জাপান পারলে আমরা কেন নয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
খেলা শেষ। একে একে গ্যালারি ছাড়ছেন দর্শক। কিন্তু একদল মানুষ তখন ব্যস্ত অন্য কাজে। শিশু থেকে প্রবীণ— সবাই হাসিমুখে কুড়িয়ে নিচ্ছেন নিজেদের ফেলে যাওয়া আবর্জনা। বড় বড় প্লাস্টিক ব্যাগে জমা করছেন সব ময়লা। বিশ্বকাপ কিংবা অলিম্পিকের মতো আন্তর্জাতিক আসরে জাপানি সমর্থকদের এমন দৃশ্য এখন প্রায় পরিচিত এক চিত্র। এই অভ্যাসের সূচনা ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে। এর পর থেকে বড় ক্রীড়া আসরগুলোতে নিয়মিত দেখা যায়, খেলা শেষে নিজেদের বসার জায়গা পরিষ্কার করে তবেই স্টেডিয়াম ছাড়ছেন জাপানি দর্শক। এমনকি ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেও তারা স্টেডিয়াম পরিষ্কার করেছিলেন, যদিও সেই ম্যাচে তাদের দল মাঠেই নামেনি।
কেন এমনটা করেন তারা? এর উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় জাপানের একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদে— ‘Tatsu tori ato wo nigosazu,’ যার আক্ষরিক ইংরেজি : ‘A bird that flies never leaves a trace’। অর্থাৎ ‘যে পাখি উড়ে যায়, সে কোনো চিহ্ন রেখে যায় না।’ অন্যের জন্য সমস্যা তৈরি না করা এবং নিজের দায়িত্ব নিজে পালন করার এই মূল্যবোধ জাপানি সংস্কৃতির গভীরে গাঁথা। এই দর্শন শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জাপানিদের দৈনন্দিন আচরণের অংশ।
তবে সবসময় এমন ছিল না জাপান; বরং বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দেশটির সামরিক আগ্রাসন ও যুদ্ধাপরাধ মানব ইতিহাসের ভয়াবহ অধ্যায়গুলোর অন্যতম। ইতিহাসের পাতা খুললেই দেখা যায় তাদের ভয়াবহ সব অতীত। ১৯৩৭ সালের নানকিং গণহত্যা মানব ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস অধ্যায়। চীন-জাপান যুদ্ধের সময় জাপানি বাহিনীর হাতে নিহত হন লক্ষাধিক বেসামরিক মানুষ। সংঘটিত হয় ব্যাপক ধর্ষণ, লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ। একইভাবে ইউনিট ৭৩১-এর জৈব অস্ত্র গবেষণাগারে বন্দিদের ওপর চালানো হয় অমানবিক চিকিৎসা পরীক্ষা। ‘কমফোর্ট উইমেন’ ব্যবস্থার মাধ্যমে যৌনদাসত্বে বাধ্য করা হয় হাজার হাজার নারীকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জুড়ে জাপানি সামরিক বাহিনীর নানা কর্মকাণ্ড আজও ইতিহাসের কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। গুগলে ‘জাপানের জুনকো ফুরুতা হত্যাকাণ্ড’ লিখে সার্চ দিলে যে বীভৎস বর্ণনা পাওয়া যায়, তা লিখে প্রকাশ করার মতো নয়। তবু প্রশ্ন হলো— এত ভয়াবহ অতীতের একটি জাতি কীভাবে আজ বিশ্বের অন্যতম শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সভ্য সমাজে পরিণত হলো? ইতিহাস বলে, বড় ধরনের জাতীয় বিপর্যয় অনেক সময় আমূল পাল্টে দেয় একটি জাতির চিন্তা ও মূল্যবোধকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়, হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমার ধ্বংসযজ্ঞ এবং যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের কঠিন বাস্তবতা নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে জাপানকে। যুদ্ধের পর দেশটি গুরুত্ব দেয় সামরিক শক্তির পরিবর্তে শিক্ষা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর। একই সঙ্গে গড়ে তোলা হয় এমন একটি সামাজিক সংস্কৃতি, যেখানে জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে দেখা হয় ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধকে। