এক মাখোঁ, এক দশকে বদলে যাওয়া ফ্রান্স

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। ছবি: সংগৃহীত
২০১৭ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ইউরোপের রাজনীতিতে বড় চমক তৈরি করেছিলেন এমানুয়েল মাখোঁ। ২০২২ সালে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর শিল্প, পারমাণবিক জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে ফ্রান্সকে আরও শক্তিশালী ও কৌশলগতভাবে স্বাধীন করার চেষ্টা করেছেন তিনি। তবে অর্থনৈতিক সংস্কার, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং পেনশন সংস্কার নিয়ে দেশটির ভেতরে তীব্র বিরোধিতার মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে।
মাখোঁর দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট মেয়াদ ২০২৭ সালে শেষ হবে। ফরাসি সংবিধান অনুযায়ী, পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট থাকা যায় না। ফলে আগামী প্রেসিডেন্টের হাতে যাবে দেশের নেতৃত্ব। তবে গত এক দশকে মাখোঁ যে শিল্পনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও ইউরোপীয় নেতৃত্বের ধারণা সামনে এনেছেন, তার অনেকটাই পরবর্তী সরকারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
২০১৬ সালে নিজের রাজনৈতিক আন্দোলন ‘এন মার্চ’ গড়ে তোলার পরের বছরই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন মাখোঁ। প্রতিষ্ঠিত কোনো রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকারী ছিলেন না তিনি। দীর্ঘদিনের কোনো রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাও ছিলেন না। ২০২২ সালে দ্বিতীয়বার ফরাসি জনগণের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।
উত্তর ফ্রান্সের অ্যামিয়াঁ শহরে জন্ম নেওয়া মাখোঁ পড়াশোনা করেন দর্শন নিয়ে। পরে ফ্রান্সের মর্যাদাপূর্ণ প্রশাসনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এনা’য়। সরকারি অর্থ পরিদর্শন দপ্তরে কাজ করার পর যোগ দেন বিনিয়োগ ব্যাংকিংয়ে। এরপর প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদের দপ্তরে পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ২০১৪ সালে দায়িত্ব নেন অর্থনীতি, শিল্প ও ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রীর। রাষ্ট্র, প্রশাসন ও অর্থনীতির কাঠামো কাছ থেকে দেখার এই অভিজ্ঞতার ছাপ পরে তার প্রেসিডেন্টের নীতিতেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রেসিডেন্টসহ দুই কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
১৯ আগস্ট ২০২৬
ক্ষমতায় এসে মাখোঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল ফ্রান্সকে বিনিয়োগের জন্য আরও আকর্ষণীয় করে তোলা। বিদেশি বিনিয়োগ আনতে তিনি ‘শুজ ফ্রান্স’ কর্মসূচি শুরু করেন। বিশ্বের বড় কোম্পানিগুলোর প্রধানদের ফ্রান্সে আমন্ত্রণ জানিয়ে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হয়। এর সবচেয়ে আলোচিত আয়োজনগুলোর একটি ছিল ভার্সাই প্রাসাদে অনুষ্ঠিত বিনিয়োগ সম্মেলন। ফ্রান্সের রাজকীয় ইতিহাসের প্রতীক এই প্রাসাদেই ভবিষ্যতের শিল্প, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
২০২৬ সালের ‘শুজ ফ্রান্স’ সম্মেলনে ৭১টি নতুন বিনিয়োগ প্রকল্পের ঘোষণা আসে। ফরাসি সরকারের হিসাবে, এসব প্রকল্পের মোট মূল্য ৯৩ বিলিয়ন ইউরো এবং এর মাধ্যমে ১৫ হাজার ৬০০টির বেশি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি মাখোঁ ফ্রান্সের নিজস্ব শিল্পভিত্তি শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। গাড়ি, বিমান, ব্যাটারি, অর্ধপরিবাহী, মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা হয়েছে। তার অর্থনৈতিক দর্শনে শিল্প শুধু প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের উৎস নয়, দেশের কৌশলগত শক্তিরও অংশ।
