সড়কে ১৯৩

ঈদ মানেই তো ঘরে ফেরার গল্প। মায়ের হাতের সেমাইয়ের গন্ধ, নতুন জামা পরা সন্তানের হাসি, আর আপনজনকে জড়িয়ে ধরার ব্যাকুলতা— এই টান উপেক্ষা করার সাধ্য কার? তাই প্রতি বছরের মতো এবারও লাখো মানুষ শহর ছেড়ে ছুটেছিলেন গ্রামের পথে, বুকভরা আনন্দ আর পরিবারকে ঘিরে হাজারো স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু সবার গল্পের শেষটা সুন্দর হয়নি। কেউ আনন্দ নিয়ে পৌঁছেছেন গন্তব্যে, কেউ হাসপাতালে, আর কেউ ফিরেছেন না ফেরার দেশে। ঈদের আনন্দের পথ যেন অনেক জায়গায় রূপ নিয়েছে শোকের মিছিলে। সড়ক পরিণত হয়েছে মৃত্যুপুরীতে।
টাঙ্গাইলে ট্রাক দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু, কিশোরগঞ্জে পুরো একটি পরিবারের একসঙ্গে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া— এসব ঘটনা শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি ঘটনাই যেন একটি করে থেমে যাওয়া জীবনের গল্প। ঈদের দিনের সড়ক দুর্ঘটনাতেই অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রবিবার পর্যন্ত ঘরে ফেরার পথে সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৯৩ জন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২১ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত ঈদযাত্রায় সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১৮৬ এবং আহত হয়েছেন ৬০০ জনের বেশি। এর সঙ্গে গতকাল আগামীর সময়ের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য আরও সাতজনের মৃত্যুর সংখ্যা যোগ হয়েছে।
তবে এবারের ঈদযাত্রার সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। মোট নিহতদের মধ্যে ৮৪ জনই প্রাণ হারিয়েছেন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করতে গতি বাড়িয়েছিলেন, কেউ বাস বা ট্রেনের টিকিট না পেয়ে বাইকেই রওনা হয়েছিলেন পরিবারের কাছে। কিন্তু সেই দ্রুত ফেরা অনেকের জন্য হয়ে উঠেছে শেষ যাত্রা।
ঈদের দিন যাদের বাড়ির উঠোনে হাসি-আনন্দে সময় কাটানোর কথা ছিল, তাদের অনেক পরিবার এখন শোকের ঘোরে। কতগুলো পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয় মানুষকে— যে মানুষটি হয়তো নতুন জামা পরে, হাতে উপহার নিয়ে ঘরে ফেরার স্বপ্ন দেখেছিলেন। শুধু মৃত্যু নয়, আহতের সংখ্যাটাও ভয়াবহ। ৬০০-এর বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। অনেকের হাত-পা ভেঙেছে, কেউ দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্বের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। দ্রুত বাড়ি পৌঁছানোর তাড়া, অতিরিক্ত ভাড়া এড়ানোর চেষ্টা কিংবা অনিয়ন্ত্রিত গতির কারণে নিম্ন আয়ের কর্মজীবী মানুষই বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। চালকদের অতিরিক্ত কাজ, ক্লান্তি, নির্ঘুম দিন এবং বেপরোয়া গতির কারণে মহাসড়কগুলো বারবার মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেছেন, এবারের ঈদযাত্রায় পথচারীর মৃত্যু তুলনামূলক বেশি। আর ঈদ শেষে ঢাকা ফেরার চাপ বাড়লে দুর্ঘটনার সংখ্যাও আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনা যেন পুরো ঈদযাত্রার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে খাদে পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান ১৫ জন। নিহতদের মধ্যে ১০ জনই ছিলেন নওগাঁর একই এলাকার শ্রমজীবী মানুষ। বাসের বাড়তি ভাড়া এড়াতে তারা ট্রাকের ওপর চড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। কিন্তু চালকের সামান্য ঘুম আর এক মুহূর্তের ভুল কেড়ে নেয় ১৫টি পরিবারের ভবিষ্যৎ। আর কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে ঘটে যাওয়া আরেক দুর্ঘটনায় এক পরিবার— স্বামী-স্ত্রী ও তাদের ছোট্ট সন্তান— একসঙ্গে প্রাণ হারায়। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে ঘরে ফেরার বদলে তাদের বাড়িতে ফিরেছে নিথর তিনটি দেহ।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, দুর্ঘটনার কারণ ও ধরন নতুন নয়। কী করলে দুর্ঘটনা কমানো যাবে সেটিও বহু আগেই জানা। কিন্তু মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়নের জায়গায় গিয়ে থেমে যায়। ঈদ এলে আলোচনা শুরু হয়, ঈদ শেষ হলে আবার সবকিছু আগের মতো।






