অটোমান সাম্রাজ্য যদি টিকে যেত?
- মানুষ কি ভিন্ন ধর্ম ও জাতি নিয়ে একসঙ্গে একটি রাষ্ট্রে থাকতে পারে?

ছয় শতাব্দী ধরে পারস্য উপসাগর থেকে ভিয়েনার প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই শক্তিশালী সাম্রাজ্য
রাত গভীর। ইস্তাম্বুলের প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ সুলতান দূরে জ্বলতে থাকা শহরের আলো দেখছেন। ইউরোপে যুদ্ধের আগুন জ্বলছে, সাম্রাজ্যের ভেতরে অসন্তোষ জমছে আর ইতিহাস যেন নিঃশব্দে একটি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। যদি সুলতান পঞ্চম মেহমেদ অন্য পথ বেছে নিতেন? যদি অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে না পড়ত, তাহলে আজকের পৃথিবীটা কি অন্যরকম হতো?
১৯২২ সালের ১ নভেম্বর, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর অটোমান সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। ছয় শতাব্দী ধরে পারস্য উপসাগর থেকে ভিয়েনার প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই শক্তিশালী সাম্রাজ্যকে একসময় বলা হতো ‘ইউরোপের অসুস্থ মানুষ’। কিন্তু আজ অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, এর পতন অবশ্যম্ভাবী ছিল না; বরং ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বিদেশি চাপ ও যুদ্ধের ধাক্কাই একে ধ্বংস করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালেও অনেক আরব নেতা শেষ পর্যন্ত অটোমানদের প্রতি অনুগত ছিলেন। কেউ কেউ পরে বিদ্রোহে যোগ দিলেও অনেকেই ভবিষ্যতে এক ধরনের যৌথ রাষ্ট্রব্যবস্থার সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে থাকেন। তবে বড় প্রশ্নটা এখানেই— সাম্রাজ্য টিকে থাকলেও কি তা স্থায়ী হতো?
ফরেন পলিসি বলছে, যুদ্ধের আগে সাম্রাজ্যটি পুরোপুরি দুর্বল ছিল না; বরং সংবিধান, সংসদ এবং বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষের জন্য সমান অধিকারের মতো ধারণা নিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। একই সঙ্গে আবার সহিংসতা, অবিশ্বাস এবং বিভাজনও বাড়ছিল। যেন একই সঙ্গে দুটি ভবিষ্যৎ তৈরি হচ্ছিল— একটি সহাবস্থানের, আরেকটি বিচ্ছেদের।
যদি সাম্রাজ্যটি টিকে থাকত, তাহলে হয়তো এটি বহু জাতিগোষ্ঠীর— তুর্কি, আরব, কুর্দি— একটি যৌথ রাষ্ট্র হতো। কিন্তু ধর্মীয় দিক থেকে এটি হয়তো কম বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠত। কারণ, ১৯১৪ সালের আগেই ধর্মীয় উত্তেজনা তীব্র হয়ে উঠেছিল এবং অনেক খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী নির্যাতন বা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিল। ফলে একটি মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ছিল।
এদিকে, ১৯০০ শতকে ইউরোপীয় শক্তির সহায়তায় গ্রিস, সার্বিয়া, বুলগেরিয়ার মতো খ্রিস্টান অঞ্চলগুলো স্বাধীন হয়ে যায়। এতে অটোমান শাসকদের মধ্যে সন্দেহ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে। পরে বলকান যুদ্ধ, গণহত্যা ও বিদেশি হস্তক্ষেপ এই ভয়কে আরও গভীর করে তোলে। খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে বয়কট, উচ্ছেদ— এসবও তখন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে, সাম্রাজ্যের ভেতরে আরব জাতীয়তাবাদও জন্ম নিচ্ছিল। কিন্তু তারা শুরুতে স্বাধীনতা চায়নি। তারা চেয়েছিল স্বীকৃতি, অধিকার, এবং ক্ষমতার অংশীদারিত্ব। কেউ কেউ তো এমনও কল্পনা করেছিল— তুর্কি ও আরবদের নিয়ে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির মতো একটি দ্বৈত রাজতন্ত্র।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালেও অনেক আরব নেতা শেষ পর্যন্ত অটোমানদের প্রতি অনুগত ছিলেন। কেউ কেউ পরে বিদ্রোহে যোগ দিলেও অনেকেই ভবিষ্যতে এক ধরনের যৌথ রাষ্ট্রব্যবস্থার সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে থাকেন। তবে বড় প্রশ্নটা এখানেই— সাম্রাজ্য টিকে থাকলেও কি তা স্থায়ী হতো?