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানো দেশটি সামরিক আগ্রাসনের পথ ছেড়ে বেছে নেয় শান্তি, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ। শুধু রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তনই নয়, বড় পরিবর্তন আসে শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম চাবিকাঠি হলো জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা। সেখানে শিশুদের শুধু পাঠ্যবই পড়ানো হয় না; শেখানো হয় দায়িত্ব নেওয়া, দলবদ্ধভাবে কাজ করা এবং নিজের কাজ নিজে করার অভ্যাস। অনেক স্কুলে শিক্ষার্থীরাই শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করে। এতে তারা বুঝতে শেখে, পরিচ্ছন্নতা কোনো নির্দিষ্ট কর্মীর দায়িত্ব নয়; এটি সবার দায়িত্ব। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই আরও একটি বিষয় শেখানো হয়— অন্যের অসুবিধার কারণ হওয়া যাবে না। একই বার্তা বহন করে পরিবার, বিদ্যালয় বা সমাজেও। ফলে নাগরিক দায়িত্ববোধ হয়ে ওঠে তাদের আচরণের স্বাভাবিক অংশ। স্টেডিয়াম পরিষ্কার করা কিংবা জনসমাগমে শৃঙ্খলা রাখা তাই তাদের কাছে কোনো বিশেষ উদ্যোগ নয়; দৈনন্দিন শিক্ষারই বাস্তব প্রয়োগ।
সেখানে শিশুদের শুধু পাঠ্যবই পড়ানো হয় না; শেখানো হয় দায়িত্ব নেওয়া, দলবদ্ধভাবে কাজ করা এবং নিজের কাজ নিজে করার অভ্যাস। অনেক স্কুলে শিক্ষার্থীরাই শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করে
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ববহ। আমাদেরও রয়েছে এক গৌরবময় ঐতিহাসিক ঘটনা— ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতার পর একটি নতুন জাতীয় চরিত্র গড়ে তোলার সুযোগ ছিল। কিন্তু নানা রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় আমরা সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি। আজও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় পরীক্ষার রেজাল্টকে। অথচ নাগরিক দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও সামাজিক নৈতিকতার মতো বিষয় অনেকাংশেই থাকে অবহেলিত।
একটি জাতির পরিবর্তন রাতারাতি ঘটে না। আইন, অবকাঠামো বা রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের মানসিকতা। আর সেই মানসিকতা গড়ে ওঠে শৈশবে। শিশুদের শুধু নীতিকথা শোনালেই হবে না; বাস্তব জীবনে শেখাতে হবে দায়িত্বশীল আচরণের চর্চা। বিদ্যালয়, পরিবার ও সমাজকে সেই দায়িত্ব নিতে হবে একসঙ্গে।
জাপানের উদাহরণ আমাদের দেখায়, ইতিহাস যতই অন্ধকার হোক, পরিবর্তন সম্ভব। সঠিক শিক্ষা, মূল্যবোধ ও সামাজিক চর্চার মাধ্যমে একটি জাতি নিজেদের গড়ে তুলতে পারে নতুনভাবে। বাংলাদেশও পারে। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি এবং আগামী প্রজন্মকে সত্যিকারের নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার আন্তরিক প্রচেষ্টা। যদি পরিবার, বিদ্যালয় ও রাষ্ট্র সমন্বিতভাবে আগামী প্রজন্মকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়, তাহলে পরিবর্তন অবশ্যই সম্ভব। জাপানের ইতিহাস আমাদের শেখায়, কোনো জাতি জন্মগতভাবে সভ্য বা অসভ্য নয়। সঠিক শিক্ষা, মূল্যবোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক চর্চাই একটি জাতির চরিত্র গড়ে তোলে।
জাপান তাদের অতীতের অন্ধকারকে অতিক্রম করে নতুন পরিচয় নির্মাণ করতে পেরেছে। বাংলাদেশও পারবে— যদি আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু পরীক্ষায় ভালো করার নয়, ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিতে পারি। তখন হয়তো একদিন বিশ্বও বাংলাদেশের কোনো ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্মরণ করবে বিস্ময় ও প্রশংসার সঙ্গে। যেদিন আমাদের শিশুরা দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার শিক্ষা বাস্তবে ধারণ করবে, সেদিন হয়তো আজকের মতো বিশ্বও তুলে ধরবে বাংলাদেশের উদাহরণ।
লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক, আগামীর সময়




