কেবল ধানের শীষ নয়, ন্যাপ-বিএনপির আছে আরও ঐতিহাসিক সংযোগ

ছবি: আগামীর সময়
সাম্প্রতিক সময়ে ‘ধানের শীষ' প্রতীক নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টাঙ্গাইলের এক জনসভায় বক্তব্য দিয়েছেন, তার দলের এই প্রতীক নিয়ে। এটি ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, বিএনপির দলীয় এই প্রতীকটি ছিল মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর দল ন্যাপের। যা পরবর্তীতে বিএনপির প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। তবে কেবল প্রতীকই নয়, ভাসানীর ন্যাপের সঙ্গে বিএনপির আছে আরও ঐতিহাসিক সংযোগ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ছিল এক অনন্য গণভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি। কৃষক-শ্রমিক নির্ভর এই দলটি স্বাধীনতার আগে ও পরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও স্বাধীনতার পরবর্তী বাস্তবতায় তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত এর একটি অংশ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে মিশে যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই রূপান্তর হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভাঙন, নেতৃত্ব সংকট এবং নতুন ক্ষমতার সমীকরণের ফল।
প্রখ্যাত চিন্তাবিদ বদরুদ্দীন উমর তার ‘বাংলাদেশের রাজনীতি (১৯৪৭—১৯৭৫)’ গ্রন্থে লিখেছেন,
‘ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপ ছিল মূলত কৃষক-শ্রমিকভিত্তিক এক গণআন্দোলনের বাহন, যা স্বাধীনতার পর সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে ব্যর্থ হয়।’
একই গ্রন্থে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘স্বাধীনতার পর বামপন্থি শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজন ও নেতৃত্ব সংকট তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমশ হ্রাস করে।’
এই পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায়, স্বাধীনতার পর ন্যাপের ভাঙন ও দুর্বলতা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের পথ তৈরি করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক তালুকদার মনিরুজ্জামান তার ‘রেডিক্যাল পলিটিক্স অ্যান্ড দ্যা ইমারজেন্স অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপ একটি গণমুখী ও র্যাডিক্যাল ধারার প্রতিনিধিত্ব করলেও, সংগঠনগত দুর্বলতা তার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাবকে সীমিত করে দেয়।’
১৯৭৫ সালের পরবর্তী সময়কে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ প্রসঙ্গে কূটনীতিক ও লেখক এস এ করিম তার ‘শেখ মুজিব : ট্রায়াম্ফ অ্যান্ড ট্রাজেডি’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নাটকীয় পরিবর্তন আসে, যা নতুন জোট ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সুযোগ তৈরি করে।’
এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন।
অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল্লাহ তার ‘বাংলাদেশ পলিটিক্স: দ্যা ডিলেমা অব ইউক স্টেটস’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘জিয়াউর রহমান একটি বিস্তৃত জাতীয়তাবাদী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে বিভিন্ন রাজনৈতিক উপাদানকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেন, যার মধ্যে বামঘেঁষা গোষ্ঠীও ছিল।’
এই অন্তর্ভুক্তির রাজনীতির ফলেই ন্যাপ (ভাসানী)-এর একটি অংশ বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহচর মশিউর রহমান (যাদু মিয়া)। বিভিন্ন রাজনৈতিক স্মৃতিচারণ ও প্রবন্ধে তার সম্পর্কে বলা হয়েছে— যাদু মিয়া ছিলেন ভাসানীর উত্তরসূরিদের মধ্যে অন্যতম বাস্তববাদী নেতা, যিনি পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন সমীকরণের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেন।
ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ পাওয়া যায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের একটি গ্রন্থে। তিনি লিখেছেন, ‘ভাসানীর রাজনীতি মূলত কৃষকসমাজ ও প্রথাগত শাসনব্যবস্থা বিরোধী মনোভাবের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।’
এই প্রথাগত শাসনব্যবস্থা বিরোধী ও গণভিত্তিক রাজনীতির কিছু উপাদান পরবর্তীতে জিয়ার জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে আংশিকভাবে মিল খুঁজে পায় বলে অনেকে মনে করেন।
ন্যাপ (ভাসানী) থেকে বিএনপিতে উত্তরাধিকার স্থানান্তরের একটি দৃশ্যমান প্রতীক হলো ‘ধানের শীষ’। ন্যাপের এই প্রতীকটি নেয় বিএনপি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হয়, ধানের শীষ প্রতীক নেওয়ার মাধ্যমে বিএনপি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং একটি পরিচিত রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধারণের চেষ্টা করে।
রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, ন্যাপ (ভাসানী) থেকে বিএনপিতে অন্তর্ভুক্তি ছিল কোনো একদিনের সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক বিবর্তনের ফল। নেতৃত্বের পরিবর্তন, সংগঠনগত দুর্বলতা এবং নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রের উত্থান—সবকিছু মিলিয়ে সম্পন্ন হয় এই পুনর্বিন্যাস। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন ভাসানীর রাজনৈতিক ঐতিহ্যের একটি অংশ টিকে থাকে, অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ধারা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় বিএনপি।