বাস্তব ইতিহাস বলছে, হয়তো না। অটোমানরা জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে গিয়েছিল নিজেদের রক্ষার জন্য। কারণ ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়নি। এমনকি তারা নিরপেক্ষ থাকলেও ভবিষ্যতে আক্রমণের শিকার হতে পারত।
হয়তো তেলসম্পদ ব্যবহার করে তারা উন্নয়ন ঘটিয়ে জনগণের সমর্থন পেত। আবার এটিও হতে পারত— দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আরবদের মধ্যে তীব্র স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হতো
ধরা যাক, যুদ্ধ এড়িয়ে তারা কিছুদিন টিকে থাকল। তবুও নতুন সংকট আসতেই পারত। রাশিয়া আর্মেনীয়দের প্রশ্নে হস্তক্ষেপ করতে পারত, ব্রিটেন সুয়েজ খাল রক্ষার জন্য ফিলিস্তিন দখল করতে পারত, ফ্রান্স লেবাননে অভিযান চালাতে পারত। একের পর এক সংঘর্ষে নতুন সীমানা তৈরি হতো, মানুষ বাস্তুচ্যুত হতো আর সাম্রাজ্য আরও দুর্বল হয়ে পড়ত।
এই পরিস্থিতিতে মুসলিম জনগোষ্ঠী হয়তো একত্র হতো; কিন্তু জাতীয়তাবাদ থেমে থাকত না। তুর্কি ও আরবদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তেই পারত— কারণ কেন্দ্রীয় শাসন জোরদার করতে গিয়ে ইস্তাম্বুল থেকে পাঠানো কর্মকর্তাদের আচরণ স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করছিল। এমনকি সংসদীয় রাজনীতিও নতুন বিভাজন তৈরি করতে পারত— যেমন ভাষা নিয়ে বিতর্ক।
সম্ভবত অটোমানরা সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো একটি ব্যবস্থা গড়তে পারত, যেখানে বিভিন্ন জাতিকে কিছু স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়; কিন্তু আসল ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে থাকে। ইসলাম হতে পারত ঐক্যের ভিত্তি। তুর্কি, আরব, কুর্দিদের স্বীকৃতি দেওয়া হলেও ধীরে ধীরে তুর্কি ভাষা ও সংস্কৃতিই প্রাধান্য পেত।
তারা হয়তো নিজেদের সুবিধামতো সীমানা বদলে আরবদের রাজনৈতিক শক্তি কমানোর চেষ্টা করত, যেমন— সিরিয়া ও ইরাক আলাদা প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করা।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি এটি সফল হতো? হয়তো তেলসম্পদ ব্যবহার করে তারা উন্নয়ন ঘটিয়ে জনগণের সমর্থন পেত। আবার এটিও হতে পারত— দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আরবদের মধ্যে তীব্র স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হতো। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের সমর্থন দিত আর যুক্তরাষ্ট্র অটোমানদের পাশে দাঁড়াত; শুরু হতো এক নতুন ধরনের শীতল যুদ্ধ।
এমনকি কেউ কেউ কল্পনা করেন, এর পরিণতি পাকিস্তানের মতো হতে পারত— একটি বহু-জাতিগোষ্ঠীর রাষ্ট্র, যা পরে ভেঙে যায়। যেমন ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে বাংলাদেশ হয়, তেমনি অটোমান সাম্রাজ্যও ভেঙে ছোট হয়ে তুরস্কের মতো একটি রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারত।
তাই শেষ পর্যন্ত এই গল্প আমাদের নিশ্চিত উত্তর দেয় না; বরং প্রশ্ন রেখে যায়। মানুষ কি ভিন্ন ধর্ম ও জাতি নিয়ে একসঙ্গে একটি রাষ্ট্রে থাকতে পারে, নাকি বিভাজনই শেষ পরিণতি? ইতিহাস বলে— দুটোই সম্ভব। কখনো সহাবস্থান টিকে যায়, আবার কখনো বিভাজন এত গভীর হয় যে তা আর মেরামত করা যায় না।
অটোমান সাম্রাজ্যের গল্প আমাদের শেখায়— ইতিহাসে কোনো পথই একমাত্র পথ নয়। কিন্তু প্রতিটি সম্ভাবনার ভেতরেই থাকে নতুন সংকট, নতুন দ্বন্দ্ব। বিকল্প ইতিহাস কোনো স্বপ্নের সমাধান নয়; এটি কেবল আমাদের দেখায় ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিলে পৃথিবীটা হয়তো আলাদা হতো; কিন্তু সমস্যাগুলো একেবারে হারিয়ে যেত না।
লেখক: উপ-বার্তা সম্পাদক, আগামীর সময়






