রাজনীতির বাইরেও একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজনীতির বাইরেও নীতিনৈতিকতায়, আদর্শে, জ্ঞানে-গুণে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্যার আমার জীবনের একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ। সততা, সংযম ও নিরহংকার ব্যক্তিত্বের গুণে দেশ জুড়ে তার যে অভাবনীয় সুনাম, তা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। সেই অনুপ্রেরণায় তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা থেকে আমি একটি গান রচনা করেছিলাম, যা পরে তার নির্বাচনী প্রচারণায়ও ব্যবহার হয়। গানটি ছিল এমন— ‘জ্ঞানে-গুণে-সততায় দেশ জুড়ে যার সুনাম, সে যে মোদের মির্জা ফখরুল ইসলাম।’
তবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্যারের সঙ্গে আমার আত্মিক যে পরিচয়, তা শুধু একজন জাতীয় রাজনীতিক বা দলীয় নেতার হিসেবে গড়ে ওঠেনি। তিনি আমার কাছে একজন দূরদর্শী শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও পরম শ্রদ্ধেয় অভিভাবক। আমার কাছে তার স্থান পিতার আসনাধিক। তিনি আমাকে স্নেহভরে ‘শিশু’ বলে ডাকতেন। যেমন নিরহংকারী, তেমনি প্রাত্যহিক জীবনে সাধারণ। তার নিজের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত গাড়িটি ছিল বেশ পুরনো ও জরাজীর্ণ। তাই ঠাকুরগাঁও বা ঢাকার পথচলতি বিভিন্ন কাজে প্রায়ই তিনি আমার গাড়িতে উঠতেন। রাজপথে যাতায়াতের সময় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, রিকশাচালক ও গরিব-দুঃখীরা তাকে দেখে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুখে হাসি নিয়ে সালাম দিতেন। তারা কোনো বস্তুগত সাহায্য বা অনুদান না চেয়ে শুধু স্যারের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতেন।
স্যারও গাড়ি থামিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সহানভূতির সঙ্গে তাদের কথা শুনতেন। যখন শুনতেন, কোনো সাধারণ কর্মী কেবল বিএনপি করার অপরাধে অগণিত মিথ্যা মামলায় জর্জরিত হয়ে কোনোমতে রিকশা চালিয়ে জীবন-সংগ্রাম চালাচ্ছেন, তখন স্যারের চোখ ছলছল করে উঠতেও দেখেছি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক লড়াই এবং তার সঠিক ও উন্নত চিকিৎসার জন্য ফখরুল স্যারের আকুলতা ছিল অপরিসীম। তিনি প্রায়ই আক্ষেপ করে বলতেন, ‘ম্যাডাম বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা করে মরতে পারলে শান্তি পেতাম।’
সততা, সংযম ও নিরহংকার ব্যক্তিত্বের গুণে দেশ জুড়ে তার যে অভাবনীয় সুনাম, তা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল
বহুবার স্যার আমাকে তার ঠাকুরগাঁওয়ের নিজ বাসভবনে বেড়াতে নিয়ে গেছেন। আমি গাড়ি চালাতাম আর স্যার আমার পাশের আসনেই বসতেন। ঠাকুরগাঁওয়ে যাওয়ার পথে তিনি একটি মাজারে নিজ হাতে নিয়মিত দান করতেন। মাকে সঙ্গে নিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে একসঙ্গে খেতেন।
স্যারের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত দুটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি।
প্রথম ঘটনা: ২০১৫ সালের ৬ জানুয়ারি। তৎকালীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের গুণ্ডাবাহিনী— ছাত্রলীগ, যুবলীগ, এমনকি পুলিশ পর্যন্ত স্যারকে হত্যার উদ্দেশ্যে জাতীয় প্রেস ক্লাবে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। প্রেস ক্লাবের ভেতরে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সেদিন আমি এবং স্যারের এপিএস ইউনুস সারা রাত না ঘুমিয়ে প্রেস ক্লাবের সোফায় কাটাই। শেষরাতে আমি ও ইউনুস কৌশল অবলম্বন করে পাশের সিরডাপ ভবনের দারোয়ানকে দিয়ে লম্বা মইয়ের ব্যবস্থা করলাম। ভেবেছিলাম, শেষরাতে মই দিয়ে পেছনের দেয়াল টপকে স্যারকে নিরাপদে বের করে নিয়ে যাব।
পরিকল্পনা অনুযায়ী স্যারকে বললাম— ‘স্যার, পেছনের পথ দিয়ে বের হওয়ার জন্য মই জোগাড় করেছি। ফজরের আজানের সময় মই দিয়ে সিরডাপের ভেতর দিয়ে আমরা রাস্তায় উঠব, ওখানে আমার গাড়ি রাখা থাকবে।’ কিন্তু আমার কথা শুনে স্যার অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, ‘আমি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমাকে মেরে ফেলুক, তারপরও আমি পেছন দিয়ে যাব না। তুমি তোমার গাড়ি নিয়ে রেডি থাকবে, সকালে সম্মুখ দিয়ে বের হব।’
স্যারের অটল সিদ্ধান্তে আমরা সকালে প্রধান ফটক দিয়েই গাড়ি নিয়ে বের হলাম। কিন্তু মুহূর্তেই শুরু হলো এক ভয়াবহ তাণ্ডব। ওরা গাড়ির ওপর হামলা করল। সামনের গ্লাসে স্প্রে মারল, রাইফেলের বাঁট দিয়ে আঘাত করল এবং লুকিং গ্লাস ভেঙে দিল। মনে হচ্ছিল— স্যারকে নিয়ে হয়তো আর জীবিত বের হতে পারব না। তবুও পরম করুণাময়ের কৃপায় জীবন বাজি রেখে গাড়ি চালিয়ে সোজা মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে পৌঁছালাম। সেখান থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেল। সে মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল, আমি বুঝি নিজ হাতে স্যারকে জেলে তুলে দিলাম; সেদিন আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি, ভীষণ কেঁদেছিলাম।
দ্বিতীয় ঘটনা: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্যার আমাকে এতটাই স্নেহ করতেন, তার কাছে আমার যেকোনো আবদার বা অনুরোধ তিনি প্রাধান্য দিতেন। একবার স্যারকে বললাম, ‘ম্যাডাম বেগম খালেদা জিয়া ও আমার মায়ের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান— হাফিজিয়া মাদ্রাসা করতে চাই।’ চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও স্যার আমার আবদার রক্ষার্থে ২০২৩ সালের ২১ মার্চ তারিখ নির্ধারণ করলেন। সে সময়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা স্যারকে বরগুনার মতো দূরবর্তী এলাকায় যেতে নিষেধ করেন। কিন্তু তিনি কারও নিষেধ না শুনে শুধু লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে তার সম্মতি নিয়ে কোনো দলীয় কর্মী-সমর্থকদের বহর ছাড়া একা আমাকে সঙ্গে নিয়ে বরগুনার অজপাড়াগাঁয়ে আমার বাড়িতে উপস্থিত হন। দুপুরে আমাদের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া শেষে বিষখালী নদীর তীরে বেগম খালেদা জিয়া গার্লস স্কুল ও কৃষি কলেজ, নুরজাহান হাফিজিয়া মাদ্রাসা, আল কাবীর জামে মসজিদ এবং আমার বাসভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিতদের উদ্দেশে তিনি অত্যন্ত আবেগময় কণ্ঠে বলেছেন, ‘আপনাদের সন্তান হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক দীর্ঘকালের। ও একেবারে আমার পারিবারিক একজন সদস্য এবং আমার সন্তানতুল্য; ওকে আমি অত্যন্ত স্নেহ করে শিশু বলে ডাকি।’
অনুষ্ঠান শেষে বিষখালী নদীর মোহনায় কিছুক্ষণ হেঁটে পরম মমতায় আমাকে জড়িয়ে ধরে ফখরুল স্যার বললেন, ‘শিশু, আমি আবার আসব।’ সেদিনও আমার চোখ থেকে অশ্রু ঝরেছিল, তবে তা ছিল আনন্দের অশ্রু।
লেখক: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ জিয়া শিশু একাডেমি





