হাওরে মিশছে কৃষকের কান্নার নোনাজল

হাওরে চলছে ধান কাটা, একইসঙ্গে বাড়ছে বন্যার আশঙ্কা
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয়েছে লঘুচাপ। দেশ জুড়ে ঝরছে বৃষ্টি। কোথাও মাঝারি, কোথায়ও ভারী, আবার কোথাও হচ্ছে অতিভারী বর্ষণ। বৈশাখের বৃষ্টিতে যেন শ্রাবণের রূপ। এবারের এই অকাল ভারী বর্ষণে হাওর এলাকায় দেখা দিয়েছে উৎকণ্ঠা। গেল কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওর এলাকার কয়েকটি জেলায় দেখা দিয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে আরও কয়েকটি এলাকা। একাধিক হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে ডুবতে শুরু করেছে ধান।
সারা বছর যে ধানের অপেক্ষায় থাকেন হাওরবাসী, সেই ধান ডুবে যাওয়ায় দিশেহারা তারা। আধা-পাকা, পানিতে ডুবে যাওয়া ধান বুকে নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন কৃষক। তাদের চোখের নোনাজল মিছে যাচ্ছে হাওরে ঘোলাজলে। ফসলহারা সেই মানুষের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে হাওরের বাতাস।
হাওরে ‘ফসল বীমা’ ঘোষণা না করলে কৃষক আর ভরসার কোনো পথ দেখবে না
সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের কয়েক হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে গেছে তলিয়ে। সুনামগঞ্জের মধ্যনগরের ইকরাছই হাওরে বাঁধ ভেঙে ঢুকছে পানি। মৌলভীবাজারের কেওলার হাওরসহ বিভিন্ন স্থানে কাঁচা ও আধা-পাকা ধান গেছে তলিয়ে।
হাওরের ৩০ ফুট গভীর বিল, খাল ও নদীগুলোতে পলি ভরাট হয়ে ১০ ফুটে নেমে যাওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই ফসলের ক্ষেত থেকে পানি সরতে না পারায় এ ধান তলিয়ে এমন নিদারুণ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অতীতে বৃষ্টির পানি বিলে জমা হতো, আবার খাল দিয়ে বেরিয়ে যেত নদীতে।
এবার নদীতেও পানি বেশি। সুরমা, কুশিয়ারা, খোয়াই ও জুড়ী নদীর পানি বিভিন্ন পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। মৌলভীবাজারের জুড়ী পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমা নদীর পানি বেড়েছে আরও ৫৬ সেন্টিমিটার।
এমন অবস্থায় ফসল রক্ষার বড় চ্যালেঞ্জে পড়েছেন কৃষক। একদিকে হুহু করে বাড়ছে পানি, অন্যদিকে রয়েছে শ্রমিক সংকট।
কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওর এলাকার কয়েকটি জেলায় দেখা দিয়েছে বন্যা পরিস্থিতি
হাওরের কিছু জমিতে প্রকৃত জমির মালিক ফসল লাগালেও বেশিরভাগ জমিতে ফসল ফলান প্রান্তিক চাষিরা। তারা তাদের শহরে কাজ করা ছেলেমেয়ের কষ্টের টাকা দিয়ে জমি লিজ নিয়ে বা কখনো আধিয়ার হিসেবে ক্ষেতে ফসল বোনেন। বাকিতে বীজ, কীটনাশক, সার সেচ দেন। পাকা ধান ঘরে তুলে সারা বছরের ভাতের চাহিদা মেটানো থাকে মূল লক্ষ্য। ক্ষেতে কৃষক নিজে ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে পরিশ্রম করেন ভালো ফলনের আশায়। কিন্তু এবার হাওরের বেশিরভাগ কৃষকের চোখেমুখে কান্না আর আর্তচিৎকার। একদিকে দেনা, অন্যদিকে অন্তত ছয় মাসের ভাতের ব্যবস্থা শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা নিঃস্ব, অসহায়।
এসব ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের যথাযথ ক্ষতিপূরণ সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি হাওরের বিল, খাল ও নদীগুলো দ্রুত খনন করে পানি সরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে না পারলে আগামীতে হয়তো ফসল করার কৃষক পাওয়া যাবে না।
সর্বোপরি হাওরে ‘ফসল বীমা’ ঘোষণা না করলে কৃষক আর ভরসার কোনো পথ দেখবে না।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি





