শর্ত নয় প্রত্যাশার বেড়াজালে ঢাকা-দিল্লি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর এবং সেটি কেন্দ্র করে কূটনৈতিক অঙ্গনে যে মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে দেশে ও বিদেশে নানান সমীকরণ মেলানো হচ্ছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় ফোরাম বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণের পর থেকে এ সফর ঘিরে একধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয়েছে। আমাদের দিক থেকে শুরুতেই একটি স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল, প্রধানমন্ত্রী যদি ভারতে সফর করেন, তবে তা একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফরের রূপ পাওয়া উচিত। কিন্তু দিল্লির মাটিতে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর অনলাইনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক তৎপরতা এবং পরে ঢাকার পক্ষ থেকে দেওয়া কড়া প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি কিছুটা জটিল রূপ নেয়। ভারতীয় হাইকমিশনারের ঢাকায় বিভিন্ন স্তরে বৈঠক এবং দ্রুত দিল্লিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান আমাদের মনে এ ধারণার জন্ম দিয়েছিল যে, সফরটিকে দ্বিপক্ষীয় রূপ দিতে দিল্লি বেশ আন্তরিক। তবে পরমুহূর্তেই ঢাকা থেকে ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির তাগিদ এবং কিছু নির্দিষ্ট বিষয় উত্থাপনের পর সফরটি আপাতত ঝুলে গেছে বলে মনে হচ্ছে। এমনকি দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের গার্ড প্রস্তুতি সম্পর্কিত বার্তা ও প্রত্যাহারও ইঙ্গিত দেয়, দ্বিপক্ষীয় সফরটি বর্তমানে একধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েছে। তবে আমার মতে, এ পুরো পরিস্থিতিকে সম্পর্কের চরম অবনতি হিসেবে না দেখে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন করে অনুধাবন করার একটি প্রাক-প্রস্তুতি হিসেবে দেখা উচিত।
আজকাল একটি কথা হরহামেশাই বলা হচ্ছে— বাংলাদেশ নাকি এ সম্পর্কের একটি ‘রিসেট’ বা পুনর্বিন্যাস চায় এবং তার জন্য ভারত সফরের আগেই কঠোর কিছু শর্ত সামনে নিয়ে এসেছে। তবে কূটনীতির ছাত্র এবং সাবেক কূটনীতিক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, আপনি কোন সম্পর্কের রিসেট চান, কিংবা আপনার কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে মতভিন্নতা থাকুক না কেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টেবিলে আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। শর্ত কিংবা অনড় অবস্থান নিয়ে দূরত্ব বজায় রাখার চেয়ে মুখোমুখি বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই কূটনীতির জটিলতম অলিগলি পার হতে হয়।
ঢাকা যে বিষয়গুলো উত্থাপন করেছে, সেগুলোকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রথার আলোকে ‘শর্ত’ না বলে বরং ‘জাতীয় প্রত্যাশা’ হিসেবে দেখাটাই বেশি সমীচীন। আমরা যদি এসব বিষয়কে শর্ত বা বাধা হিসেবে ধরে নিই, তবে সেই বাধার দেয়াল ভাঙার কাজটিও কিন্তু দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়কেই করতে হবে। কারণ কূটনীতির টেবিলে নমনীয়তা এবং দ্বিপক্ষীয় সংলাপের সুযোগ রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ, যাতে আমাদের মূল স্বার্থ ও প্রত্যাশাগুলো আদায়ের একটা বাস্তবসম্মত পথ খোলা থাকে।
ঢাকা যে বিষয়গুলো উত্থাপন করেছে, সেগুলোকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রথার আলোকে ‘শর্ত’ না বলে বরং ‘জাতীয় প্রত্যাশা’ হিসেবে দেখাটাই বেশি সমীচীন
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য পলাতক ব্যক্তির প্রত্যর্পণের যে বিষয়টি বারবার সামনে আনা হচ্ছে, সেটিকে শুধু একটি সাধারণ আইনি চুক্তি বা একপক্ষীয় দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এ বিষয়ে মূলত তিনটি স্পষ্ট মাত্রা কাজ করছে। প্রথমটি নিঃসন্দেহে আইনি মাত্রা। দেশের আদালত থেকে যখন একটি বিচারিক প্রক্রিয়া বা দণ্ডাদেশের বিষয় আসে, তখন বাংলাদেশ অবশ্যই বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী সহযোগিতার আর্জি জানাবে। এটি আমাদের দেশের আইনি ও শাসনতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা। কিন্তু দ্বিতীয় যে দিকটি অনেকেই এড়িয়ে যান, তা হলো এর রাজনৈতিক মাত্রা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শুধু আইনের দৃষ্টিতে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিই নন, তিনি একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং দীর্ঘদিনের একজন রাজনীতিক। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে যখন কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রত্যর্পণের বিষয় ওঠে, তখন চুক্তির ভেতরে থাকা রাজনৈতিক বিবেচনা বা ছাড়-সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ভারতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এ রাজনৈতিক সমীকরণটি নিশ্চিতভাবেই প্রভাব ফেলবে। আর তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, কৌশলগত বা ভূরাজনৈতিক মাত্রা। ভারত এই দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের একটি বড় শক্তি। তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে আশ্রয় প্রার্থীদের বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। ইতিহাস লক্ষ করলে দেখা যাবে, তিব্বতের দালাই লামা থেকে শুরু করে আফগানিস্তানের নজিবুল্লাহ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতাদের তারা আশ্রয় দিয়েছে। এ কৌশলগত ঐতিহ্য ও ভাবমূর্তির জায়গাটি দিল্লি কতটা বিসর্জন দেবে, সেটিও তাদের হিসাবনিকাশের ভেতরে থাকবে। তাই আমরা যখন এই প্রত্যর্পণের বিষয়ে দ্রুত কোনো ফলাফলের প্রত্যাশা করি, তখন আইনি চুক্তির পাশাপাশি এই রাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত জটিলতাগুলো মাথায় রাখাই হবে বস্তুনিষ্ঠ চিন্তার পরিচায়ক।
তবে মূল প্রশ্নের জায়গাটি হলো— শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক স্থগিত থাকা বা এ ধরনের জটিল রাজনৈতিক টানাপড়েন কি দুই দেশের সার্বিক সম্পর্কে কোনো দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা নিয়ে আসবে? ২০২৪ সালের আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে যতই টানাপড়েন থাকুক না কেন, আমাদের দৈনন্দিন ও বস্তুগত লেনদেন কিন্তু থেমে থাকেনি। ভারত থেকে নেপাল হয়ে বিদ্যুৎ আমদানি, সরাসরি বিদ্যুৎ ক্রয়, বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন কিংবা নিয়মিত মূল্য পরিশোধের প্রক্রিয়াগুলো কিন্তু চালু ছিল। এটি প্রমাণ করে, দুটি নিকট প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে একধরনের অনিবার্য ‘পারস্পরিক নির্ভরতা’ কাজ করে। অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লেনদেন নিজের গতিতে চললেও রাজনৈতিক আস্থা ও দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য শীর্ষ নেতাদের সরাসরি সংলাপ অপরিহার্য। দুই দেশের সরকারপ্রধানদের মধ্যে যখন একটি খোলামেলা আলোচনা হয়, তখন ঝুলন্ত ইস্যুগুলো যেমন নতুন গতি পায়, তেমনি বাণিজ্য, পানিবণ্টন কিংবা সীমান্ত নিরাপত্তার মতো দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অমীমাংসিত স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতেও সমঝোতার একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
পরিশেষে বলতে চাই, বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি স্থায়ী অচলাবস্থা বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। কূটনীতির ভাষায় এটি মূলত একটি সাময়িক বোঝাপড়ার পর্যায়। ঢাকা বা দিল্লি— কোনো পক্ষই কিন্তু আলোচনার দুয়ার পুরোপুরি বন্ধ করার কথা বলেনি। বাংলাদেশ যেমন আনুষ্ঠানিকভাবে সফর বাতিলের কথা জানায়নি, তেমনি ভারতও আলোচনার পথ রুদ্ধ করেনি। দুই দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েই এ উপলব্ধি স্পষ্ট, বর্তমানের মানসিক দূরত্ব কাটিয়ে উঠে একটি পারস্পরিক আস্থার জায়গায় পৌঁছাতে হবে। ব্রিকস কিংবা বিমসটেকের মতো বহুপক্ষীয় ফোরামগুলোকে কাজে লাগিয়ে যদি প্রাথমিক বরফ গলানো সম্ভব হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে একটি ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ সফর অনুষ্ঠিত হওয়া সম্ভব। আস্থার সংকটকে দূরে ঠেলে দিয়ে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সার্বভৌম সমতা ও বাস্তবতার ভিত্তিতে আলোচনা এগিয়ে নেওয়াই হবে ঢাকা ও দিল্লি— উভয়পক্ষের জন্যই দূরদর্শী কূটনীতির আসল পরিচয়।
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক







