হজের সফরে ভুলভ্রান্তি
যেসব ভুলে অপূর্ণ থেকে যায় বহু সাধনার হজ (৫ম পর্ব)

সংগৃহীত ছবি
হজ এমন এক অনন্য ইবাদত, যার নিয়ত করার মুহূর্তেই বান্দা আল্লাহতায়ালার কাছে সহজতা ও কবুলিয়তের জন্য দোয়া করে। এ থেকেই বোঝা যায়, অন্যান্য ইবাদতের তুলনায় হজের আমল কতটা পরিশ্রমসাধ্য ও জটিল। তাই হজ আদায়ের জন্য শুধু মাসয়ালা জানা যথেষ্ট নয়; বরং এর সঠিক পদ্ধতি, সময়োপযোগী কৌশল এবং অভিজ্ঞদের পরামর্শও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তবে দেখা যায়, হজে অনেক ভুল হয় জ্ঞানের অভাবে নয়; বরং অবহেলা ও অসচেতনতার কারণে। অথচ সামান্য সতর্কতা ও প্রস্তুতি নিলে এসব ভুল সহজেই এড়িয়ে চলা সম্ভব। এজন্য নিচে হজ পালনের সময় সাধারণত যে ভুলগুলো হয়ে থাকে, সেগুলো আমরা একে একে ধারাবাহিকভাবে আগামীর সময়ের পাতায় পাঠকদের সামনে তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ, যাতে হজ যাত্রীরা সচেতন থেকে সঠিকভাবে হজ আদায় করতে পারেন।
আজ আমরা তুলে ধরব—
হজের ইহরামের স্থান নিয়ে বিভ্রান্তি
মসজিদুল হারামে অবস্থানকারীর অনেকে সেখানে গিয়ে হজের ইহরাম করাকে জরুরি মনে করেন। অথচ সেখানে ইহরাম বাঁধা জরুরি নয়, উত্তম। হজের ইহরাম হোটেল বা অবস্থানের জায়গায়ও করা যাবে। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, হাদিস: ১৫৯৩১, ১৫৯৩৩; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ১৮৭; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ.২১৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৩৯; রদ্দুল মুহতার ২/৪৭৮)
মিনার দ্বন্দ্ব-কলহ
মূলত ‘মিনা’ থেকে যেহেতু হজের কাজ শুরু হয়; তাই শয়তান সুযোগে থাকে যে হজের শুরুতেই এমন কাজ করিয়ে নেবে, যার দ্বারা হজের প্রাণ নষ্ট হয়ে যায়। যেমন, মিনায় অবস্থানের জায়গা নিয়ে হাজিদের মধ্যে ঝগড়া এবং গালাগাল পর্যন্ত হতে দেখা যায়। ওই মাঠেও কি আরামে শোয়ার জন্য ঝগড়া করতে হবে? উচিত তো নিজেদের বিছানা তাঁবুর বাইরে রেখে অন্য ভাইদেরে ভালোভাবে জায়গা করে দেওয়া। সৌদির অনেক হাজি রাস্তাতেই মিনার দিনগুলো অতিবাহিত করে দেন। আর আমরা সেখানে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হই। অথচ পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, তাঁবুর ভেতরই সবার ভালোভাবে জায়গা হয়ে যায়। পবিত্র কোরআনে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এসেছে। ইরশাদ হয়েছে— ‘হজের সময় কোনো ঝগড়া-বিবাদের অবকাশ নেই।’ তাই এ ব্যাপারে খুব সাবধান থাকা উচিত। (সহিহ বুখারি ১/২৪৫; মানাসিক ১১৭; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ৮৫; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/১১২; আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৮৭)
তালবিয়া পড়া সংক্রান্ত ভ্রান্তি
মিনা, আরাফাহ ও মুযদালিফায় মানুষ দলে দলে চলতে থাকে, অবস্থান করতে থাকে। কিন্তু খুব কম মানুষকেই সশব্দে তালবিয়া পড়তে শোনা যায়। অথচ ইহরাম বাঁধার পর থেকে ১০ তারিখ পাথর মারার আগ পর্যন্ত সশব্দে তালবিয়া পড়া গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। এ সময় অন্যান্য যিকিরের চেয়ে এটিই অধিক পরিমাণে করতে বলা হয়েছে। আর সশব্দে পড়লেও এক-দুবার পড়ে থেমে যায়। অথচ তালবিয়া যখন পড়বে, তখন একত্রে তিনবার পড়া মু্স্তাহাব। (সহিহ মুসলিম ১/৪১৫; মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদিস ১৪১৭৮; মানাসিক মোল্লা আলী কারি পৃ. ১০৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৩, ১/২৩৫; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/১০১; আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৯১, ২/৪৮৩-৪৮৪)
মসজিদে নামিরার মেহরাবে ও তার পাশে অবস্থান করা
মসজিদে নামিরার মেহরাবসহ সামনের কিছু অংশ ‘উকুফের’ জায়গা নয়। কিন্তু অনেক হাজিকে আরাফার পুরো সময়ই সেখানে অবস্থান করতে দেখা যায়। আবার অনেক হাজি আরাফার বাইরেও অবস্থান করে থাকেন। অথচ আরাফায় অবস্থান করা ফরজ। এটি ছাড়া হজ আদায় হবে না। তাই এ ব্যাপারে সচেতন থাকা জরুরি। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, হাদিস : ১৪০৬৩, ১৪০৬৮; মানাসিক ২০৪; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৫৭; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫০৬)
সূর্যাস্তের আগে আরাফার ময়দান ত্যাগ করা
সূর্যাস্তের আগে আরাফার ময়দান ত্যাগ করা নাজায়েজ। সৌদি সরকারের পক্ষ থেকেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যেন বাসগুলো সূর্য ডোবার আগে না ছাড়ে। কিন্তু বহু লোক সূর্য ডোবার অনেক আগেই মুযদালিফার দিকে রওনা হয়ে যান। এটি মারাত্মক ভুল। মনে রাখতে হবে, সূর্যাস্তের আগে আরাফার ময়দান ত্যাগ করলে দম ওয়াজিব হয়ে যায়। সূর্য ডোবার আগেই যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে অনেককে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। অথচ ওই সময় তাসবিহ, দোয়া ও মোনাজাতের মূল সময়। আর এ সময়টি অনেকেরই বড় উদাসীনতায় কাটে, যা মোটেও কাম্য নয়। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, হাদিস ১৫৪১৯; মানাসিক মোল্লা আলী কারি পৃ. ২১০; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ১৫৯; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫০৮)
উৎস : আল-কাউসার, নভেম্বর ২০০৯ সংখ্যায় প্রকাশিত মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রচিত হজবিষয়ক ভুলভ্রান্তি প্রবন্ধ

