স্বচ্ছ পানির আড়ালে ভয়াবহ সংকট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রতিদিন সকালে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের লবণাক্ত উপকূল থেকে শুরু করে রাজধানীর কড়াইল বস্তির ঘিঞ্জি গলি পর্যন্ত লাখ লাখ নারী ও কিশোরীর এক প্রাত্যহিক দৃশ্য চোখে পড়ে। হাতে কলসি কিংবা বালতি নিয়ে তারা হেঁটে যান দূরের কোনো চাপকল বা সরকারি ট্যাপের দিকে। স্বাভাবিকভাবে টলটলে স্বচ্ছ পানিতে পাত্র ভরে নেওয়ার এই দৃশ্যকে আমাদের জাতীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের এক নীরব বিজয় বলেই মনে হয়।
কিন্তু দৃশ্যত এ স্বচ্ছ পানির আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য ও ভয়াবহ সংকট। চাপকল থেকে স্বচ্ছ যে পানি সংগ্রহ করা হচ্ছে, গ্লাসে ঢালার মুহূর্তেই অলক্ষ্যে বদলে যাচ্ছে তার আসল জৈবিক রূপ। চোখে দেখা না গেলেও সেই পানিতে মিশে থাকছে প্রাণঘাতী জীবাণু, সিসার প্রচ্ছন্ন বিষক্রিয়া, উপকূলীয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা কিংবা নগরীর জরাজীর্ণ ও লিক হওয়া পাইপলাইনের ক্ষতিকর দূষণ। ফলে জীবনের পরম আধার হিসেবে যে পানি আমরা গ্রহণ করছি, তা-ই হয়ে উঠছে দীর্ঘমেয়াদি ব্যাধির বাহক।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ (এমআইসিএস) ২০২৫-এর জরিপ স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে— ভৌত অবকাঠামো পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সাফল্য দেখালেও আমরা এমন এক সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়েছি, যেখানে শুধু নলকূপ বা পাইপলাইন থাকলেই পানির জৈবিক নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহনশীলতা সুনিশ্চিত হয় না। তাই এখন সময় এসেছে সেবার গুণগত মান ও স্বাস্থ্যের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার।
কয়েক দশক ধরে জাতীয় উন্নয়ন আখ্যানে ‘উন্নত’ পানির উৎসের বিস্তারকে বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কাগজে-কলমে পরিসংখ্যান অবশ্যই ঈর্ষণীয়; দেশের প্রায় ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ এখন মৌলিক নিরাপদ পানির উৎসের আওতায় এসেছে। বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানেও এই হার ৯৪ থেকে ৯৯ শতাংশের ওপরে।
তবে এমআইসিএস ২০২৫ এই ভৌত প্রবেশগম্যতা ও প্রকৃত সুরক্ষার পার্থক্যকে স্পষ্ট করেছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মানদণ্ড অনুযায়ী পানির উৎসে জৈবিক নিরাপত্তা, ধারাবাহিক প্রাপ্যতা ও আর্সেনিকমুক্ত থাকা সাপেক্ষে জাতীয় পর্যায়ে প্রকৃত অর্থে নিরাপদে পরিচালিত পানি পান করেন মাত্র ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ আর ৫৯ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ মৌলিক পানি পান করছেন। উৎসে পানির মান পরীক্ষা এবং গৃহস্থালিতে পানের মুহূর্তে পরীক্ষা করার পর যে তথ্য সামনে এসেছে, তা গভীর উদ্বেগের।
