হজ কবুল হয়েছে বুঝবেন যেভাবে
- কবুল হজের আলামত কী
- কবুল হজ মানুষকে যেমন করে

প্রতীকী ছবি
লাখো মানুষের সাদা ইহরামে ঢেকে যায় আরাফার ময়দান। ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে কেঁপে ওঠে মক্কার আকাশ। কেউ অশ্রুসিক্ত চোখে কাবাঘর জড়িয়ে ধরেন, কেউ মিনায় বসে জীবনের গুনাহ স্মরণ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। হজ শেষ হয়, মানুষ দেশে ফেরে; কিন্তু একটি প্রশ্ন তখনও হৃদয়ে ঘুরপাক খেতে থাকে; আমার হজ কি কবুল হয়েছে?
এই প্রশ্ন নতুন নয়। সাহাবি, তাবিয়ি ও বুযুর্গদের জীবনেও এ উদ্বেগ ছিল প্রবল। কারণ ইসলামে আমলের বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতাই আসল বিষয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের আমলই কবুল করেন।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ২৭)
তাই প্রকৃত হাজি তিনি নন, যিনি শুধু মক্কা সফর করে ফিরেছেন; বরং তিনি, যার জীবন হজের পর বদলে গেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করল এবং অশ্লীলতা ও গুনাহ থেকে বিরত থাকল, সে এমন নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে, যেমন সেদিন ছিল যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল।’ (বুখারি, হাদিস : ১৫২১; মুসলিম, হাদিস : ১৩৫০)
এই হাদিসে কবুল হজের পুরস্কার বলা হয়েছে গুনাহমুক্ত নতুন জীবন। তাই আলেমরা বলেন, কবুল হজের সবচেয়ে বড় আলামত হলো মানুষের জীবনে নেক পরিবর্তন আসা।
হাসান বসরি (রহ.)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কবুল হজের চিহ্ন কী? তিনি বললেন, ‘হজের পর মানুষ দুনিয়ামুখিতা ছেড়ে আখিরাতমুখী হয়ে যায়।’ (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ইমাম গাজালি) অর্থাৎ একজন হাজির অন্তরে দুনিয়ার মোহ কমতে থাকে, আল্লাহর ভয় ও আখিরাতের চিন্তা বাড়তে থাকে। আগে যে ব্যক্তি নামাজে অলস ছিলেন, তিনি নামাজের প্রতি যত্নবান হন। আগে হারাম উপার্জনে দ্বিধাহীন ছিলেন, এখন হালাল-হারামের হিসাব করতে শুরু করেন। আগে মানুষের হক নষ্ট করতেন, এখন মানুষের কাছে ক্ষমা চাইতে শেখেন। এই পরিবর্তনই কবুল হজের জীবন্ত আলামত।
কবুল হজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হলো গুনাহ থেকে দূরে থাকা। অনেক মানুষ হজ শেষে ফিরে এসে আবার আগের জীবনে ডুবে যান। অথচ হজ মানুষকে নতুন জীবন শুরু করার শিক্ষা দেয়। কাবার সামনে দাঁড়িয়ে যে মানুষ কেঁদেছেন, আরাফায় হাত তুলে যে ব্যক্তি ক্ষমা চেয়েছেন, তার জীবনে সেই কান্নার প্রভাব দেখা যাওয়ার কথা।
ইমাম নববি (রহ.) বলেছেন, ‘নেক আমলের কবুল হওয়ার অন্যতম আলামত হলো, তার পর আরও নেক আমলের তাওফিক পাওয়া।’ (শরহু সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ কবুল হজ মানুষকে আরও ইবাদতমুখী করে তোলে। নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, জিকির ও নফল আমলের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। মানুষের চরিত্র কোমল হয়। অহংকার কমে যায়। কারণ হজ মানুষকে শেখায়, ইহরামের সাদা কাপড়ের ভেতর রাজা-গরিবের কোনো পার্থক্য নেই।
কবুল হজের আরেকটি আলামত হলো বিনয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সমাজে কখনো কখনো ‘হাজি’ পরিচয় মর্যাদা বা সামাজিক প্রভাবের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। অথচ প্রকৃত হজ মানুষকে বিনম্র করে। সে বুঝতে শেখে, আল্লাহর সামনে সবাই অসহায় বান্দা। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আর রহমানের বান্দা তারা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৩)
হজের আরেকটি শিক্ষা হলো মানুষের হক আদায় করা। শুধু কাবা তাওয়াফ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। পরিবারের সঙ্গে আচরণ, ব্যবসায় সততা, প্রতিবেশীর অধিকার, মানুষের প্রতি দয়া; এসবও একজন হাজির জীবনে ফুটে ওঠার কথা। কারণ ইসলাম কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতের ধর্ম নয়; বরং চরিত্র ও মানবিকতারও শিক্ষা দেয়।
ইসলামিক স্কলাররা বলেছেন, কবুল হজের একটি সূক্ষ্ম আলামত হলো অন্তরের পরিবর্তন। আগে মানুষ গুনাহ করে আনন্দ পেত, এখন গুনাহে কষ্ট অনুভব করে। আগে দুনিয়ার প্রশংসা চাইত, এখন আল্লাহর সন্তুষ্টিকে বড় মনে হয়। আগে মানুষের চোখে বড় হতে চাইত, এখন আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার চিন্তা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে।
তবে কার হজ কবুল হয়েছে, তার চূড়ান্ত ফয়সালা একমাত্র আল্লাহর কাছেই। মানুষ বাহ্যিক আমল দেখে, কিন্তু আল্লাহ দেখেন অন্তর, নিয়ত ও তাকওয়া। এজন্য বুযুর্গরা হজ শেষে অহংকার নয়, বরং ভয় ও আশা নিয়ে জীবন কাটাতেন। তারা ভাবতেন, ‘আমি হজ করেছি’ এই গর্বে নয়; বরং ‘আল্লাহ কি আমার হজ কবুল করেছেন?’ এই চিন্তায় উদ্বিগ্ন হতেন।
হজ শেষ হয়েছে, হাজিরা ফিরছেন ঘরে। কিন্তু প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কাবাঘর থেকে ফিরে মানুষের হৃদয়ে কি নতুন কাবা নির্মিত হয়েছে? যদি হজ মানুষকে আল্লাহমুখী করে, গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনে, চরিত্রে বিনয় সৃষ্টি করে এবং আখিরাতের পথে দৃঢ় করে, তবে সেটিই কবুল হজের সবচেয়ে বড় আলামত।
লেখক: শিক্ষার্থী, এনআকন্দ কামিল মাদরাসা, নেত্রকোনা।






