আগামীর চোখ
বাতাসের পেটে এতিমের চাল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরাবর,
জেলা প্রশাসক চাঁদপুর
মহোদয়, আমি মতলব উত্তর উপজেলার এক অখ্যাত এতিমখানার নামপরিচয়হীন এক আবাসিক কিশোর। জীবনের বড় বড় অঙ্কের হিসাব মেলানোর বয়স বা বুদ্ধি— কোনোটাই আমার নেই। তবে একটা হিসাব ভালো বুঝি, তা হলো পেটের ভেতরের খিদের আগুন। কারণ, জ্ঞান হওয়ার পর থেকে সেই জ্বলন্ত আগুনের সঙ্গেই আমার নিত্য বসবাস।
কদিন আগে খবর এলো, সরকার বাহাদুর আমাদের মতো ভাগ্যহত শিশুদের জন্য ৪৬ টন চালের এক বিশাল বরাদ্দ পাঠিয়েছেন। খবরটা শুনে ভেবেছিলাম, অন্তত কিছুদিন আমাদের ভাতের থালার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হবে না; পেট ভরে দু-মুঠো অন্ন জুটবে।
কিন্তু হায়! সরকারি বরাদ্দের সেই চাল আমাদের দুয়ারে আসার আগেই অর্ধেক হাওয়া। সরকারি গুদামের খাতা-কলমে এক টন চালের ‘ডিও’ ইস্যু হলো, কিন্তু সেই চাল যখন সব হাত ঘুরে অলৌকিকভাবে আমাদের এতিমখানায় এসে পৌঁছাল, তখন তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫০০-৬০০ কেজিতে! মাঝখানের ৪০০ কেজি চাল কোন বাতাসে কর্পূরের মতো উবে গেল, সেই রহস্য উন্মোচন করার সাধ্য আমাদের মতো এতিমদের নেই।
আমরা তো অর্ধেক চাল অন্তত চোখে দেখেছি। কলাকান্দি ইউনিয়নের ‘নেদায়ে ইসলাম’ কিংবা বিনন্দপুরের ‘মদিনাতুল উলুম’-এর মতো অনাথ আশ্রমগুলোর কপাল তো আরও মন্দ। বর্তমান বাজারে এক টন চালের দাম যেখানে ৫০ হাজার টাকারও বেশি, সেখানে তাদের হাতে চালের বদলে গুঁজে দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা! উপজেলায় এমন কিছু ‘ডিজিটাল এতিমখানা’ আবিষ্কৃত হয়েছে, যাদের অস্তিত্ব শুধু চকচকে সাইনবোর্ডেই সীমাবদ্ধ। সেখানে কোনো অনাথ শিশুর ক্রন্দন নেই, শিক্ষার আলো নেই; অথচ কাগজে-কলমে তারাও ঠিকই এক টন করে চাল নিচ্ছে।
চমৎকার লেগেছে আমাদের মান্যবর পিআইও এবং খাদ্য কর্মকর্তাদের সরল স্বীকারোক্তি। তারা বলছেন— ‘খাতা-কলমে কোনো ভুল নেই; বাইরে কে কী করেছে, তা তারা জানেন না!’ কী নিখুঁত ও পবিত্র এই সাধুতা!
হতাশার চাদর মুড়ি দিয়ে তাই আজ আপনার দরবারে এই পত্র পাঠালাম। আমাদের মুখের গ্রাস যারা কেড়ে নিয়েছে, তাদের বিচার কি এ দেশেই হবে, নাকি খোদার আদালতের জন্য তোলা থাকবে— সেই উত্তর আপনার কর্মের কাছেই প্রত্যাশা করি।
ইতি
নুন আনতে পান্তা ফুরানো এক এতিম কিশোর