উৎসস্থলে পরীক্ষার সময় জাতীয়ভাবে ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ পানিতে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া ‘ই-কোলাই’-এর উপস্থিতি মেলে; কিন্তু সেই পানি যখন পরিবহন ও সংরক্ষণ শেষে ঘরের গ্লাসে পৌঁছায়, তখন দূষণের হার এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশে! সামাজিক বৈষম্যের দিকটি আরও করুণ; দেশের দ্বিতীয় দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর গৃহস্থালির ৯০ দশমিক ৪ শতাংশ পানিতে ই-কোলাই রয়েছে, এমনকি সবচেয়ে বিত্তশালী পরিবারের পানের পানিতেও এই হার ৭৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এটি প্রমাণ করে, আমাদের পানির সংকট শুধু নলকূপ স্থাপনের সংকট নয়; এটি পানি পরিবহন, সংরক্ষণ এবং স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থার বড় ধরনের প্রশাসনিক ও সচেতনতামূলক ব্যর্থতা। চাপকলের স্বচ্ছ পানি গৃহস্থালির টেবিলে আসার সংক্ষিপ্ত দূরত্বের মধ্যেই নোংরা পাত্র, অসচেতন নাড়াচাড়া এবং জরাজীর্ণ লিকযুক্ত পাইপের মধ্য দিয়ে পয়ঃবর্জ্যের সংস্পর্শে এসে বিষাক্ত হয়ে উঠছে।
চাপকল থেকে স্বচ্ছ যে পানি সংগ্রহ করা হচ্ছে, গ্লাসে ঢালার মুহূর্তেই অলক্ষ্যে বদলে যাচ্ছে তার আসল জৈবিক রূপ। চোখে দেখা না গেলেও সেই পানিতে থাকছে প্রাণঘাতী জীবাণু, সিসার প্রচ্ছন্ন বিষক্রিয়া, উপকূলীয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা কিংবা নগরীর জরাজীর্ণ ও লিক পাইপলাইনের ক্ষতিকর দূষণ
এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পরিবেশগত বিষক্রিয়া। সমতলে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিক এবং উপকূলে বেড়ে চলা ক্ষতিকর লবণাক্ততা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে চাপে ফেলছে। বরিশাল বিভাগে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ ক্ষেত্রে মাঝারি ও ২ দশমিক ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে উচ্চ লবণাক্ততা রেকর্ড করা হয়েছে; খুলনায় মাঝারি ১০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং উচ্চ লবণাক্ততা ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুদের রক্তে ক্ষতিকর সিসার প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি, যা নীরব ঘাতক হয়ে শিশুর মেধা, স্নায়বিক বিকাশ ও দেশের ভাবী উৎপাদনশীলতা ধসিয়ে দিচ্ছে।
দেশে ৭২ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধা পেলেও অধিকাংশ ল্যাট্রিনে আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের সঠিক ব্যবস্থা নেই। জাতীয়ভাবে মাত্র ৪ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার স্যুয়ারেজ বা ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত (ঢাকায় ১৭ দশমিক ১ শতাংশ, তবে অন্য সাত বিভাগে তা প্রায় শূন্য)। দেশের প্রায় ৮৭ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার অনসাইট স্যানিটেশনের ওপর নির্ভরশীল, যার একটি বড় অংশ অনিরাপদভাবে উন্মুক্ত জলাশয় বা ড্রেনে গিয়ে পড়ে। বর্ষায় অতিরিক্ত বৃষ্টিতে এই অপরিশোধিত মানববর্জ্য লোকালয়ে ভেসে ওঠে এবং অগভীর ভূগর্ভে পানির স্তর নিমেষে দূষিত হয়।
জলবায়ু পরিবর্তন এই ক্ষতের ওপর বাড়তি সংকট তৈরি করছে। গত এক বছরে জলবায়ু দুর্যোগের কারণে দেশের ১০ দশমিক ২ শতাংশ নিরাপদ পানির উৎস এবং ৫ দশমিক ২ শতাংশ স্যানিটেশন সুবিধা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ না করলে প্রতি বছর বন্যার জোয়ারে স্যানিটেশনের সব অর্জন ভেসে যেতে বাধ্য।
