ম্যাগনোলিয়ার এত তাড়া কীসে?

সংগৃহীত ছবি
ম্যাগনোলিয়ার এত তাড়া কীসে? দুদিন আগেও যেখানে থোকা থোকা ঝুলে ছিল ওরা। আজ নেই। বৃন্তচ্যুত গোলাপিরা লুটিয়ে আছে তলায়। এই তো সেদিনও ওদের সঙ্গে ফ্রেম বন্দি হওয়ার জন্য কত সুদর্শনারা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন অপেক্ষায়। একের পর এক। আজ তাদের পায়েই দলিত হচ্ছে ম্যাগনোলিয়া। এও হয়!
প্রেম, বিরহ, দ্রোহের এই অনুপ নগরী বড়ই বৈচিত্রময়। এখানকার প্রকৃতি, মানুষ আর বুনো পায়রা মিলেমিশে বেঁচে আছে। মনোহর মুগ্ধতা নিয়ে। এখানকার দালানগুলোও তাকিয়ে আছে। ঘোলা চোখে। ভিনদেশি মানুষ দেখছে। আগের মতো ঠাওর করতে না পারা দিদিমার মতো, গা হাতরে বলছে, ‘তুই, মধুজার ছেলে মোতি?’
পারীর কত গল্প-অগল্প জানা আমাদের। দ্বিতীয় কোনো শহর নেই, যা নিয়ে লেখা হয়েছে এত। বলাও হয়েছে অগাধ। ভেবেছিলাম, এত চেনাজানা শহর। নিকটাত্মীয়ের মতো। অথচ পা ফেলতেই চেনার মাঝে অজানার শ্রাবণ শিহরণ তোলে মনে, মননে। ‘শৈবাল দিঘিরে বলে উচ্চ করে শির, লিখে রেখো, এক ফোঁটা দিলেম শিশির।’ এই এক ফোঁটা শিশিরতুল্য জ্ঞান নিয়ে এই প্রাচুর্যে বেঁচেবর্তে থাকাও কম কৃতিত্বের নয়।
এখানকার মানুষের জীবন নির্ভার। নিজের মতো বাঁচার। স্বাধীনতা-সমতা-ভাতৃত্বের মন্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে দেশ, সেখানে নিঃশ্বাস অবারিত। তবে ব্যক্তি স্বাধীনতা মানেই আপনি যা খুশি তা-ই করে বেড়াবেন তা তো নয়। আপনার স্বাধীনতা যেন অন্যের পরাধিনতার কারণ না হয়, দুর্বিষহ না হয় অন্যের জীবন। সেদিকেও যেন চোখ থাকে। পরের প্রতি সহিষ্ণুতার যে পাঠ এই বহুজাতির মিলনমেলায় নজরকাড়ে, তার তুলনা চলে না।
চন্দ্রপ্রভ এই নগরবাসীর জীবন মুক্ত হলেও জীবিকার ছকে আটকে থাকে সপ্তাহের পাঁচদিন। কর্মদিবস। কথায় আছে, ‘মেট্রো-বুলো-দোদো।’ দিনের আলো ফুটতেই চড়ো মেট্রোতে। কাজে যাও। কাজ শেষে ঘরে ফিরে ঘুম। পরদিন আবারও সেই বৃত্তেই আবর্তিত হও। তবে সপ্তাহের ছুটির দুদিন অর্থাৎ শনি ও রোববারের চিত্র এঁকেবারেই ভিন্ন। এ দুদিন কিছু মানুষের কাজ থাকে বৈকি। তবে সংখ্যায় তা খুব বেশি নয়।
ছুটির দিনে ‘গ্রাস মাতিনে’ অর্থাৎ সকালে লম্বা ঘুম, ‘সরতি’ তথা ঘুরে বেড়ানো, বন্ধুবহর নিয়ে। নয়তো ‘সিনে’ বা সিনেমা দেখা। এখানকার কর্মব্যস্ত মানুষ ঘরে উঁনুন জ্বালার সময় পান খুব কম। সকালে বুলঞ্জরি বা রুটির দোকানে গরম গরম মাখনের প্রলেপ দেওয়া ক্রোঁয়াস, পাঁও সোকোলার সঙ্গে এককাপ ধোঁয়া ওঠা কাফে আলঞ্জে, এসপ্রেসোই, কাফে ক্রেম বা সোকোলাসো (দুধ চকলেট)। ব্যস এই হলো দিনের শুরু। দুপুর কিংবা রাতে রেস্তোরাঁয় খাবারের নানা পদ। ক্রক মঁসিউ, কিশ, কক অভাঁ, বোফ বুগিনিঅঁ, রাতাতুই ইত্যাদি। সঙ্গে সালাদ-স্যুপ। যাদের পা ফেলতে হয় হিসাব কষে তাদের জন্য বুলঞ্জরি কিংবা সুপারশপের তৈয়ারি মোয়াশের (সস্তা) সালাদ, স্যান্ডুয়েচ। আর সবার জন্য লাঠির মতো লম্বা রুটি ‘বাগেত’ তো আছেই।
ছুটির দিনগুলোতে সিনেমার পর আড্ডা জমে রেস্তোরাঁর তেরাস বা উঠোনেও। টেবিলজোড়া খাবার, ফ্ল্যামিংগের মতো এক পাওয়ালা গ্লাসে লাল কিংবা গোধূলিবর্ণ পানীয়। সময়ের কোনো সীমা নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপে আড্ডা চলে সপ্তাহের সালতামামি। ফরাসিরা বেশ ফ্যাশন সচেতন বলেই পরিচিত বিশ্বে। রসনা বিলাসেও তাদের জুড়ি নেই। আর শিল্প-সাহিত্যে ফরাসিদের রাজত্বের কথা কে না জানে। সপ্তাহান্তে আড্ডা ঘুরেফিরে এসব প্রসঙ্গই মূর্ত হয়। এই শহরে যেমন নতুন পোশাক-পরিচ্ছদ, প্রসাধন এবং সিনেমার বড় বড় পোস্টার, প্রচার চোখে পড়ে। তেমনি নতুন বই ও লেখকের ছবিসহ বিজ্ঞাপনও ভূ-তল মেট্রোস্টেশন থেকে শুরু করে বহুতল বিপণী বিতানের সর্বত্রই দৃশ্যমান। অথচ আমাদের দেশে? বইয়ের এমন বিশাল বিজ্ঞাপন কি চোখে পড়ে খুব? বিজ্ঞাপনের জন্য প্রকাশকদের বরাদ্দই বা থাকে কতটা?
মুঠোফোনের এই বান ডাকা সময়েও পারীর ট্রেন, মেট্রো, বাস আর ট্রামে দেখা যায় বই হাতে পাঠক। পার্কে নিবিড় প্রকৃতিতে অবসর সময়ও কাটে তাদের বই হাতে। নিয়ম করে গণগ্রন্থাগারেও যায় মানুষ। কোনো কোনো গণগ্রন্থাগারে সময় কাটানোর জন্য আগে থেকেই নিতে হয় অ্যাপয়েন্টমেন্ট। লম্বা সাড়িতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। নতুন-পুরনো বইয়ের বিপণীগুলো কমবেশি সারাবছরই সরব থাকে পাঠকের উপস্থিতিতে। প্রতি সপ্তাহে বেরোচ্ছে নতুন বই। সেই বইয়ের ঘ্রাণ ছড়াতে বড় বইবিপণীগুলোতে আলাদা দেয়ালই থাকে বরাদ্দ। বইয়ের বিষয় বৈচিত্র্যের কথা বলতে গেলে, তা আর ফুরোবার নয়।
এছাড়া পথের পাশের ছোট্ট কাঠের ঘরের মতো দেখতে সেলফেও থাকে বই। নিজেদের মধ্যে বই বিনিময়ের একটা সুন্দর মাধ্যম এটি। পড়া হয়ে গেলে বই রেখে যান কেউ। কেউ আবার সেখান থেকে পছন্দের বই হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরেন। এভাবেই ঘোরে পাঠের চক্র। পাঠক থেকে পাঠকে পৌঁছে যায় বই। এত ব্যস্ত আর কর্ম ছকের জীবনে বইপাঠ অবসরের নয়, অনিবার্য হয়ে আছে ফরাসিদের নিত্য জীবনে।
পারী দিনের আলোতে যেমন বিভাময়, তেমনি রাতের কৃত্রিম আলোতেও স্বর্গপুরী। প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এগলিস, পালে, সাতো কিংবা মিউজের প্রাচুর্য ফুটে ওঠে নরম নিয়ম আলোয়। পথ আর পথের ধারের বাগানগুলোয় তৈরি হয় আবছায়া মায়া। সেখানে নাম না জানা ফুল আলো-আঁধারিতে মেলে ধরে অপার্থিব সৌন্দর্য।
বসন্তের এই বেলায় চেকনাই হয়েছে পারী রমনীয় রূপ। সাদা, গোলাপি চেরি ব্লসম, নানা রঙের টিউলিপ, হলদে ড্যাফোডিল, সাদা বা গোলাপি ম্যাগনোলিয়া, বেগুনি ঝুলন্ত উইস্টেরিয়া, গোলাপের মতো দেখতে র্যানানকুলাস, হালকা বেগুনি লাইলাক, ঘাসের বুকে ড্যান্ডেলিয়ন কিংবা সাদা ব্রাইডাল রিথ থোকায় থোকায় ধরে আছে গাছে গাছে। প্রকৃতির এই শোভা বিস্ময় ছড়ায় পারিজিয়ানসহ পর্যটকদের চোখেও।
কেবল ল্য তুর ইফেল বা আইফেল টাওয়ার, মোমার্ত সাক্রে-ক্যর বাজিলিক, ল্য মিউজে জু ল্যুভর বা লার্ক দ্য থ্রিয়ম্পই নয়, বিপুল বৃক্ষরাজি বেষ্টিত জারদা বা বাগানের প্রাকৃতিক সম্ভারের টানেও পর্যটকরা উড়ে আসেন অবসর কাটাতে। ইতিহাসের পাথুরে পথে হাঁটতে। যে পথে হেঁটেছেন বিশ্বখ্যাত লেখক, সাহিত্যিক, শিল্পী, রাজনীতিকরা। তাদের নামাঙ্কিত পথ আর অলিগলিগুলো যেন ইতিহাসগ্রন্থের এক একটি পাতা। উন্মাতাল স্মৃতি বয়ে বেড়ানো পারী ছড়ায় যে মায়াজাল, যে বিভ্রম গড়ে মননে, তা ভেদ করে সাধ্য কার!






