পুলিশকে নিরাপত্তা দেবে কে?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এক ভয়ংকর ব্যাধি সংক্রমিত হয়েছে সমাজে। মানুষ ক্ষিপ্ত হচ্ছে। ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে পুলিশের ওপর। কখনো আবার ভরসা রাখছে শুধুই নিজেদের তৈরি ‘ইনস্ট্যান্ট জাস্টিস’ বা তাৎক্ষণিক বিচারে। সাম্প্রতিক কিছু নৃশংস ঘটনা ও আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির চিত্রই ফুটে উঠেছে আগামীর সময়ের গতকাল বুধবারের প্রতিবেদনে।
লালমনিরহাটের আদিতমারীতে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘিরে যে রণক্ষেত্র সৃষ্টি হলো, তা চরম অরাজকতারই প্রতিচ্ছবি। সন্দেহভাজন এক খুনিকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে পিটিয়ে মারার যে উন্মাদনা দেখাল জনতা, তা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করতে গিয়ে খোদ জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং বিজিবি কর্তাদেরও অবরুদ্ধ হতে হলো। সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে তবেই উদ্ধার পেতে হলো প্রশাসনকে। জনতার এই মারমুখী রূপ স্পষ্ট করে দেয়, বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা আর পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের অনাস্থা আজ ঠিক কতটা গভীরে শিকড় গেড়েছে। মানুষ যখন দেখে অপরাধী আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়, তখনই তারা আইনকে হাতে পুরতে চায়। কিন্তু এই গণপিটুনির সংস্কৃতি আদতে কোনো সমাধান নয়; বরং তা সমাজকে আদিম অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।
অন্যদিকে, ঢাকার মোহাম্মদপুরে বিকাশ এজেন্টের টাকা লুট করে পালাচ্ছিল ছিনতাইকারীরা, তাদের ধরতে গিয়ে আক্রান্ত হতে হলো পুলিশকে। চাপাতির কোপে রক্তাক্ত হলেন আদাবর থানার ওসিসহ দুই কর্মকর্তা। অপরাধীরা আর পুলিশকে ভয় পাচ্ছে না! আগে শুনতাম পুলিশে ছুলে ৩৬ ঘা, আর এখন দেখছি অপরাধীর স্পর্শে পুলিশের শরীরই দগদগে হয়ে পড়ছে। ফলে আমজনতার নিরাপত্তা কোন অতলে তলিয়ে গেছে, তা আর আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। পুলিশ পাল্টা গুলি চালিয়ে চারজনকে ধরেছে বটে; কিন্তু তাতে কি অপরাধীদের মনে ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করা গেছে? প্রশ্নটা এখানেই।
রক্তের এই হোলিখেলা দেশের প্রান্তরে প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। নাটোরে পদ্মা নদীর বুকে ভাসমান নৌকা থেকে উদ্ধার হচ্ছে গুলিবিদ্ধ মরদেহ। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি খুনের ঘটনা প্রমাণ করে নদীপথগুলো এখন অপরাধীদের নিরাপদ চারণভূমি। এদিকে নরসিংদীর রায়পুরায় আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে প্রাণ যাচ্ছে তরুণের। গ্রাম্য কোন্দল আর ক্ষমতার দম্ভে সেখানে বোমাবাজি আর গোলাগুলি এখন নিত্যদিনের রেওয়াজ। কামরাঙ্গীরচরেও পূর্বশত্রুতার জেরে এক যুবককে প্রকাশ্য রাস্তায় ছুরিকাঘাত করে খুন করা হলো। যদিও পুলিশ চার ঘণ্টার মধ্যে ঘাতকদের ধরেছে; কিন্তু এই ক্ষিপ্রতা কি খুনের ঘটনা রুখতে পেরেছে? পারেনি।
প্রশাসন এখন তদন্ত কমিটি গড়তে পারে। মামলা করতে পারে। কিন্তু ব্যাধিটা যে গভীরে। এক চরম অসহিষ্ণুতার চোরাবালিতে অপরাধীরা বেপরোয়া, আর আমজনতা আইন অমান্যকারী। এই দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষের শান্তি। পুলিশকে আক্রমণ করা কিংবা দিবালোকে কুপিয়ে টাকা ছিনতাই করা— সবই আসলে রাষ্ট্রের দুর্বল আইনের শাসনের দিকেই আঙুল তোলে। অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার যে সংস্কৃতি, তাকে সমূলে উপড়ে ফেলতে না পারলে কোনো সাউন্ড গ্রেনেড বা পুলিশের পাল্টা গুলি দিয়ে সমাজে শান্তি ফেরানো সম্ভব নয়। আইনকে ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে রাখার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে, আগামী দিনে সাধারণ মানুষের প্রাণ মূল্যহীন বস্তুতে পরিণত হবে, তা নিশ্চিত।