পানির অবস্থানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য। যেসব পরিবারে পানির উৎস দূরে, সেখানে পানি আনার মূল দায়িত্ব পালন করেন নারী ও কিশোরীরা (৮৫ দশমিক ৬ শতাংশ)। বছরের পর বছর পানির এই বোঝা বহন করতে গিয়ে গ্রামীণ নারীর স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এমআইসিএস ২০২৫ শুধু পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপদ পানির অধিকার আদায়ের এক কার্যকর হাতিয়ার। এতদিন উন্নয়ন বাজেটে কতটি নলকূপ বা শৌচাগার নির্মিত হলো, তার পরিসংখ্যান দেখিয়ে জয়গান গাওয়া হতো; কিন্তু এমআইসিএস শেখায়— লাইনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটির গ্লাসের পানি নিরাপদ কি না, সেটিই উন্নতির মূল মাপকাঠি। সরকারি-বেসরকারি খাতকে এখন ‘উৎস স্থাপন’ থেকে বেরিয়ে ‘সেবার স্থায়ী মান, অণুজীবমুক্ত পানি সরবরাহ এবং জলবায়ু আঘাত সহনশীলতা’কে প্রধান মাপকাঠি করতে হবে। পানির ই-কোলাই, সিসা, ভারী ধাতু ও লবণাক্ততার নিয়মিত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত।
সংকট নিরসনে এমআইসিএস ২০২৫-এর অন্তর্দৃষ্টিকে বাস্তবায়ন করতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, এলজিইডি, ডিপিএইচই এবং ওয়াসাগুলোর মধ্যে নিবিড় সমন্বয় করতে হবে এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, স্কুলের বাজেটে পানি ও স্যানিটেশন সুরক্ষাকে নিয়মিত অর্থায়নে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, এআইআইবি ও আইএসডিবিকে খুচরা প্রকল্প ছেড়ে মেগা প্রকল্প (যেমন— আঞ্চলিক ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনাগার ও বর্জ্য শোধনাগার) নির্মাণে যৌথ তহবিল গঠন করতে হবে। তৃতীয়ত, বেসরকারি খাতকে কম খরচে ফিল্টার প্রযুক্তি, ক্ষুদ্র সৌরচালিত ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট এবং সাশ্রয়ী পিরিয়ডসামগ্রী তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি এনজিওগুলোকে সামাজিক জবাবদিহি বাড়াতে কাজ করতে হবে এবং গণমাধ্যমকে ভূগর্ভের পানির বিষাক্ততা ও সিসাদূষণ নিয়ে গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।
এই সংকট উত্তরণে বাংলাদেশকে দুটি বৈশ্বিক উদ্যোগের নেতৃত্ব গ্রহণে প্রস্তুত হতে হবে। প্রথমত, স্যানিটেশন অ্যান্ড ওয়াটার ফর অল (SWA)-এর আওতায় ‘হেডস অব স্টেট ইনিশিয়েটিভ’ চুক্তি গ্রহণ করতে হবে, যা পানি ও স্যানিটেশনকে সরকারপ্রধানের শীর্ষ রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে রূপান্তর করবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়াটার ফরোয়ার্ড’ প্ল্যাটফর্মের অধীনে নিজস্ব দেশীয় রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে হবে, যা শহরের পানি সরবরাহ সংস্থাগুলোকে স্বাবলম্বী করা, ভূ-উপরিস্থ পানির অবকাঠামো ছড়ানো এবং সিসা ও আর্সেনিক নির্মূলে তহবিল জোগাবে।
পানি শুধু কেনাবেচার বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি মানবাধিকার, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি। এমআইসিএস ২০২৫-এর উপাত্ত আমাদের বাস্তব চিত্রকে যথার্থভাবে তুলে ধরেছে। এখন প্রয়োজন নীতিগত সাহসিকতা ও বিনিয়োগ। বৈশ্বিক উদ্যোগ ও সঠিক জাতীয় রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে পারলে শ্যামনগর থেকে কড়াইল বস্তি— দেশের প্রতিটি শিশু হাতে এক গ্লাস বিশুদ্ধ পানি তুলে নিতে পারবে পরম নিশ্চিন্তে।
লেখক: উন্নয়নকর্মী






