেক সময় একজন নির্দোষ মানুষকে পরিকল্পিতভাবে হেয় করা হয়, অথচ প্রকৃত সত্য গোপন থাকে। এই আয়াত মুমিনকে স্মরণ করিয়ে দেয়, শেষ বিচারের দিন সব সত্য প্রকাশিত হবে এবং আল্লাহ ন্যায়বিচার করবেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের
দিন অবশ্যই প্রত্যেক হকদারের হক আদায় করা হবে।’
( মুসলিম, হাদিস
: ২৫৮২)
অতএব, এই আয়াত শুধু আখিরাতের ভয়াবহ বিচার দিনের বর্ণনা নয়; এটি সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসের এক গভীর শিক্ষা। মুমিনের দায়িত্ব হলো মানুষের সম্মান রক্ষা করা, অপবাদ থেকে বেঁচে থাকা এবং এই বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহর আদালতে কোনো সত্য হারিয়ে যায় না।