এই চিন্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ফ্রান্সের পারমাণবিক বিদ্যুৎ। দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তির ভূমিকা অনেক বড়। ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে পারমাণবিক শক্তিকে আরও গুরুত্ব দেন মাখোঁ। তার দৃষ্টিতে এটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস নয়, শিল্পের প্রতিযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও দেশের কৌশলগত স্বাধীনতার সঙ্গেও সরাসরি জড়িত।
ফ্রান্সের পারমাণবিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে এগিয়েছে নতুন শিল্প স্থাপন এবং বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে থাকা অর্থনীতিকে সামলানোর পরিকল্পনাও। একই সঙ্গে পুরোনো পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর আধুনিকায়ন ও নতুন চুল্লি নির্মাণ নিয়ে নেওয়া হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
মাখোঁর রাজনীতির আরেকটি বড় স্তম্ভ ইউরোপের নিরাপত্তা। রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো মুখোমুখি হয় নতুন বাস্তবতার। এর আগেই মাখোঁ বলে আসছিলেন, ইউরোপকে নিজের প্রতিরক্ষার জন্য আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। যুদ্ধের পর তার সেই অবস্থান আরও জোরালো হয়।
ফ্রান্সের পারমাণবিক অস্ত্র, শক্তিশালী সেনাবাহিনী, উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ রয়েছে। এসব সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপের নিরাপত্তা আলোচনায় ফ্রান্সের নেতৃত্ব আরও দৃশ্যমান করতে চেয়েছেন মাখোঁ।
তার কৌশলগত স্বাধীনতার ধারণার মূল কথাও এখানেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে মিত্রতা থাকবে, ন্যাটোর গুরুত্ব থাকবে, কিন্তু ইউরোপকে নিজের প্রতিরক্ষা শিল্প, সামরিক সক্ষমতা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে আরও শক্তিশালী হতে হবে।
বিশ্ব রাজনীতিতেও ফ্রান্সের নিজস্ব কণ্ঠকে সামনে রাখার চেষ্টা করেছেন মাখোঁ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও চীন, ভারত, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। ফ্রান্স যেন শুধু ইউরোপের অংশ হিসেবে নয়, নিজস্ব সামর্থ্য নিয়ে বিশ্ব রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উপস্থিত থাকে, সেটিই ছিল তার কূটনীতির বড় লক্ষ্য।
ফ্রান্সের ঐতিহাসিক অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দেশটির দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। আফ্রিকায় ঐতিহাসিক প্রভাব, ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ফরাসি ভূখণ্ড ও নিরাপত্তা স্বার্থ, জাতিসংঘে স্থায়ী আসন এবং পারমাণবিক শক্তি, সব মিলিয়ে ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক অবস্থান অন্য অনেক ইউরোপীয় দেশের চেয়ে আলাদা। মাখোঁ এই অবস্থানকে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
তবে তার প্রেসিডেন্সির গল্প শুধু অর্থনীতি, শিল্প ও পররাষ্ট্রনীতির নয়। দেশের ভেতরেও তাকে কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
২০১৮ সালে শুরু হওয়া ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন ছিল তার জন্য বড় পরীক্ষা। জ্বালানির দাম নিয়ে শুরু হওয়া ক্ষোভ দ্রুত জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনে পরিণত হয়। ফরাসি রাজনীতিতে এই আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়, অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাপও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রাখতে হয়।
