তেলের দামে স্ফুলিঙ্গ, ভাড়ায় কেন দাবানল

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনের চাকা আজ অদৃশ্য এক চাপে ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতি, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্য। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবন এখন কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। এর মধ্যেই গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধিকে ঘিরে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা শুধু অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়; বরং এটি নৈতিকতা, ন্যায়বিচার এবং ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে জুলুম বা অবিচারের প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে আসে।
২০২২ সালে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বাড়ার পর পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছিল প্রায় ২২.২২ শতাংশ। অথচ এবার ডিজেলের দাম বৃদ্ধি মাত্র ১৫ টাকা হলেও ভাড়া বৃদ্ধির দাবি করা হচ্ছে প্রায় ৬৪ শতাংশ। এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রস্তাব স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে; এটি কি ন্যায্য, নাকি এটি এক ধরনের জুলুম?
ইসলাম অর্থনৈতিক লেনদেনকে শুধু মুনাফার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না; বরং তা ন্যায়, ভারসাম্য এবং মানবিকতার মানদণ্ডে বিচার করে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে গ্রহণের সময় পূর্ণমাত্রায় নেয়, কিন্তু যখন তাদেরকে দেয়, তখন কম দেয়।’ (সূরা আল-মুতাফফিফীন, আয়াত: ১–৩)
এই আয়াতগুলো শুধু ওজন বা মাপজোকের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এগুলো প্রতিটি আর্থিক লেনদেনের নৈতিক ভিত্তি বিনির্মাণ করে দেয়। যেখানে একপক্ষ অন্যপক্ষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত লাভের চেষ্টা করে, ইসলাম সেখানে তা স্পষ্ট অন্যায় বলে রুখে দাঁড়াতে বলে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো; কেননা জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকারে পরিণত হবে।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৫৭৮)
এখানে জুলুমের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। কারও অধিকার হরণ করা, অযৌক্তিকভাবে অতিরিক্ত মূল্য চাপিয়ে দেওয়া কিংবা জনসাধারণের প্রয়োজনকে পুঁজি করে মুনাফা বাড়ানো—এসবই জুলুমের অন্তর্ভুক্ত। পরিবহন খাতের ভাড়া বৃদ্ধির পরিমাণ যদি বাস্তব ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে তা ন্যায্যতার সীমা অতিক্রম করে জুলুমে পরিণত হয়।
ইসলামী অর্থনীতিতে ‘ইহতিকার’ বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো এবং ‘গাবন’ বা প্রতারণার মাধ্যমে লাভবান হওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে মজুতদারি করে (কৃত্রিমভাবে সংকট সৃষ্টি করে), সে গুনাহগার।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৬০৫)
যদিও এখানে সরাসরি মজুতদারির কথা বলা হয়েছে, তবে এর নৈতিক ভিত্তি একই। মানুষের প্রয়োজনকে ব্যবহার করে অযৌক্তিকভাবে লাভবান হওয়াও ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়।
তবে ইসলাম একতরফাভাবে ব্যবসায়ীদের দোষারোপ করে না। বরং বাস্তব ব্যয়, ন্যায্য মুনাফা এবং টেকসই অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার নির্দেশ দেয়। যদি সত্যিই জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, শ্রমিকের মজুরি ইত্যাদির খরচ বেড়ে যায়, তাহলে একটি যৌক্তিক ও পরিমিত ভাড়া বৃদ্ধি ন্যায্য হতে পারে। কিন্তু যখন এই বৃদ্ধির হার বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তখন তা জুলুমে পরিণত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম রাষ্ট্রকে কেবল প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে দেখে না; বরং রাষ্ট্রব্যবস্থা একটি ‘আমানত’ বা দায়িত্ব,। যেখানে শাসকের মূল কর্তব্য হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং দুর্বলদের অধিকার রক্ষা করা। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার ও উত্তম আচরণের নির্দেশ দেন।’ (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৯০)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শাসক একজন রাখাল, আর সে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জবাবদিহি করবে।’ (বুখারি, হাদিস: ৭১৩৮)
কাজেই যদি কোনো খাতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে, তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো তা নিয়ন্ত্রণ করা, ন্যায্যতা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন হলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বাজার তদারকির জন্য বিশেষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়েছিলেন, যারা অন্যায় মূল্যবৃদ্ধি ও প্রতারণা রোধে সর্বদা নিয়োজিত থাকতেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘মাসলাহা’ বা জনকল্যাণ। ইসলামী ফিকহের একটি মূলনীতি হলো—‘শাসকের সিদ্ধান্ত জনগণের কল্যাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে।’ (আল-কাওয়ায়িদ আল-ফিকহিয়্যাহ)
অর্থাৎ, রাষ্ট্র যদি দেখে কোনো সিদ্ধান্ত জনগণের জন্য কষ্টকর বা ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তাহলে তা সংশোধন করা তার দায়িত্ব।
সুতরাং নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির এই অস্বাভাবিক দাবি ইসলামের ন্যায়বিচার ও ভারসাম্যের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি যদি বাস্তব ব্যয়ের তুলনায় অতিরিক্ত হয়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে জুলুমের পর্যায়ে পড়ে। আর জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়; বরং প্রতিটি সচেতন নাগরিকেরও নৈতিক কর্তব্য।
একটি সমাজ তখনই টেকসই ও শান্তিপূর্ণ হয়, যখন সেখানে অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুধু মুনাফার উপর নয়, বরং ন্যায় ও মানবিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যথায়, সাময়িক লাভের আড়ালে জমে ওঠা এই অবিচার একসময় পুরো সমাজকেই অস্থির করে তোলে, যার পরিণতি হয় আরও ভয়াবহ।
গত কয়েক ঘণ্টায় সাধারণ মানুষের মনে এক অদৃশ্য অস্থিরতা জমেছে। চারপাশে যেন নীরব এক ভয়ার্ত বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে। জনমনে ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই প্রশ্ন; তেলের দামে যেখানে কেবল স্ফুলিঙ্গের ইঙ্গিত, সেখানে ভাড়ায় কেন দাবানল ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা?
এই অস্বস্তি শুধু হিসাবের নয়; এটি মানুষের নিত্যদিনের জীবনসংগ্রামের ভেতরকার চাপ ও অনিশ্চয়তার প্রতিফলন। আর ইতিহাস বলে, এমন জমে থাকা অসন্তোষ অবহেলিত হলে তা একসময় বারুদের মতো সংবেদনশীল হয়ে ওঠে, যা মুহূর্তেই পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
Saifpas352@gmail.com

