দিল্লি থেকে ফিরে আসা আর বেনাপোল দিয়ে হেঁটে আসা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একেবারে হাত ধরাধরি করে দুটি ঘটনা ঘটে গেল। একদিকে আমরা খবরের কাগজে দেখলাম, ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে হেঁটে এ দেশে প্রবেশ করলেন। আর বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখতেই তার মুখ থেকে ঝরে পড়ল একরাশ আবেগ। দুই দেশের আকাশ-বাতাস এক করার বার্তা দিলেন তিনি। ভারত ও বাংলাদেশের ১৬০ কোটি মানুষের যৌথ শক্তির এক বিপুল খতিয়ান পেশ করে এক নতুন পরাশক্তির স্বপ্ন দেখালেন। কিন্তু ঠিক এ ঘটনার সমসাময়িককালেই ঘটল অন্য এক কাণ্ড, যা আমাদের বেশ ভাবিয়ে তোলে। খোদ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি এবং তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান দিল্লির বিমানবন্দরে নেমেই চরম হেনস্তার মুখে পড়লেন। তার নাম নাকি ভারতের কোনো এক নিরাপত্তা নজরদারির তালিকায় বা ওয়াচলিস্টে রয়েছে। আর এই অজুহাতে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা তাকে বিমানবন্দরে আটকে রাখা হলো, করা হলো নানাবিধ জিজ্ঞাসাবাদ। এই অসৌজন্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ ও অপমানিত উপদেষ্টা শেষমেশ সম্মেলন বয়কট করে শ্রীলঙ্কার কলম্বো হয়ে নিজের দেশে ফিরে এলেন।
স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠছে, এ দুই ঘটনার মধ্যে কি কোনো গোপন যোগসূত্র রয়েছে? আপাতদৃষ্টিতে ঘটনা দুটিকে পাশাপাশি রাখলে একটি টানাপড়েন বা একটি বৈপরীত্যের ছবি চোখে পড়ে। তবে পেশাদার কূটনীতির চশমা দিয়ে যদি আমরা পুরো বিষয়টিকে একটু তলিয়ে দেখি, তবে এই দুটি বিষয়কে এক দাঁড়িপাল্লায় মাপা ঠিক হবে না। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটের এবং ভিন্ন চরিত্রের ঘটনা। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের খাতিরে এদের আলাদা করেই দেখা ভালো এবং আলাদাভাবেই বিশ্লেষণ করা উচিত।
প্রথমেই আসা যাক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দিল্লি বিমানবন্দর থেকে ফিরে আসার এই অনভিপ্রেত প্রসঙ্গে। ঘটনাটি অত্যন্ত অসংগত, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং দুঃখজনক। যখন মন্ত্রী পদমর্যাদার কোনো ব্যক্তিত্ব কোনো দেশে সরকারি সফরে যান, তখন কিছু সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও প্রটোকল থাকে।
তার সফরের খুঁটিনাটি অনেক আগেই সংশ্লিষ্ট দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিক ও সরকারিভাবে জানানো হয়। এটাই আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি। এক্ষেত্রেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিক থেকে দিল্লির আমাদের বাংলাদেশ হাইকমিশনকে সব জানানো হয়েছিল বলে আমি আশা করি।
সব জানার ও বোঝার পরও যদি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাকে এভাবে বসিয়ে রেখে থাকে, তবে এই চরম গাফিলতির দায় সম্পূর্ণ তাদেরই নিতে হবে
নিয়ম অনুযায়ী, এমন হাই-প্রোফাইল মন্ত্রী পর্যায়ের সফরের সময় বিমানবন্দরে কূটনৈতিক মিশনগুলোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা। যদি আমরা ধরে নিই যে সব নিয়ম মেনে চলা হয়েছিল এবং আমাদের দূতাবাসের কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তবে বিমানবন্দরে একজন উপদেষ্টাকে এতটা সময় অপেক্ষা করতে হলো কেন— সেটাই সবচেয়ে বড় আশ্চর্যের এবং খটকার বিষয়।
এমনটা হতেই পারে যে, ভারতীয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো তথ্যের ঘাটতি ছিল বা তারা তার কাছ থেকে কিছু বাড়তি তথ্য জানতে চেয়েছিল। কিন্তু সেখানে যদি আমাদের মিশনের লোকজন উপস্থিত থাকতেন, তবে তো তাদেরই সেই তথ্য সরবরাহ করে তাৎক্ষণিকভাবে এই জটিলতা মিটিয়ে ফেলার কথা। তা যখন হয়নি বা করা যায়নি, তখন বোঝাই যাচ্ছে কোথাও একটা বড়সড় সমন্বয়ের অভাব ছিল। সব জানার ও বোঝার পরও যদি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাকে এভাবে বসিয়ে রেখে থাকে, তবে এই চরম গাফিলতির দায় সম্পূর্ণ তাদেরই নিতে হবে। বাংলাদেশ সরকার নিশ্চয়ই এরই মধ্যে এই আচরণের বিরুদ্ধে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চেয়ে থাকবে। এটি কোনো সম্মানজনক আচরণ ছিল না এবং এর বিরুদ্ধে একটা উপযুক্ত জবাব আমাদের আশা করা উচিত।