পেনশন সংস্কার ছিল আরও বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৩ সালে আইনগত অবসরের বয়স ৬২ থেকে ধাপে ধাপে ৬৪ বছরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ও ধর্মঘট হয়। সরকারের যুক্তি ছিল, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি ও জনসংখ্যার পরিবর্তনের সঙ্গে পেনশন ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাখতে সংস্কার জরুরি। বিরোধী দল ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর যুক্তি ছিল, এই পরিবর্তনের চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে কর্মজীবী মানুষের ওপর।
ব্যাপক বিরোধিতার মধ্যেও সরকার সংস্কার বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যায়। মাখোঁর জন্য এটি ছিল রাজনৈতিক দৃঢ়তার বড় পরীক্ষা।
এর মধ্যেই তার প্রেসিডেন্সির সঙ্গে জড়িয়ে যায় ফ্রান্সের ইতিহাসের এক আবেগঘন অধ্যায়। ২০১৯ সালের অগ্নিকাণ্ডে নটরডেম ক্যাথেড্রাল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শত শত বছরের পুরোনো এই স্থাপনা ফ্রান্সের ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও স্থাপত্যের অন্যতম প্রতীক। আগুনের পর দ্রুত পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাঁচ বছরের কাজ শেষে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নটরডেম আবার খুলে দেওয়া হয়।
দুই হাজারের বেশি কারিগর ও শ্রমিকের দীর্ঘ পরিশ্রমে ক্যাথেড্রালটি পুনরুদ্ধার করা হয়। ফ্রান্সের জন্য এটি শুধু একটি পুরোনো ভবন ফিরিয়ে আনার ঘটনা ছিল না। এটি ছিল জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতি মানুষের আবেগ এবং একটি বড় কাজ সম্পন্ন করার সক্ষমতারও প্রকাশ।
নটরডেমের পুনর্জন্ম যেন মাখোঁর ফ্রান্সের একটি প্রতীকী ছবিও হয়ে ওঠে। পুরোনো ঐতিহ্যকে ধরে রেখে নতুন সময়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা।
মাখোঁর সব সিদ্ধান্ত জনপ্রিয় ছিল না। তার অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। পেনশন সংস্কার তীব্র বিরোধিতার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু তার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল স্পষ্ট। তিনি এমন একটি ফ্রান্সের স্বপ্ন দেখেছেন, যে তার ইতিহাস নিয়ে গর্ব করবে, কিন্তু শুধু অতীতের গৌরবের ওপর নির্ভর করে থাকবে না। যে শিল্পে প্রতিযোগিতা করবে, জ্বালানিতে শক্ত থাকবে, প্রতিরক্ষায় সক্ষম হবে এবং ইউরোপের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা নেবে।
বিশ্ব রাজনীতিতেও তিনি ফ্রান্সের নিজস্ব অবস্থান ধরে রাখতে চেয়েছেন। তার কাছে জাতীয় মর্যাদা শুধু সামরিক শক্তি বা অর্থনীতির অঙ্ক নয়। কূটনৈতিক স্বাধীনতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, শিল্পশক্তি এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষমতাও একটি দেশের মর্যাদার অংশ।
২০২৭ সালে এলিজে প্রাসাদে নতুন প্রেসিডেন্ট বসবেন। প্যারিসের রাজনৈতিক দৃশ্য বদলাবে। নতুন সরকার নতুন অগ্রাধিকার ঠিক করবে। কিন্তু গত এক দশকে ফ্রান্স যে পথে হাঁটতে শুরু করেছে, তার অনেকটাই সামনে থাকবে।
মাখোঁ চলে যাবেন, কিন্তু শক্তিশালী শিল্প, স্বাধীন কূটনীতি, ইউরোপীয় নেতৃত্ব ও বিশ্বমঞ্চে ফ্রান্সের মর্যাদার যে স্বপ্ন তিনি সামনে রেখেছেন, তার পরীক্ষা চলবে আরও বহু বছর। তার এক দশকের শাসন তাই শুধু একজন প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক অধ্যায় নয়, বরং পুরোনো শক্তিকে নতুন যুগের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার জন্য ফ্রান্সের দীর্ঘ এক প্রচেষ্টারও প্রতিচ্ছবি।









