অনলাইন-অফলাইন বন্ধু নির্বাচনের ইসলামী নীতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মানুষ স্বভাবগতভাবেই সঙ্গপ্রিয়। জীবনের সুখ-দুঃখ, চিন্তা-চেতনা ও স্বপ্ন ভাগাভাগি করার জন্য একজন ভালো বন্ধুর বিকল্প নেই। কিন্তু ইসলাম বন্ধুত্বকে কেবল সামাজিক সম্পর্ক হিসেবে না দেখে এটিকে মানুষের ঈমান, চরিত্র ও পরিণতির সঙ্গে গভীর সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছে। তাই কাকে বন্ধু বানানো হবে, সে বিষয়ে ইসলাম অত্যন্ত সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘সেদিন (কিয়ামতের দিন) বন্ধুরা একে অপরের শত্রু হয়ে যাবে, তবে মুত্তাকিরা ব্যতীত।’ (সুরা যুখরুফ, আয়াত : ৬৭) অর্থাৎ আল্লাহভীতি ও নেক আমলের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বই আখিরাতে কল্যাণ বয়ে আনবে। পক্ষান্তরে স্বার্থ, ভোগ-বিলাস কিংবা পাপাচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত বন্ধুত্ব শেষ পর্যন্ত অনুতাপের কারণ হবে।
এ প্রসঙ্গে অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর সেদিন জালিম ব্যক্তি নিজ হাত কামড়াতে থাকবে এবং বলবে, হায়! আমি যদি রাসুলের পথ অনুসরণ করতাম। হায় দুর্ভোগ আমার! আমি যদি অমুককে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করতাম।’ (সুরা আল-ফুরকান, আয়াত : ২৭-২৯) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বিখ্যাত মুফাসসির ইবনে কাসির (রহ.) বলেছেন, এই আয়াত শুধু একটি নির্দিষ্ট ঘটনার বর্ণনা নয়; বরং প্রত্যেক যুগের মানুষের জন্য সতর্কবার্তা যে, বিপথগামী বন্ধুত্ব মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে।
বন্ধুর প্রভাব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর রীতিনীতির (দ্বীন ধর্মের) অনুসারী হয়। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকেই যেন লক্ষ্য করে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৩; তিরমিজি, হাদিস: ২৩৭৮) অর্থাৎ মানুষের চিন্তা, আচার-আচরণ ও মূল্যবোধ অনেকাংশে তার ঘনিষ্ঠ সঙ্গীদের মাধ্যমে গড়ে ওঠে।
সৎ ও অসৎ বন্ধুর পার্থক্য বোঝাতে নবী (সা.) একটি চমৎকার উপমা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো আতর বিক্রেতা এবং কামারের হাপরের মতো। আতর বিক্রেতার কাছ থেকে হয় তুমি সুগন্ধি কিনবে, না হয় অন্তত তার সুগন্ধ পাবে। আর কামারের হাপর হয় তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, না হয় তার দুর্গন্ধ তোমাকে কষ্ট দেবে।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৫৩৪) এই হাদিসের শিক্ষা হলো, সৎ মানুষের সান্নিধ্যে থাকলে মানুষ কোনো না কোনোভাবে উপকৃত হয়, আর অসৎ সঙ্গ ধীরে ধীরে তাকে বিপথে নিয়ে যায়।
ইসলাম এমন বন্ধুত্বকে উৎসাহিত করে, যা মানুষকে নেক কাজের দিকে আহ্বান জানায়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা নেক কাজ ও তাকওয়ার ব্যাপারে একে অপরকে সহযোগিতা করো; পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত : ২) প্রকৃত বন্ধু সেই, যে ভুল করলে সংশোধন করে, ইবাদতে উৎসাহ দেয়, বিপদে পাশে দাঁড়ায় এবং আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে।
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গড়ে ওঠা বন্ধুত্বের মর্যাদাও ইসলামে অনেক উঁচু। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের ছায়া লাভ করবে। তাদের মধ্যে রয়েছে এমন দুই ব্যক্তি, যারা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একে অপরকে ভালোবাসে, সেই ভালোবাসার কারণেই মিলিত হয় এবং বিচ্ছিন্ন হয়। (বুখারি, হাদিস: ৬৬০; মুসলিম, হাদিস: ১০৩১)
অনলাইন বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও ইসলামের নীতিমালা একই। পরিচয় গোপন রেখে প্রতারণা, অশালীনতা ছড়ানো, গিবত-অপবাদে অংশ নেওয়া কিংবা পাপাচারে উৎসাহিত করে এমন ব্যক্তিদের সঙ্গ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নেবে।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ৬) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রেও এ নির্দেশনা সমানভাবে প্রযোজ্য। পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘তোমরা যে বিষয়ে নিশ্চিত জ্ঞান রাখো না, তার অনুসরণ করো না।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ৩৬) তাই অনলাইনে কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণের আগে তার চরিত্র, চিন্তাধারা ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন হওয়া একজন মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব। এমন ব্যক্তিদের সঙ্গেই সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত, যাদের মাধ্যমে দ্বীন, জ্ঞান ও উত্তম চরিত্রের চর্চা বৃদ্ধি পায়; বিভ্রান্তি, অশ্লীলতা বা গুনাহের প্রসার নয়।
মনে রাখতে হবে বন্ধুত্ব মানুষের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। একজন সৎ বন্ধু যেমন ঈমান, নৈতিকতা ও উত্তম চরিত্র গঠনে সহায়তা করে, তেমনি অসৎ বন্ধু মানুষকে গুনাহ ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই একজন মুসলমানের উচিত এমন বন্ধু নির্বাচন করা, যার সান্নিধ্যে আল্লাহর স্মরণ বৃদ্ধি পায়, নেক আমলের আগ্রহ জন্মায় এবং দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনের কল্যাণ নিশ্চিত হয়।