অনেকে বলছেন, জাহেদ উর রহমান নিজেই তো পরে ভারতীয় উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে প্রবেশের অনুমতি পেয়েছিলেন, তাহলে কেন তিনি ফিরে এলেন? এখানে বুঝতে হবে, একজন মানুষ যখন দেশের সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যান, মন্ত্রী পর্যায়ের একজন মানুষ যখন দেখেন তাকে যথাযথ সম্মান দেওয়া হচ্ছে না বা অসম্মান করা হচ্ছে, তখন তিনি সেখানে না গিয়ে ফিরে আসতেই পারেন। তার এই ফিরে আসাকে কোনোভাবেই অন্যায় বা ব্যক্তিগত অহংকার বা কোনো নেতিবাচক আচরণ বলা চলে না। এটি একটি দেশের আত্মসম্মানের প্রশ্ন। শোনা যাচ্ছে, অতীতে কোনো একসময় তার কোনো ভারতবিরোধী বক্তব্যের কারণে ভারতের কোনো বিভাগ তাকে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল। সেই তালিকা অভিবাসন বিভাগে সময়মতো হালনাগাদ না করার ফলেই এই প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, যখন তাকে সরকারিভাবে আমন্ত্রণ জানানো হলো এবং তিনি আসবেন বলে স্থির হলো, তখন কেন এই তালিকা সংশোধন করা হলো না? আমেরিকা তো নরেন্দ্র মোদিকেও একসময় কালো তালিকাভুক্ত করেছিল, ভিসা দেয়নি। কিন্তু তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হয়ে সেখানে গেলেন, তখন কি এই প্রশ্ন উঠেছিল? ওঠেনি। তাই দিল্লির এই সমন্বয়ের অভাব সত্যিই বেদনাদায়ক।
অন্যদিকে, নতুন ভারতীয় হাইকমিশনারের হেঁটে সীমান্ত পার হওয়া এবং এসে একটা আবেগী বক্তৃতা দেওয়া নিয়ে আমাদের দেশের রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা ও বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। এখানে আমাদের একটা কথা খুব পরিষ্কারভাবে মনে রাখতে হবে, দীনেশ ত্রিবেদী মূলত একজন রাজনীতিক, তিনি কিন্তু কোনো পেশাদার বা ক্যারিয়ার কূটনীতিবিদ নন। আর রাজনীতিকরা প্রায়ই অনেক রূপক বা মেটাফোর ব্যবহার করে কথা বলতে ভালোবাসেন। তাদের সব কথা সব সময় আক্ষরিক অর্থে ধরলে চলে না। তিনি হয়তো দুই দেশের সম্পর্ক যে ভালো বা ভারত এই সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে চায়, সেটি বোঝানোর জন্যই রূপক অর্থে এই শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন। কিন্তু মুশকিল হলো, তার এই শব্দচয়ন বা প্রকাশভঙ্গি বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে খুব একটা ইতিবাচক সাড়া ফেলেনি। মানুষ এখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বাস্তবতাকে খুব খুঁটিয়ে দেখছে। তাই এ ধরনের বড় বড় সংখ্যাতাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক মেলবন্ধনের তত্ত্বকে সাধারণ মানুষ ইতিবাচকভাবে না নিয়ে কিছুটা নেতিবাচক চোখেই দেখছে এবং এটাই এখনকার প্রবণতা।
অনেকে আবার একই সময়ে সীমান্তে ঘটে যাওয়া পুশইন বিতর্ক, নো ম্যানস ল্যান্ডে আটকে থাকা অসহায় পরিবার বা ভিসা জটিলতার মানবিক সংকটের সঙ্গে এই হেঁটে আসাকে মেলাতে চাইছেন। রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে এ ধরনের সিচুয়েশনে নানা রকম মেটাফোর তৈরি করার সুযোগ থাকে বটে, কিন্তু আমার কাছে দুটো বিষয়কে এক করার কোনো যুক্তিসংগত কারণ আছে বলে মনে হয় না। হাইকমিশনার যে পথ দিয়ে এসেছেন, সেখানে তো আর ওই সংকটের শিকার হওয়া মানুষগুলো উপস্থিত ছিলেন না। এর আগে হাইকমিশনার দোরাইস্বামীও কিন্তু আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে এভাবেই এসেছিলেন। তাই এর ভেতরে অন্য কোনো বিশেষ গুরুত্ব খোঁজার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।
বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এই অখণ্ড ভূগোলের বা অখণ্ড ভারতের ভাবাবেগের কোনো বাস্তব অর্থ বা কার্যকারিতা আছে বলে আমি মনে করি না। আজ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম। এখানে আমরা যে সাত-আটটি দেশ রয়েছি, আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব পরিচয়, স্বাধীনভাবে বাঁচার ইচ্ছা, প্রত্যয় এবং সংগতি রয়েছে। তাই এই বৈচিত্র্যপূর্ণ জায়গা বা বৈচিত্র্যকে মেনেই আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতার পথ খুঁজতে হবে। আমাদের এখন মনোযোগ দেওয়া দরকার, কীভাবে একে অপরকে সম্মান জানিয়ে পাশে দাঁড়ানো যায়। তাই এ দুই ঘটনাকে একসঙ্গে গুলিয়ে না ফেলে আলাদাভাবে দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
লেখক : সাবেক কূটনীতিক ও ভূরাজনীতির বিশ্লেষক





